সুশোভন সিরিয়াস হয়ে গিয়ে বললেন, “তুইও এভাবে কথা বলছিস কেন? একটা ঘটনা থেকে হঠাৎ এত জাজমেন্টাল হয়ে যাওয়ার তো কোনও কারণ নেই! তুই জামান সাহেবকে দেখিসনি? সবাই শুধুমাত্র লাভ জিহাদ করবে বলেই ভালোবাসে না রে ভাই। তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক যে এই মুহূর্তে একটা চক্র সক্রিয় হয়ে উঠছে।”
আদিত্য তেতো গলায় বলল, “এই মুহূর্তে কী রে, আমি খিদিরপুরে একটা ফ্যামিলিকে চিনি, পাঁচ ভাইয়ের পাঁচজনই ব্রাহ্মণ মেয়ে বিয়ে করেছে। এরা হিন্দু মেয়েদের টার্গেট বানায়। কোথায়, একটা মুসলিম মেয়ে যখন হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করে ওরা চুপ করে বসে থাকে দেখেছিস? এদের কী করা উচিত জানিস? হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো, সবকটাকে একসঙ্গে ঢুকিয়ে মেরে ফেলা উচিত। সমাজ থেকে কতগুলো জঞ্জাল দূর হবে। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, আর সবাইকে কনভার্ট করতে হবে। কেন রে? কনভার্ট করে কী হবে?”
আদিত্য চেঁচিয়ে ফেলেছিল। আশপাশের টেবিল থেকে সবাই তার দিকে তাকাল। আদিত্য চুপ করে গেল।
সুশোভন বললেন, “আদিত্য, ভেতরের পশুটাকে বের করিস না। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা পশু লুকিয়ে আছে। কেউ ইন্ধন পেয়ে সেটাকে বের করে ফেলি, কেউ বা আজন্মকাল সযত্নে সেটাকে লুকিয়ে রেখে দি। ভেতরে ভেতরে আদতে আমরা সবাই মারাত্মক কমিউনাল। রেড রোডে নামাজ পড়তে দেখলে কখনও শ্লেষ করি, হিন্দুদের ধর্মের জন্য মাতামাতি করতে দেখলে ওরাও হাসাহাসি করে। সমস্যাটা হল, যত দিন যাচ্ছে, মানুষের মধ্যে ধর্মবোধটা বড্ড বেশি চাগাড় দিচ্ছে। মনে করে দেখ, আমাদের ছোটোবেলায় এসব ব্যাপার এতটা ছিল না। ইদানীং সবাই কেমন আফিমের মতো সব কিছু ভুলে ধার্মিক হয়ে উঠছে। কিন্তু এটা কি সলিউশন? আই উইশ, সবরকম ধর্মকে একবারে তুলে দেওয়া যেত। পৃথিবীর আসল সমস্যাগুলোর দিকে কেউ নজর দেবে না, পলিউশন, ক্যান্সার, গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে ভাববে না, সারাক্ষণ ধর্ম ধর্ম করে যাচ্ছে। এই রিন্টু ছেলেটা ফিজিক্সে অনার্স জানিস? ফিজিক্স, ভাব জাস্ট। সে ছেলে এরকম ব্রেনওয়াশড হয়ে গেল। তুই, তোর মতো একটা সেনসিটিভ ছেলে এখন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের কথা বলছিস। নিজে ঠান্ডা মাথায় ভাবিস তো, কী বললি। কেন এগুলো তোর মাথায় আসবে?”
আদিত্য লজ্জিত হল। বলল, “হুঁ। ঠিকই। আমার মাথা কাজ করছে না অ্যাকচুয়ালি।”
সুশোভন বললেন, “স্বাভাবিক। মানুষের মাথা যেখানে কাজ করা বন্ধ করে এরকম পরিস্থিতিতে, তখন থেকেই তারা কোণঠাসা হয়ে গিয়ে এসব ভাবতে, বলতে শুরু করে। তা ছাড়া ইন্ধন দেওয়ার মানুষের তো অভাব নেই। সাধে কি আর আমাদের দেশে সামান্য কোনও মাংস থেকে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়া সম্ভব? ফ্রাস্ট্রেটেড হতে হতে মানুষ চিন্তাভাবনা করা ছেড়ে দিচ্ছে। সারাক্ষণ ধর্মের আফিমে বুঁদ হয়ে থাকতে চাইছে। বিলিভ মি আদিত্য, এগুলো সলিউশন নয়। মানুষকে মেরে ধর্ম শেখানো কোনও সলিউশন হতে পারে না।”
আদিত্য একগ্লাস জল খেল। তারপর বলল, “কী করব এবারে?”
