জিনিয়া বলল, “আমার সিরিয়াসলি তোর সঙ্গে এখন কথা বলতে ইচ্ছা করছে না সুলগ্না। রাখলাম।”
সুলগ্না কিছু বলার আগেই জিনিয়া ফোন কেটে দিল। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল সে। সদাশিববাবু কাগজ পড়ছিলেন। তাকে দেখে একগাল হেসে বললেন, “ভালো আছ তো বউমা? সব ঠিক আছে? কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?”
জিনিয়া হাসল, “হ্যাঁ, ভালো আছি। অসুবিধা হচ্ছে না কোনও।”
সদাশিববাবু বললেন, “কাগজ পড়বে?”
জিনিয়া বলল, “না না। আমি একটু বসি।”
সদাশিববাবু বললেন, “বেশ, বসো।”
সদাশিববাবুর স্ত্রী শোভনা তাকে দেখেছিলেন। দুজনের জন্যই চা নিয়ে এলেন। চা-টা খেয়ে জিনিয়ার প্রাণ জুড়িয়ে গেল। বলল, “খুব ভালো চা তো।”
শোভনা বললেন, “আমার ভাই দার্জিলিং গেছিল। নিয়ে এসেছে। সত্যিই খুব ভালো। তোমরা কোথাও বেড়াতে যাবে না?”
জিনিয়া বলল, “ঠিক হয়নি কিছু। দেখা যাক। আমার অফিসে ছুটি পাওয়া খুব সমস্যার।”
শোভনা বললেন, “ছুটি না পেলে জোর করে যাবে। হানিমুনে না গেলে হয় নাকি? এই তো বিয়ে করেই দুজনে স্কুল অফিস শুরু করে দিলে। এগুলো খুব খারাপ। একসঙ্গে কোথাও ঘুরে এসো। দেখবে খুব ভালো লাগবে। এখনই তো ঘোরার বয়স। আমরা বিয়ের পরে পুরী গেছিলাম। তখন তো দিঘা, পুরী আর দার্জিলিংই যেত সবাই। এখন কতরকম যাওয়ার জায়গা হয়েছে।”
জিনিয়া চুপ করে চা খেতে লাগল।
সদাশিববাবু বললেন, “আমরা গত বছর এই সময়েই গোয়া গেছিলাম। মন্দ লাগেনি, কী বলো গিন্নি?”
শোভনা বললেন, “ধুস, গোয়া এই বয়সে কি পোষায়? আমার বাপু পাহাড়ই ভালো লাগে। হাঁটুতে ব্যথা হয় যদিও পাহাড় ভাঙতে, তবু পাহাড়ের ধারেকাছে কিছু হয় না। তোমার কী ভালো লাগে বউমা?”
জিনিয়ার মনে পড়ে গেল তার আর সৌপ্তিকের ঠিক হয়েছিল দুজনে মিলে পাহাড়ে যাবে। সে একটু থমকে বলল, “পাহাড় ভালো লাগে।”
শোভনা হাসলেন, “যাক, তাহলে তুমিও আমার দলেই পড়লে। ভালো হল। এবার তোমার বরকে জোর করো পাহাড়ে নিয়ে যেতে। ঘুরে এসো বউমা, এই সময় আর ফিরে আসবে না বিশ্বাস করো। যাও যাও।”
পারলে শোভনা এখনই তাদের পাঠিয়ে দেন।
জিনিয়ার হাসি পেল। বলল, “আচ্ছা বলব।”
১৫
পল্টু পড়তে এসেছে একগাদা চারাপোনা নিয়ে। উদ্দালক বলল, “এগুলো কে বাছবে?”
পল্টু বলল, “আমিই বেছে দেব স্যার। বউদির ভালো লাগবে।”
উদ্দালক বলল, “তুই পড়বি, না মাছ বাছবি?”
