রুমকি আবার ফোন করছে।
আদিত্য কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে ধরল, “হ্যালো।”
রুমকি বলল, “তুমি কেটে দিলে কেন?”
আদিত্য বলল, “কেটে গেছে। বলো কী বলবে। ঝুমকি আমার পাশে আছে নাকি এটা বোঝার জন্য ফোন করেছ তো?”
রুমকি একটু চুপ করে থেকে বলল, “মা খুব কান্নাকাটি করছে। ঝুমকিকে দেখতে চাইছে। আমি মাকে নিয়ে আসছি।”
আদিত্য বলল, “হ্যাঁ, আর ওরা বুঝে গিয়ে এ বাড়িতে অ্যাটাক করুক। এরকম হলেই ভালো হয়, তাই না?”
রুমকি বলল, “আমি সেটা বলিনি। মা কাঁদছে, বাবা চিন্তা করছে, আমি কী করব?”
আদিত্য বলল, “জানি না কী করবে, তবে তোমার মা এলে ওরা ঠিক জেনে যাবে। ওরা নিশ্চয়ই আমাদের বাড়ির দিকেও নজর রাখছে।”
রুমকি বলল, “তাহলে আমি যাচ্ছি। আমি তো নিজের বাড়ি যেতে পারি, নাকি তাও না?”
রুমকির গলাটা শ্লেষাত্মক শোনাল। আদিত্যর মাথাও খানিকটা গরম হল, বলল, “এসো। আমারও তাহলে অফিস ফেলে বাড়িতে বসে থাকতে হয় না। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে আমারও যে খুব ভালো লাগে, তা তো নয়।”
রুমকি বলল, “ঠিক আছে। আমিই যাচ্ছি। আর বাবা বলছিল ঝুমকিকে শুদ্ধিকরণ করাবে।”
আদিত্য বলল, “গো-মূত্র খাওয়াবে বুঝি? আর গোবর? এগুলোই বাকি আছে তো! এসবই করো তোমরা।”
রুমকি বলল, “তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? রাগার তো কিছু নেই! ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওকে অন্য একটা ধর্মের লোকজন নিয়ে গেছে, রেপ করেছে, সেটার শুদ্ধিকরণ করা দরকার না?”
আদিত্যর মনে হচ্ছিল মাথা এত গরম হচ্ছে যে কেউ ইচ্ছা করলে মাথায় অমলেট ভেজে ফেলতে পারে। ভীষণ জোরে চ্যাঁচ্যাতে ইচ্ছা করছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বলল, “তুমি এসো। এসে আমাকে উদ্ধার করো। আর যন্ত্রণা দিয়ো না। এসব কথা আমাকে বলবে না দয়া করে। আমি নিতে পারছি না।”
রুমকি বলল, “এখন বেরোচ্ছি আমি। তুমি কিছু খেয়েছ?”
আদিত্য বলল, “সেসব তোমার জানার দরকার নেই। বললাম তো, এসে উদ্ধার করো আমায়!”
রুমকি বলল, “ঠিক আছে, আমি বেরোচ্ছি। রাখলাম।”
আদিত্য ফোন কেটে গুম হয়ে বসে রইল।
৪০
রুমকি এসেছে। একাই। বাবা বা মা কাউকে আনেনি।
আদিত্য দরজা খুলতে রুমকি তাকে দেখে বলল, “ঝুমকি কোথায়?”
আদিত্য বলল, “গেস্ট রুমে।”
রুমকি ঘরে ঢুকলে আদিত্য দরজা বন্ধ করল।
রুমকির গলা পেয়েছিল ঝুমকি। একপ্রকার ছুটে চলে এল।
রুমকিকে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল, তাকে একপ্রকার চমকে দিয়ে রুমকি ঝুমকিকে জোরে একটা চড় কষাল।
ঝুমকি কেঁদে ফেলল।
রুমকি বলল, “এটা তুই কী করেছিস? একবার আমাকে বলতে পারতিস না?”
ঝুমকি কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়ল।
আদিত্য কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ঘরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর রুমকি এসে বলল, “তুমি ও ঘর থেকে চলে এলে কেন?”
