উদ্দালক হেসে বলল, “না স্যার, এখনও ডিসিশন নিতে পারিনি। দেখি।”
হেডস্যার বললেন, “ঠিক হলে ছুটি নিয়ে নিয়ো। ট্রেনের টিকেট তো এখন তৎকালে পাবে না। ফ্লাইটেই যেতে হবে। আমার বাপু প্লেনে বড্ড ভয় করে। ছেলে জোর করে আন্দামান নিয়ে গেছিল। বাপ রে বাপ, ওসব আমার পোষায় না।”
উদ্দালক বলল, “আচ্ছা স্যার দেখব।”
তপনবাবুর সামনে থেকে সরে উদ্দালক টিচার্স রুমে গিয়ে বসল। তারাপদ স্যার আর সমরেশবাবু আবার ঝগড়া শুরু করেছেন। সুদেববাবু তার দিকে তাকাচ্ছেন না। রাগ এখনও পড়েনি বোঝা যাচ্ছে।
প্রথম ক্লাসটা সিক্সের। প্রেয়ারের পর ক্লাসে গিয়ে পড়াতে শুরু করল সে। এ সেকশন হলেও নিচের ক্লাস বলে ছেলেরা বড্ড দুরন্ত। ধমকধামক দিতে ইচ্ছে করে না কোনওবারেই। উদ্দালক একগাদা অঙ্ক দিয়ে দিল। ছেলেগুলো অঙ্ক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সিক্সের পাশের ক্লাস সেভেন বি। জানলা দিয়ে ক্লাসের বাইরেটা দেখা যায়। উদ্দালক দেখল পল্টুকে নিল ডাউন করিয়ে রাখা হয়েছে। সে ক্লাস থেকে বেরিয়ে উঁকি মেরে দেখল উদয় স্যারের ইতিহাস ক্লাস। পল্টু ফিসফিস করে বলল, “স্যার ইতিহাস বই আনতে ভুলে গেছি।”
উদ্দালক বলল, “খেতে ভুলে যাস না?”
পল্টু ভালো মানুষের মতো মাথা নেড়ে বলল, “না।”
উদ্দালকের হাসি পেল। সে আবার তার ক্লাসে ফিরে এল। ছেলেরা অঙ্ক নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। পিছনের বেঞ্চের কয়েকটা ছেলেকে বেঞ্চের উপরে দাঁড় করিয়ে দিল। ছেলেগুলো হাসিমুখে দাঁড়িয়ে পড়ল, যেন এর থেকে আনন্দের কাজ আর কিছু হতে পারে না।
কয়েকজনের খাতা দেখে হতাশায় মাথা নাড়ল উদ্দালক। অঙ্কের অবস্থা খুব খারাপ। বলল, “আজ লাস্ট ক্লাসের পরে কেউ বাড়ি যাবে না। এক্সট্রা ক্লাস নেব।”
ছেলেরা হতাশ মুখে মাথা নাড়ল। ক্লাসটা শেষ হলে উদ্দালক টিচার্স রুমে গিয়ে কাগজ পড়তে শুরু করল।
অনেক দিন পর স্কুল পালাতে ইচ্ছা হল। স্কুল পালিয়ে কোথায় যাওয়া যেতে পারে? সিনেমা হলে? ভেড়ির তীরে ভারী সুন্দর হাওয়া দেয়। ওখানে গিয়েও চুপ করে বসে থাকলে মন্দ হত না।
শিক্ষকরা স্কুল পালাতে পারে?
কথাটা ভেবেই হেসে ফেলল সে।
১৭
অগ্নি ব্রেকফাস্ট করছিলেন। মালতী চা নিয়ে এলেন।
অগ্নির সামনে বসে বললেন, “কী রান্না করব?”
অগ্নি বললেন, “আমাকে জিজ্ঞেস করার কী আছে? করো যেটা খুশি। বাজার আছে?”
মালতী বললেন, “মাছ এনো ওবেলা বেরিয়ে। আজকের মতো মাছ আছে।”
কলিং বেল বেজে উঠল। মালতী বললেন, “এখন আবার কে এল? দেখি।”
দরজা খুললেন মালতী। দেখলেন জিনিয়া দাঁড়িয়ে আছে। হাতে বড়ো ব্যাগ।
বললেন, “কি রে? কী হল?”
