রুমকি বলল, “তুমি কি চাও ঝুমকি এ বাড়িতেই থেকে যাক?”
আদিত্য বলল, “আমার চাওয়া না-চাওয়ায় কিছু যায় আসে না। এভাবে বেশিদিন চলবেও না। সত্যিটা সবাই জেনে যাবে কদিন পর। একটা জলজ্যান্ত মেয়েকে এভাবে মৃত দেখানো তো সম্ভব না। ওরা জানলেই প্রেশার পলিটিক্স শুরু করবে।”
রুমকি বলল, “যদি ঝুমকির পেটে বাচ্চা চলে আসে তাহলে সেটাকে নষ্ট করার মতো কোনও ডাক্তার চেনো?”
আদিত্য বিরক্ত চোখে রুমকির দিকে তাকাল।
৪১
রুমকি ঝুমকির কাছে গিয়ে বসেছে। দু বোনে মিলে কান্নাকাটি করছে।
আদিত্যর অসহ্য লাগছিল। রুমকি এরকম কেন? একদিকে তাকে সন্দেহও করছে, আর-একদিকে বোনের কাছে গিয়ে করুণাসাগর সাজছে।
একটা সম্পর্কে কেউ থাকলে খামোখা সন্দেহ আসবে কেন? একসঙ্গে থাকার পরে রুমকি তাকে এখনও চিনে উঠতে পারল না। সব পুরুষ কি এক হয়? একজন পুরুষ ধর্ষণ করে, আর-একজন পুরুষ তো মেয়েদের রক্ষাও করে। হাতের সব আঙুল কখনও সমান হয় না রুমকি বুঝবে না? পুরুষ মানেই খারাপ, চরিত্রহীন, আর মেয়ে মানেই অসহায়, এই সরলীকরণ হাস্যকর।
আদিত্য কিছুক্ষণ খাটে শুয়ে থেকে উঠল। তৈরি হয়ে বেরিয়ে রুমকিকে বলল, “আমি একবার অফিস থেকে ঘুরে আসছি। দেখা করে আসাটা দরকার। ঝুমকিকে নিয়ে কোথাও বেরোবে না। বাড়িতে কেউ এলে ঝুমকি যেন বাইরে না যায়। কেউ না, এমনকি পাশের বাড়ির কাকিমা এলেও ঝুমকি সম্পর্কে কোনও কথা বলবে না। বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাইছি?”
রুমকি বলল, “আমি তো ভাবছিলাম তুমি থাকলে ওকে সন্ধে হলে বাড়িতে নিয়ে যাব।”
আদিত্য বলল, “বললাম তো এখন বের করা সম্ভব না। ওদের কড়া নজর থাকবে। সুশোভনের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী স্টেপ ঠিক করব। যদি কোনও অশান্তি না চাও, তাহলে দয়া করে আমি যেমন বলছি সেভাবে চলো।”
রুমকি বলল, “ঠিক আছে।”
আদিত্য বলল, “দরজাটা বন্ধ করে দাও।”
রুমকি বেরোল। ঘরের বাইরে এসে বলল, “তুমি রাগ করে আছ?”
আদিত্য জুতো পরতে পরতে বলল, “কেন, রাগ করার মতো তুমি কী করেছ?”
রুমকি বলল, “ঠিক আছে, সাবধানে যেয়ো।”
আদিত্য বলল, “দয়া করে কোনওরকম ওপর চালাকি করবে না ঝুমকিকে নিয়ে। মারাত্মক সেনসিটিভ একটা ইস্যু শহর জুড়ে তৈরি হয়ে আছে। ছোটোখাটো কোনও কিছু হয়ে নেই ব্যাপারটা। তুমি নিজেও বুঝতে পারবে না কী থেকে কী হয়ে যেতে পারে।”
রুমকি বলল, “ওপরচালাকি কথাটা কেন ইউজ করলে? আমি কী ওপরচালাকি করি?”
