পল্টু দাঁত বের করে বলল, “প্যাকটিস করছি স্যার। অঙ্কগুলো আজকাল আর আগের মতো কঠিন লাগে না।”
উদ্দালক খুশি হয়ে বলল, “তাহলে তো দারুণ ব্যাপার। আজ তাহলে মাংস হয়ে যাক। কী বলিস?”
পল্টু হাসল, “হ্যাঁ স্যার। হয়ে যাক।”
উদ্দালক মানিব্যাগ নিতে উঠল। পল্টু জিজ্ঞেস করল, “স্যার, বউদি আর আসবেন না?”
উদ্দালক বলল, “না। বউদির বাড়ি তো কলকাতায়। উনি ওখানেই থাকবেন।”
পল্টু বলল, “এরকম হয় নাকি? বিয়ের পর তো বউ বরের সঙ্গে থাকে।”
উদ্দালক বলল, “হয়, কলকাতায় হলে এরকম হয়।”
পল্টু বলল, “কী যে বলেন স্যার, বিনোদের বাবা তো মেয়েটাকে কথা দিল বিনোদ বড়ো হলেই বিয়ে দিয়ে মেয়েকে ঘরে তুলবে। তাহলে আপনার বউ দূরে থাকবে কেন?”
উদ্দালক বলল, “খুব পেকেছিস ব্যাটা। যা, মুরগি নিয়ে আয়। আমি পেঁয়াজ কাটতে বসি।”
পল্টু মুখ কালো করে বেরোল।
উদ্দালক পেঁয়াজ কাটতে বসল।
কয়েক সেকেন্ড পরেই লাফাতে লাফাতে পল্টু এসে বলল, “স্যার, স্যার, বউদি এসেছেন।”
উদ্দালক অবাক হয়ে বলল, “কী? ইয়ার্কি মারছিস?”
পল্টু বলল, “হ্যাঁ স্যার। এই তো।”
উদ্দালক ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল জিনিয়া টোটো থেকে নামছে। দোতলা থেকে সদাশিববাবু আবার উঁকি দিয়ে সেটা দেখছেন। সে বাইরে আর কিছু বলল না।
জিনিয়া ব্যাগ নিয়ে ঢুকল। পল্টুকে বলল, “তোর জন্য কলকাতার ভালো মিষ্টি নিয়ে এলাম পল্টু। তুই কোথায় যাচ্ছিলি এখন?”
পল্টু বলল, “মাংস আনতে।”
জিনিয়া বলল, “তাই নাকি? তা কটা রুটি খাবি বল? রুটি করে ফেলি শিগগিরি।”
পল্টু বলল, “আজ তো বেশি খুশি। তাই আজ পনেরোটা খাব।”
জিনিয়া হাসতে হাসতে বলল, “তাই হবে।”
পল্টু লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে গেল।
জিনিয়া উদ্দালকের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী ব্যাপার? আপনি মনে হচ্ছে একবারেই খুশি হননি?”
উদ্দালক বলল, “না, ঠিক তা নয়। আপনি বলতে পারতেন আমাকে। আমি স্টেশনে আনতে যেতাম নাহয়।”
জিনিয়া বলল, “বাড়িটা ঠিক পোষাচ্ছে না বুঝলেন। মা সারাক্ষণ এমন মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন আমি মরে গেছি। ওরকম করলে থাকা যায়! তার উপর আপনার মাও ফোন করছেন। এত প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। তা ছাড়া সৌপ্তিকদের বাড়িতে ঠিক কী করতে হবে, সে প্ল্যানটাও তো বসে করতে হবে। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনাকে আমি জ্বালাতন করব না। আপনি পড়ুন। মন দিয়ে পড়ে যান। আমি আমার মতোই থাকব, ঠিক যেমন কথা হয়েছিল। ভালোবাসাটা সৌপ্তিকেরই থাক। আমরা সারাজীবন নাহয় বন্ধু হয়ে থাকি। দেখি, আটা কোথায়, আটা মাখি। পল্টুর জন্য রুটি করে রাখি।”
উদ্দালক বলল, “না না, আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমি আটা মেখে দিচ্ছি। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন।”
জিনিয়া বলল, “স্টেশনে নেমেই আমি ফ্রেশ হয়ে গেছি। এখানকার হাওয়াটাই আলাদা। একফোঁটা পলিউশন নেই।”
উদ্দালক হাসল, “তা ঠিক।”
জিনিয়া বলল, “আচ্ছা শুনুন।”
উদ্দালক বলল, “বলুন।”
জিনিয়া বলল, “আপনার আসল ডায়েরিটা আমাকে দেবেন? আমি পড়তে চাই।”
উদ্দালক বলল, “কী করবেন পড়ে?”
জিনিয়া বলল, “সময় কাটাব। কী আর করব?”
উদ্দালক বলল, “প্রফেসর শঙ্কুর ডায়েরি পড়ুন। বেশি ভালো লাগবে।”
জিনিয়া বলল, “আপনি দেবেন না, তাই তো?”
উদ্দালক বলল, “ব্যাগটা ঘরে রেখে ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি পেঁয়াজ কেটে রেডি করি সব।”
জিনিয়া বলল, “কথা ঘুরিয়ে দিলেন অমনি?”
উদ্দালক বলল, “ডায়েরি লিখি না আমি। ডায়েরি লিখে কী হবে? স্মৃতি লিখে রাখা? হয় না জাস্ট। সব মোমবাতিই জ্বলতে জ্বলতে নিভে যায় একদিন। মোমের যে অংশ বাতাসে মিশে যায়, আমাদের জীবনটাও সেরকম। চলে যাওয়ার পর এখানেই মিশে থাকব, কেউ মনে রাখবে। কেউ ভুলে যাবে। লিখে কী হবে?”
জিনিয়া চেয়ারে বসে পড়ে বলল, “আপনি বড়ো ভারী ভারী কথা বলেন। এরকম কঠিন কথা না বলে বোঝানো যায় না?”
উদ্দালক বলল, “সে বোঝানো যায়। তার জন্য আরও পড়াশোনা করতে হবে। যত জানব, তত সহজ হবে চারপাশ। যত কম জানব, তত কঠিন হবে সব কিছু।”
পল্টু লাফাতে লাফাতে মাংস নিয়ে ঢুকল। বলল, “স্যার, বাবা বলেছে কাল আমাদের বাড়ি খেতে। ভেটকি মাছ আনাবে।”
উদ্দালক বলল, “বাহ। এ তো দারুণ খবর রে।”
জিনিয়া উঠল, “ব্যাগটা রেখে এসে রুটি করি তোর পল্টু। দাঁড়া, এখনই আসছি।”
পল্টু বলল, “তাড়াতাড়ি আসুন বউদি। মাছ ধরার গল্প বলব। বড়ো পুকুরে ইয়াব্বড়ো কাতলা ধরলাম কালকে।”
“আচ্ছা, শুনব রে বাবা শুনব”, বলে হাসতে হাসতে ব্যাগ নিয়ে বেডরুমে ঢুকল জিনিয়া।
ঘর অন্ধকার ছিল। আলো জ্বালল সে।
খাট জুড়ে ঝলমল করছে নীল কাগজ দিয়ে বানানো একগাদা অপরাজিতা ফুল…
