উদ্দালক বলল, “ও পল্টু আসুক, একাই খেয়ে নেবে। আমি ওকে অঙ্ক দিয়ে যাচ্ছি। চলুন। ঘুরেই আসি।”
পল্টু মুড়ি নিয়ে এল। উদ্দালক পল্টুকে একগাদা অঙ্ক করতে দিয়ে বলল, “সব বসে বসে কর। আমি বউদিকে নিয়ে আসছি।”
পল্টু বড়ো করে মাথা নাড়ল।
জিনিয়া সালোয়ার কামিজ পরে বেরোল। উদ্দালক বলল, “সাইকেলের পিছনে বসতে পারবেন?”
জিনিয়া বলল, “বসিনি কোনও দিন। সামনেই বসি।”
উদ্দালক বলল, “সামনে বসবেন? আচ্ছা বসুন।”
সন্ধে নেমেছে। জিনিয়াকে সাইকেলের সামনে বসিয়ে উদ্দালক সাবধানে সাইকেল চালাতে লাগল। জিনিয়ার ভালো লাগছিল। কোত্থেকে একটা মিষ্টি হাওয়া আসছে।
বাজারে পৌঁছে কসমেটিক্সের দোকানে জিনিয়া অনেক সময় নিয়ে নিল। উদ্দালক দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল। ফেরার সময় জিনিয়া আবার সামনের সিটে বসল।
বাজার যাওয়ার সময় অতটা হয়নি। ফেরার সময় জিনিয়ার মনে হল উদ্দালকের উষ্ণ নিঃশ্বাস তার ঘাড়ে পড়ছে। ভালো লাগছিল তার। খানিকটা যাওয়ার পর হঠাৎ শিউরে উঠল সে।
এ কী করতে যাচ্ছিল সে?
জিনিয়া বলল, “সাইকেল দাঁড় করান প্লিজ।”
উদ্দালক সাইকেল দাঁড় করিয়ে বলল, “কী হল?”
জিনিয়া বলল, “আমি হেঁটেই ফিরব।”
উদ্দালক অবাক গলায় বলল, “সে আবার কী? অনেকটা পথ তো!”
জিনিয়া বলল, “না, আমি হেঁটেই ফিরব।”
উদ্দালক সাইকেল থেকে নামল, “বেশ। তাই সই। চলুন। দিন, আপনার হাতের ব্যাগটা আমায় দিন। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে দি।”
জিনিয়া দিল। উদ্দালক চুপ করে হাঁটতে লাগল।
জিনিয়া বলল, “আমার বিয়েটা করা ঠিক হয়নি। সৌপ্তিককে ঠকানো হয়ে যাচ্ছে।”
উদ্দালক বলল, “এটা আবার কখন থেকে মনে হচ্ছে?”
জিনিয়া বলল, “এই তো। এখন থেকেই। আমি… কী বলব…”
উদ্দালক বলল, “ফিজিক্যালি আমার প্রতি অ্যাট্রাকটেড হচ্ছেন?”
জিনিয়া থমকে দাঁড়িয়ে গেল। কড়া গলায় বলল, “এরকম মনে হচ্ছে কেন আপনার?”
উদ্দালক বলল, “আপনার মনের মধ্যে দুটো সত্তা কাজ করে তো। একটা সত্তা সৌপ্তিককে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরতে চায়। এরকম মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। ইট হ্যাপেনস।”
জিনিয়া রেগে গেল, “খুব জানেন না? খুব বেশি বুঝে গেছেন? পড়ান তো এই ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরের স্কুলে। তাও কথা বলছেন যেন বড়ো কোনও সাইকিয়াট্রিস্ট!”