আদিত্য বলল, “কী করব? তুমি এসে গেছ যখন তুমিই দ্যাখো। আমার অফিস যেতে হবে কাল থেকে।”
রুমকি বলল, “সে যা খুশি করো, ঝুমকিকে ও বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। বাবা বলল, প্রায়শ্চিত্তর ব্যবস্থা করে দেবে।”
আদিত্য রাগল না। ঠান্ডা মাথায় রুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “একটা রিকশা আর একটা মাইকের ব্যবস্থা করে দেব? তাহলে বেরিয়ে সবাইকে বলে বেড়াতে পারবে ঝুমকি বাড়ি ফিরে এসেছে? রিন্টুদেরও তাহলে দলবল নিয়ে এসে তোমাদের বাড়ি ভাঙচুর করতে সুবিধা হবে।”
রুমকি একটু থতোমতো খেয়ে পরমুহূর্তে সামলে নিয়ে বলল, “তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? রাগ করার মতো কিছু বলেছি?”
আদিত্য বলল, “নাহ। কিছুই বলোনি। শোনো সুশোভনের সঙ্গে কথা না বলে আমি অন্য কোনও কিছু ভাবতে পারছি না।”
রুমকি খাটে বসে বেডকভারের দিকে কয়েক সেকেন্ড তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
তারপর বলল, “ছেলেটা ঝুমকিকে রেপ করেছে। প্রোটেকশনও নেয়নি। আমার মনে হয় বোনের মেডিক্যাল টেস্ট করা দরকার। যদি কোনও অঘটন হয়? যদি কোনও রোগ এসে যায়?”
আদিত্য বলল, “তোমার কোনও ধারণা আছে ওদের র্যাকেটটা ঠিক কত বড়ো? কত শক্তিশালী ওরা? দুটো দিন যেতে দাও।”
রুমকি বলল, “মেডিক্যাল টেস্ট এখনই করতে হত।”
আদিত্য বলল, “বেশ তো, করা হবে।”
রুমকি গুম হয়ে কয়েক সেকেন্ড বসে থেকে বলল, “বোনটা এই দুদিনেই কেমন যেন হয়ে গেছে। একবার ভাবছি কষিয়ে পরপর চড় মারি, আর-একবার মনে হচ্ছে বুকে জড়িয়ে ধরি।”
আদিত্য চুপ করে রইল।
রুমকি নরম গলায় বলল, “আমি তোমার সঙ্গে মিসবিহেভ করেছি। ঠিক করিনি। আমার ভুল হয়ে গেছে।”
আদিত্য অবাক হল। রুমকি ক্ষমা চাইছে? সূর্য কোনদিকে উঠেছিল আজ কে জানে! সে বলল, “সুশোভন সিকিউরিটির ব্যবস্থা করবে। তবু তুমি বেরোলে একা বেরিয়ো। ঝুমকিকে নিয়ে বেরোবে না। ব্যালকনিতেও যেন ঝুমকি না যায় খেয়াল রাখবে। এভাবে কোনও দোষ না করে কতদিন এভাবে থাকতে হবে সেটা যদি জানতাম।”
রুমকি খানিকটা ইতস্তত করে বলল, “বাবা বলছিল ঝুমকিকে মুম্বইতে যদি দিয়ে আসা যেত। বাবার এক বন্ধুর ছেলের জন্য মেয়ে দেখা চলছে। ওদের কিছু না বলে কোনওভাবে বিয়েটা দিয়ে দিতে পারলে ভালো হত। বাবার সঙ্গে একবার কাকাবাবুর ঝুমকিকে নিয়ে কথা হয়েছিল। সেবারে কথা বেশি এগোয়নি। কোনওভাবে যদি পাঠানো যেত…”
আদিত্য কয়েক সেকেন্ড রুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “ঝুমকিকে জিজ্ঞেস করেছ ঠিক এই মুহূর্তে ও আর-একটা সর্বনাশের জন্য প্রস্তুত নাকি? আর মুম্বই যাবার কথা বলছ? আমাকে নিয়ে যেতে হবে? পারলাম না। যে শহরে জন্মেছি, বড়ো হয়েছি, মানুষ হয়েছি, আমার কাছে সে শহরের থেকে বেশি নিরাপদ শহর আর কিছু হয় না।”