জিনিয়া ব্যাগটা সোফার সামনে রেখে সোফায় বসে বলল, “যা আছে খেতে দাও। অফিস বেরোব।”
মালতী বললেন, “সে ঠিক আছে। এত বড়ো ব্যাগ নিয়ে এলি কেন?”
জিনিয়া বলল, “চলে এলাম। থাকব না ওখানে আর। পোষাল না।”
মালতী ছিটকে গিয়ে অগ্নির কাছে গিয়ে বললেন, “দেখলে? চলে এসেছে।”
অগ্নির খাওয়া হয়ে গেছিল। তিনি কোনও প্রতিক্রিয়া দিলেন না। হাত মুখ ধুয়ে টাওয়েলে হাত মুছে বললেন, “ও অফিস যাবে বলল তো। খেতে দাও।”
মালতী বললেন, “মানে? তুমি কিছু বলবে না?”
অগ্নি জিনিয়ার পাশে বসে বললেন, “খেতে দাও ওকে। ও একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট মেয়ে। ও যেটা ঠিক করবে, তাই হবে।”
মালতী বললেন, “আর বিয়ে হল, বাড়িতে অষ্টমঙ্গলায় জামাই এসে গেল, পাড়ার লোক জানল, আত্মীয়স্বজনরা জানল, তার কী হবে?”
অগ্নি জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “কী বলে দেখ তোর মা। নিজের মেয়ের থেকে এরাই বেশি হয়ে গেছে।”
জিনিয়া মার দিকে তাকাল, “তুমি কী চাও? বাড়ি ছেড়ে চলে যাই?”
মালতী রেগে গিয়ে বললেন, “আমি কিছু চাই না। আমার চাওয়া না চাওয়ার তো কোনও দামই নেই। এত ভালো একটা ছেলে, তাও চলে এলি। যা পারিস কর।”
মালতী গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেলেন।
অগ্নি জিনিয়ার পিঠে হাত দিয়ে বললেন, “ঝগড়া হয়েছে?”
জিনিয়া মাথা নাড়ল, “না। ঝগড়া হবে কেন? উদ্দালক খুবই ভালো ছেলে। ঝগড়া হবার মতো কিছু হয়নি।”
অগ্নি বললেন, “তবে?”
জিনিয়া বলল, “থাকব না জাস্ট, ঠিক করে ফেললাম। এটাই। থাকা হবে না আর কি।”
অগ্নি বললেন, “তাহলে কী করবি?”
জিনিয়া বলল, “যদি বাড়িতে থাকতে দাও, তাহলে বাড়ি থেকেই অফিস যাতায়াত করব। আর কিছু না।”
অগ্নি জিনিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, “বেশ, তাই করিস। যেটা ইচ্ছা সেটা করিস।”
জিনিয়া বলল, “আর তুমি আমার বিয়েতে যা খরচ করেছ জানিয়ো, শোধ করে দেব সব।”
অগ্নি হেসে ফেললেন, “ধুর পাগল। ও তো তোরই টাকা। এসবের আবার হিসেব হয় নাকি? পাগল মেয়ে। যা, অনেকটা জার্নি করে এসেছিস। স্নান করে খেয়ে অফিস যা।”
জিনিয়া উঠে স্নানে গেল। স্নান করতে করতে কাঁদতে শুরু করল। কেন কাঁদছিল নিজেই বুঝতে পারল না। স্নান সেরে বেরিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ থেকে সৌপ্তিকের ছবির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসল। মালতী পাউরুটি আর অমলেট প্লেটে তার সামনে দিয়ে বসলেন।
জিনিয়া বলল, “মা এখন কোনও প্রশ্ন কোরো না প্লিজ। পরে কোরো।”
মালতী বললেন, “আমি কি তোর শত্রু মা?”
জিনিয়া বলল, “না। শত্রু হবে কেন? তবে বন্ধু হতে গিয়ে আমাকেই বুঝে উঠতে পারলে না কখনও।”
