মালতী কেঁদে ফেললেন, “চিরকাল এই সংসারের জন্য খেটে আজ আমাকে এটা শুনতে হল।”
জিনিয়া আর কিছু বলল না। চুপ করে খেয়ে বেরিয়ে গেল।
অফিস করল সারাদিন কোনও কথা না বলে।
সুলগ্না কথা বলতে এসেছিল, সে বলল, “এখন যা। পরে কথা হবে।”
সন্ধে হলে অফিস থেকে বেরোল সে। সৌপ্তিকদের বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থেকে নেমে দেখল আলো জ্বলছে। ভাবল রাতে যে ভদ্রলোক থাকেন, তিনিই এসেছেন হয়তো। বেল বাজাতে সৌম্য দরজা খুলল।
জিনিয়া অবাক হয়ে বলল, “আপনি? বাবা মা আসেননি?”
সৌম্য বলল, “না, আমি একা এসেছি। বাড়িটা সত্যিই বেচব এবার। ওদিকে একটা প্রপার্টি কেনার কথা চলছে। এ শহর থেকে পাততাড়ি গোটানোর সময় হয়ে গেল এবার।”
জিনিয়া বলল, “আপনার স্মৃতি? ভাইয়ের স্মৃতি? এসবের কোনও মূল্য নেই?”
সৌম্য হাসল, “আপনিও তো বিয়ে করে নিয়েছেন। আপনি মূল্য দিয়েছেন?”
জিনিয়া বলল, “বিয়ে করিনি সেভাবে, বিশ্বাস করুন। ইন ফ্যাক্ট আমি চলেও এসেছি ও বাড়ি ছেড়ে।”
সৌম্য বলল, “আপনি আসুন এবার। আমার গার্লফ্রেন্ড আসার কথা। ও আপনাকে দেখলে অন্য কিছু ভাবতে পারে। প্লিজ।”
জিনিয়া সৌপ্তিকের বাবার মোবাইলে চেষ্টা করল। ফোন অফ বলছে।
সৌম্য হাসিমুখে বলল, “নাম্বার চেঞ্জ হয়ে গেছে সবার। পাবেন না কাউকে। আসুন। নমস্কার।”
জিনিয়া স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পিছু ফিরল।
এক লহমায় মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল তার।
১৮
সন্ধে হয়েছে। পল্টু পড়তে এসে উঁকিঝুঁকি মেরে বলল, “বউদি নেই স্যার?”
উদ্দালক বলল, “না।”
পল্টু বলল, “অফিস গেছেন?”
উদ্দালক বলল, “তোর এত জেনে কী হবে? অঙ্ক খাতা খোল।”
পল্টু বলল, “ভাবলাম আজকেও দেশি মুরগি নিয়ে আসব।”
উদ্দালক বলল, “আজ ভাল্লাগছে না ওসব। আলুসেদ্ধ ভাত খাব।”
পল্টুর মুখটা নিভে গেল, “ওতে হবে?”
উদ্দালক বলল, “হবে। না হওয়ার কী আছে? দেখি খাতা দেখি।” পল্টু খাতা বের করে দিল। উদ্দালক পড়াতে শুরু করল। পড়ানো হয়ে গেলে পল্টু আর-একটু উশখুশ করল। উদ্দালক বলল, “তুই বাড়ি যা। আমার পড়া আছে আবার।”
পল্টু বিমর্ষ মুখে বলল, “বউদির দেরি হয়ে গেল।”
উদ্দালক বলল, “বউদি আসবে না। তুই বাড়ি যা।”
পল্টু মনখারাপ করে চলে গেল।
ইংরেজি কাগজের সুডোকু সলভ করতে বসল উদ্দালক। খানিকটা করে ভালো লাগল না। বই খুলে বসল। সেটাও ভালো না লাগায় উঠে গ্যাস জ্বালিয়ে ভাত আলুসেদ্ধ একসঙ্গে বসিয়ে দিয়ে খেয়ে নিল।
বেডরুমে ঢুকল। তার ডায়েরিটা পড়ে আছে। খুলে দেখল জিনিয়া তার লেখার পরের পাতায় অনেকগুলো ছবি এঁকেছে। ফোন বাজল, দেখল জিনিয়ার মা ফোন করছেন। ধরল, “হ্যালো।”
মালতী নিচু গলায় বললেন, “বাবা, তোমাদের কি ঝগড়া হয়েছে?”