আদিত্য বলল, “অনেক কিছুই করো। সব কিছু তো বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলতে পারি তোমার একটা ছোটো ভুল বা পাকামি তোমার ফ্যামিলির প্রতিটা মানুষের লাইফ থ্রেট হতে পারে। আশা করি বোঝাতে পারলাম।”
রুমকি রেগে গেল, “তুমি আমাকে এভাবে ঠুকে ঠুকে কথা বলছ কেন? দুদিনে আমি খারাপ হয়ে গেলাম? আগে তো এরকম করে কথা বলতে না!”
আদিত্য বলল, “আগে এত বড়ো ক্রাইসিস কখনও আসেনি। আমি এভাবে তোমার সঙ্গে কথা বলছি, কারণ এভাবে কথা না বললে তুমি বুঝবে না। তোমার মাথায় ঢুকবে না। এই কারণেই তোমাকে বলিনি শুরুতেই। মেয়েটা যতক্ষণ ছিল না চিন্তা করলে, যেই ফিরল, প্রায়শ্চিত্ত থেকে শুরু করে মুম্বই পাঠিয়ে দেওয়া অবধি ভেবে ফেলছ। এর থেকে হাস্যকর আর কিছু হয় না। এই মুহূর্তে, যেখানে আমাদের সব কিছু থিতিয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করে যাওয়া উচিত ছিল, তোমরা সেখানে ঝামেলা করার জন্য একের পর এক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে দিয়েছ। আমার তোমাদের বলাটাই ভুল হয়েছে। আরও পরে বলতে হত।”
রুমকি বাঁকা সুরে বলল, “আচ্ছা, তাই বুঝি? না বললেই ভালো হত বলো? এভাবে চললেই তো ভালো ছিল!”
আদিত্য বেরোতে যাচ্ছিল, থমকে দাঁড়িয়ে বলল, “মানে? কী বলতে চাইছ?”
রুমকি কঠিন মুখে বলল, “যা বলছি বুঝতেই পারছ।”
আদিত্য চুপ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় বলল, “একটা ট্যাক্সি ডেকে দিচ্ছি, ঝুমকিকে নিয়ে এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। থাকতে হবে না। জাস্ট গেট লস্ট।”
রুমকি তার দিকে চমকে তাকিয়ে বলল, “মানে?”
আদিত্য বলল, “মানেটা পরিষ্কার, তোমাকে আর তোমার বোনের বা তোমাদের ফ্যামিলির অনেক হেল্প করেছি, করে যখন তুমি আমার দিকেই আঙুল তুললে তখন থাকল। জাস্ট বেরিয়ে যাও। আমি ডিভোর্স ফাইল করব। যা হবে দেখা যাবে।”
রুমকি তার দিকে আগুনে চোখে তাকিয়ে বলল, “এত বড়ো কথাটা তুমি বলতে পারলে?”
আদিত্য বলল, “হ্যাঁ, বলতে পারলাম। তুমি তার থেকেও অনেক বড়ো কথা বলেছ। আমি অনেকক্ষণ সহ্য করেছি। আর পারলাম না। জাস্ট বেরিয়ে যাও। নইলে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করব।”
রুমকি তার দিকে কয়েক সেকেন্ড আগুনে চোখে তাকিয়ে জোরে জোরে শব্দ করে ঝুমকির ঘরের দিকে এগোল।
৪২
সুশোভনকে ফোন না করেই পুলিশ কোয়ার্টারে পৌঁছে আদিত্য সমস্যায় পড়ল।
সুশোভন কোয়ার্টারে ছিল না। ফোন করে জানা গেল ওর ফিরতে আর-একটু দেরি হতে পারে। আদিত্য কমপ্লেক্সের বাইরে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিল। মাথা ঠিক নেই। রুমকি বাড়িতে এসে নতুন কী ঝামেলা তৈরি করবে বোঝা যাচ্ছে না।
চায়ের দোকানে মন্দির নিয়ে আলোচনা চলছে। মসজিদ ভাঙা হয়েছিল, তার জায়গায় মন্দির হবে। মানুষ বেশ খুশি।
আদিত্যর অস্বস্তি হচ্ছিল। সবার খুশিই ভীষণ প্যাসিভ। নিজের জীবনে খুশির লেশমাত্র নেই মানুষের৷ অন্যের ক্ষতিতেই যেন আনন্দটা বেশি আসে আজকাল।