সুশোভন বললেন, “মাথা ঠান্ডা কর। সিচুয়েশন এসেছে, হ্যান্ডেল কর। রাগ করিস না। বউকে বোঝা। জীবন এতটাও কঠিন না যতটা আমরা করে দি।”
আদিত্য চুপ করে বসে রইল।
৩৯
আদিত্য ঘরে ঢুকলে ঝুমকি জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকাল।
আদিত্য বলল, “খেয়ে নিস। খাবার এনেছি।”
ঝুমকি বলল, “আচ্ছা। ও বাড়ির কী খবর?”
আদিত্য খাবারের প্যাকেট টেবিলের ওপর রেখে বলল, “তোর বাবা মা দিদি চিন্তা করছিল দেখে বলে দিয়েছি তুই এখানে আছিস।”
ঝুমকি বলল, “ওরা কী বলল?”
আদিত্য চেয়ার টেনে বসল, “পরিস্থিতি ভাল। তোর বাবা যেমন মারমুখী হয়ে ছিলেন এখন অতটা নেই। আশা করছি তোর হোম ফ্রন্ট বেশি ঝামেলা করবে না আর।”
ঝুমকির মুখ আলোকিত হল, “সত্যি?”
আদিত্য মাথা নাড়ল, “হুঁ। আর তোর ওই জানোয়ারটা আবার চমকাতে চেষ্টা করছে। ভালোবাসার টান আর কি। খুব ভালোবাসে তোকে বোঝাই যাচ্ছে।”
ঝুমকি বলল, “ভালোবাসা কতটা সেটা তো বুঝেছি। সবটাই দখল করে রাখার চেষ্টা। মানুষ যে এত তাড়াতাড়ি এভাবে চেঞ্জ হয়ে যেতে পারে ওকে না দেখলে আমি বিশ্বাস করতে পারতাম না।”
আদিত্যর ফোন বাজছিল। আদিত্য দেখল রুমকি ফোন করছে। আদিত্য ফোনটা ঝুমকির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ধর, তোর দিদি।”
ঝুমকি বলল, “তুমি কথা বলবে না?”
আদিত্য বলল, “কথা বল।”
ঝুমকি ফোনটা ধরল, তিরিশ সেকেন্ড কথা হতে পারল না কাঁদতে শুরু করল।
আদিত্য উঠে নিজের ঘরে গেল। ভালো লাগছিল না তার।
মানুষ অনেক মানুষের মধ্যে থেকেও কখনও কখনও একা হয়ে পড়ে। খাটের ওপর বসে দেওয়ালে টাঙানো বিয়ের ফটোর দিকে চোখ গেল। দুজনে কী সুন্দর হাসছে! একটা ছবি কত ভুল বার্তা দিতে পারে!
খালি চোখে দেখে যেটা মনে হয়, বাস্তবটা তার থেকে কখনও কখনও অনেক দূরে হয়। রুমকির সন্দেহপ্রবণতা এমন হল যে নিজের বোনকে নিয়েও সন্দেহ করতে ছাড়ল না! এত দিনে তাকে এই চিনল?
দীর্ঘশ্বাস ফেলল আদিত্য। একইসঙ্গে বিরক্ত হল। অফিসে বেশ কিছু কথা শুনতে হবে তাকে। এভাবে ডুব দেওয়া যে ঠিক না তার থেকে আর কে ভালো বোঝে!
ঝুমকি নক করল, “দিদি কথা বলবে।”
আদিত্য বলল, “আচ্ছা দে।”
ঝুমকি ফোনটা দিয়ে চলে গেল।
আদিত্য ফোন কানে না নিয়ে কেটে দিল।