উদ্দালক বলল, “না তো। কেন বলুন তো?”
মালতী বললেন, “না মানে তিন্নি বলছে আর ফিরবে না। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কেমন একটা মান সম্মানের ব্যাপার বলো তো?”
উদ্দালক বলল, “কেন? মান সম্মানের ব্যাপার কেন? এখানে ওর পোষায়নি, চলে গেছে। মান সম্মানের কী হল?”
মালতী বললেন, “তুমি বুঝতে পারছ না বাবা কী কী সমস্যা হতে পারে? শুধু আমাদের কেন? তোমাদেরও সমস্যা হতে পারে।”
উদ্দালক একটু থমকে বলল, “ঠিক আছে। দুটো দিন যাক। দেখি আপনার মেয়ে কী করে। তারপর নাহয় কী করব ঠিক করা যাবে।”
মালতী বললেন, “দেখো কিন্তু। ওর বাবা এসব বুঝতে চায় না। আমি তো মা, আমার ভিতরেও তো অশান্তি হয় বলো? দ্যাখো, রাত সাড়ে নটা বাজে, এই একটু আগে বাড়িতে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। এভাবে চলে বলো তো? সমস্যা হয় না?”
উদ্দালক বলল, “সে অফিসের কাজ ছিল হয়তো। আচ্ছা আমি দেখছি ফোন করে।”
মালতী কাতর আর্তি করলেন, “দেখো বাবা। তুমিই পারবে।”
উদ্দালক হাসল, “না, আমি পারব না কিছুই। তবে দেখছি।”
ফোন রেখে উদ্দালক জিনিয়াকে ফোন করল। একবার পুরো রিং হয়ে কেটে গেল। দ্বিতীয়বার আবার রিং হতে জিনিয়া ধরল, “বলুন। আপনার কী চাই?”
উদ্দালক বলল, “কিছু চাই না। আপনার আঁকার হাত তো বেশ ভালো। ছবি আঁকেন আপনি?”
জিনিয়া থমকে গিয়ে বলল, “আপনি কোথায় দেখলেন?”
উদ্দালক বলল, “এই তো, আমার ডায়েরির পাতায়। বেশ ভালো ডিজাইনগুলো হয়েছে কিন্তু।”
জিনিয়া বলল, “আপনার আর কিছু বলার আছে?”
উদ্দালক বলল, “দেখুন, রুমমেট হিসেবে দুজন ছিলাম। একজন রুমমেট মেস ছেড়ে চলে গেছে। মাসি যা রান্না করেছে, তা এক্সেস হয়ে গেছে। আমি সেই খোঁজ নিতেই ফোন করলাম যে আমার রুমমেট ঠিকঠাক বাড়ি পৌঁছোতে পেরেছে কি না।”
জিনিয়া বলল, “পেরেছি। রাখুন। আমার ভালো লাগছে না কিছুই।”
উদ্দালক বলল, “আরে কেন ভালো লাগছে না বলবেন তো একবার।”
জিনিয়া চুপ করে গেল।
উদ্দালক বলল, “আরে বলুন। কী হল?”
জিনিয়া বলল, “সৌপ্তিকের দাদা এসেছে। ও বাড়ি বিক্রি করে দেবে।”
উদ্দালক বলল, “বেশ তো। আমি আর আপনি কিনে নেব। দুজনের মাইনেয় হাউজবিল্ডিং লোন পাওয়া যাবে তো। এই নিয়ে এত চাপ নেওয়ার কী আছে?”
জিনিয়া অবাক হয়ে বলল, “মানে? আপনি কিনবেন কেন?”
উদ্দালক বলল, “আরে আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেন, আপনি আমার রুমমেট। তা ছাড়া কলকাতায় একটা বাড়ি হবে সেটাও মন্দ না। মাঝে মাঝে আমি, আপনি, পল্টু গিয়ে পিকনিক করে এলাম। খারাপ হবে ব্যাপারটা?”