উদ্দালক হাসল, “আপনার এই দ্বন্দ্বটা ভীষণ স্বাভাবিক একটা দ্বন্দ্ব। হতে পারে আমি ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরের আরও লঝঝড়ে মাস্টারমশাই, কিন্তু সত্যিটা স্বীকার করলে কি আপনার খুব একটা ক্ষতি হবে? একটা ছেলে আর একটা মেয়ে একসঙ্গে থাকলে এগুলো হতেই পারে। ইন ফ্যাক্ট আমিও আপনার প্রতি ফিজিক্যাল অ্যাট্রাকশন বোধ করি না বললে অন্যায় হবে। এগুলো হয়। পরিণত সম্পর্কে শরীর আসে। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাজ হল সেটা থেকে নিজেদের দূরে রাখা, মানে আমাদের মতো সিচুয়েশনে।”
জিনিয়া বলল, “আমি সৌপ্তিককে খুব ভালোবাসি। আর আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন।”
উদ্দালক বলল, “আপনি সৌপ্তিককে ভালোবাসেন না, আমি একবারও বলিনি। সাইকেল থেকে নামলেন কেন?”
জিনিয়া বলল, “এমনি। আমার হাঁটতে ভালো লাগে।”
উদ্দালক বলল, “ঠিক আছে। হাঁটুন।”
জিনিয়া বলল, “আমি বাড়ি চলে যাব। আপনার সঙ্গে থাকব না।”
উদ্দালক বলল, “ঠিক আছে। কালকেই চলে যাবেন?”
জিনিয়া বলল, “হ্যাঁ। কালকে চলে যাব।”
উদ্দালক বলল, “ফাইনাল?”
জিনিয়া বলল, “ফাইনাল।”
উদ্দালক আর কিছু বলল না। চুপচাপ সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে লাগল।
১৬
বাড়ি ফিরে জিনিয়া ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
উদ্দালক দেখল পল্টু অঙ্ক নিয়ে তখনও হাবুডুবু খাচ্ছে। সে বলল, “কি রে, কটা হল?”
পল্টু বলল, “একটাও হচ্ছে না স্যার।”
উদ্দালক শ্বাস ছেড়ে বলল, “বস। তোকে নিয়ে আর পারি না সত্যি।”
পল্টু বলল, “স্যার, বউদি কোথায় গেলেন?”
উদ্দালক বলল, “তোর কী তাতে? পড়তে এসেছিস, পড়ে যা। বউদি কোথায় তোর জেনে কী হবে? দেখি আয়।”
পল্টুর মুখটা শুকিয়ে গেল। উদ্দালক গম্ভীর মুখে পল্টুকে অঙ্ক করিয়ে গেল।
পল্টু যাওয়ার পরে জিনিয়া একবার বেরিয়ে এসে খেয়ে আবার ঘরে ঢুকে গেল।
উদ্দালক খেয়ে পড়তে শুরু করল।
পরদিন ভোর হতেই জিনিয়া ব্যাগপত্র নিয়ে তৈরি হয়ে বলল, “আমাকে টোটো ডেকে দিন। আমি চলে যাব।”
উদ্দালক দাঁত মাজছিল। বলল, “বলে দিয়েছি অলরেডি। এসে দাঁড়িয়ে আছে বা এখনই আসবে দেখুন।”
জিনিয়া কোনও কথা না বলে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে চলে গেল।
উদ্দালক ব্রাশ করে বই নিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ পর সদাশিববাবু জানলা দিয়ে উঁকি দিলেন, “বউমা কি চলে গেল? ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে বেরোল দেখলাম যেন।”
উদ্দালক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মানুষের কৌতূহল বড্ড বেশি। বলল, “হ্যাঁ। বাড়ি গেছে।”
সদাশিববাবু অবাক গলায় বললেন, “যাহ। কালকেই বলল আপনাকে বলবে পাহাড়ে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা, আর আজকে চলে গেল?”
উদ্দালক বলল, “হ্যাঁ, বিশেষ কাজ পড়ে গেছে। আপনি বাজার যাবেন না? এরপরে জিনিসের দাম বেড়ে যাবে তো।”
সদাশিববাবু বুঝলেন উদ্দালক তাঁকে কাটাতে চাইছে। বললেন, “ও হ্যাঁ, তা ঠিক। আচ্ছা, যাই বরং।”
উদ্দালক চুপ করে বই পড়তে লাগল। স্কুলের সময় হলে তৈরি হয়ে স্কুলে গেল।
স্কুলে ঢুকেই হেডস্যারের সঙ্গে দেখা। তাকে দেখে বললেন, “ঠিক করলে কোথায় যাবে?”