পল্টু বউদি বউদি করে ডাকতে লাগল। জিনিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পল্টু বলল, “এই দেখুন বউদি, এই মাছগুলো আমি ধরেছি।”
জিনিয়া বলল, “বাহ।”
উদ্দালক বলল, “এই তুই পড়তে বোস। পরে দেখছি মাছগুলো নিয়ে কী করা যায়।”
পল্টু মাথা চুলকে স্টাডিতে চলল উদ্দালকের সঙ্গে। জিনিয়া মাছগুলো ধুয়ে, কেটে, ভেজে এক প্লেট মাছভাজা নিয়ে স্টাডিরুমে ঢুকে বলল, “এই নাও পল্টু, ভেজে আনলাম।”
পল্টু খুব খুশি হয়ে বলল, “আরিব্বাস, বউদি রান্না জানেন। এটা খুব ভালো হল। আপনি খেয়েছেন বউদি?”
জিনিয়া বলল, “না, আমি খাব। তুমি খাও।”
পল্টু বলল, “না, তা কী করে হয়? আপনার জন্য আনলাম তো। আপনি খান আগে।”
অগত্যা জিনিয়াকে একটা মাছভাজা খেতে হল, এবং সঙ্গে সঙ্গে কাঁটা বিঁধল। ছোটো মাছের কাঁটা। গলায় থাকবে না বেশিক্ষণ, কিন্তু কাশি হতে শুরু করল।
পল্টু শশব্যস্ত হয়ে বলল, “স্যার মুড়ি আছে? মুড়ি খেলে ঠিক হয়ে যাবে।”
উদ্দালক বলল, “মুড়ি মনে হয় শেষ হয়ে গেছে। নিয়ে আয় শিগগির।”
পল্টু দৌড়োল।
জিনিয়ার ছোটো মাছ খাওয়া অভ্যাস নেই। বাড়িতে থাকতেও সে খেত না। কাশতে কাশতে বমি চলে এল তার। উদ্দালক জিনিয়ার হাত ধরে বলল, “চলুন চলুন। আপনি ছোটো মাছ খান না বলবেন তো!”
বেসিনে গিয়ে খানিকটা কেশে গলায় আঙুল দিয়ে কাঁটা বের করতে খানিকটা বমি হয়ে গেল।
উদ্দালক জিনিয়াকে ধরে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে মাথায় ঘাড়ে জল দিয়ে বলল, “এখন ঠিক লাগছে?”
জিনিয়ার কাশি থেমেছিল। সে কোনওমতে বলল, “খানিকটা।”
উদ্দালক জিনিয়ার হাত ধরে বলল, “দেখি নাড়িটা।”
জিনিয়া হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, “নাড়ি দেখার কী আছে? আমার কি জ্বর এসেছে?”
উদ্দালক বলল, “তাও ঠিক, জ্বর আসবে কেন? তবু আপনি শুয়ে পড়ুন। অনেক কাশলেন তো।”
জিনিয়া বলল, “আপনাকে অত ভাবতে হবে না। আপনি আপনার কাজ করুন।”
উদ্দালক বলল, “সে তো করছি। আপনি অসুস্থ হয়ে গেলে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে না?”
জিনিয়া বলল, “কী ভাববেন? বিকেলবেলা ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোলেন। কোনও সুস্থ মানুষকে দেখিনি বিকেলবেলা এভাবে ঘুমোতে পারে।”
উদ্দালক বলল, “ওহ, সে তো একটু ঘুমোতেই হবে, নইলে রাতে পড়ব কী করে? কেন, আপনি কি বেরোতেন কোথাও?
জিনিয়া বলল, “বাজার যেতে হত আমায়। কিছু জিনিস কেনার ছিল।”
উদ্দালক বলল, “আরে এই ব্যাপার? লিখে দিন না কী লাগবে, পল্টু নিয়ে আসবে।”
জিনিয়া কয়েক সেকেন্ড কড়া চোখে উদ্দালকের দিকে তাকিয়ে বলল, “পল্টুকে দিয়ে সব আনানো সম্ভব? আপনার কি বই বাদ দিয়ে অন্য কোনও বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারেই নেই?”
উদ্দালক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে জিভ কেটে বলল, “এ বাবা, সরি, সরি। আচ্ছা আপনি তৈরি হয়ে নিন। ঘুরে আসি বাজার থেকে।”
জিনিয়া বলল, “মাছগুলো কে খাবে?”
