আমি বললাম, “কেন? কথা না বলার কী আছে? কথা বললে কি গায়ে ফোসকা পড়ে? তুইও তো অয়নদার সঙ্গে কথা বলিস, আমি কিছু বলতে গেছি?”
দিদি আমার দিকে কটমট করে খানিকক্ষণ চেয়ে বলল, “খুব বেড়েছিস তুই। দাঁড়া দাদা এবার ফিরুক, তোর মোবাইলটা যদি না নিয়েছি তোর কাছ থেকে।”
আমি বললাম, “এই তোর শুধু আমার মোবাইলটার দিকে নজর কেন রে? এর মধ্যে আমার মোবাইলটা এল কোত্থেকে?”
দিদি বলল, “এই মোবাইলের জন্যই তুই এত পাকা পাকা কথা বলছিস। তোকে না মা বারবার বলেছে রাস্তায় অজানা অচেনা ছেলেদের সঙ্গে একদম কথা বলবি না? খুব পেকেছিস তুই।”
আমি দিদিকে একটা ভেংচি কেটে ছাদে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি পাগলটা কোত্থেকে একটা মুরগির ঠ্যাং জোগাড় করেছে। আমাকে দেখে মিটমিট করে তাকাল আমার দিকে। তারপর ঠ্যাংটা দেখিয়ে দেখিয়ে খেতে লাগল। আমি বেশ খানিকক্ষণ পাগলটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর আমিও পাগলটাকে একটা ভেংচি কাটলাম। সেটা দেখে পাগলটা খুব মজা পেয়ে গেল। আমি পাগলটাকে আবার ভেংচি কাটলাম। পাগলটা জোরে জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে ঠ্যাংটা এমনভাবে চিবোতে লাগল যেন ঠ্যাংটা ছিঁড়েই খেয়ে নেবে। আমি অনেকক্ষণ ধরে হাসলাম। পাগলটা তারপর আমাকে দেখে জোরে জোরে মাথা নাড়তে লাগল।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাগলামি দেখছিলাম, হঠাৎ দেখি একটা পুলিশের গাড়ি এসে আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়াল। কয়েকজন পুলিশ নেমে আমাদের বাড়ির কলিংবেল টিপল।
আমি সেটা দেখে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলাম। মা রান্নাঘরে ছিল। আমাকে দেখে ইশারায় সামনের ঘরে যেতে বারণ করল। আমি ছটফট করছিলাম। দিদিও রান্নাঘরেই ছিল। বুঝলাম বাবার সঙ্গে পুলিশেরা কথা বলছে।
মিনিট দশেক পরে ওরা চলে যেতেই আমরা সামনের ঘরে গিয়ে দেখি বাবা চুপ করে বসে আছে। মা উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, “কী হল? পুলিশ এসেছিল কেন?”
বাবা একবার মা-র দিকে আর-একবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “রূপমকে খুঁজতে। আমি যখন বললাম এখন কলকাতা গেছে, বলল ফিরলে থানায় গিয়ে যেন দেখা করে।”
দিদি বলল, “দাদাকে খুঁজতে কেন? দাদা কী করেছে?”
বাবা দিদির ওপর রাগত স্বরে বলল, “আমি কী করে জানব? আমাকে বলেছে?”
মা ভয় পেয়ে গেছিল, বলল, “ছেলেটা বাড়িতে এসেছে, এ আবার কী ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল?”
বাবা বলল, “সেটাই তো বুঝছি না। কী করা যায় বলো তো? বাপ্পাকে বলব?”
মা বলল, “আগে রূপমকে ফোন করি দাঁড়াও।”
বাবা আমাকে বলল, “মিলি, তোর দাদাকে ফোন কর তো।”
আমার হাতে সবসময় ফোন থাকে। কথাটা শোনার পর থেকে আমার বুকটা কেমন ধড়ফড় করছিল। কোনওমতে আমি দাদাকে ফোন করলাম। দুটো রিং হতেই দাদা ফোন ধরল, বললাম, “এই দাদা তুই কোথায়?”
দাদা বলল, “এই তো একটু বাজারে এসেছি। কী হল আবার?”
বললাম, “পুলিশ এসেছিল, তোকে খুঁজতে।”
দাদা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বলল, “কী বলল?”
মা জোর করে আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বলল, “তুই বাপ্পাকে ফোন কর তো। কী নিয়ে আবার ডাকছে আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!”
দাদা কিছু একটা বলে ফোনটা কেটে দিল। মা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, “ছেলেটা এত জেদি! আর ভালো লাগে না কিছু আমার!”
৩৭
রূপম ফোনটা রাখার পর শ্রাবন্তী বলল, “কী হল? কে ফোন করেছে?”
রূপম বলল, “বাড়ি থেকে।”
শ্রাবন্তী বলল, “ওহ, কে মিলি?”
রূপম বলল, “হ্যাঁ।”
শ্রাবন্তী বলল, “কী হয়েছে?”
রূপম শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে বলল, “কিছু না। পুলিশ আমার খোঁজ করছিল।”
শ্রাবন্তী অবাক হয়ে বলল, “পুলিশ? খোঁজ করছিল? কেন?”
রূপম বলল, “আমি কী জানি? বলেছে বাড়ি ফিরলে থানায় যেতে।”
শ্রাবন্তী খানিকক্ষণ রূপমের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কী করবে?”
রূপম বলল, “এখনই রওনা দেব। থানায় গিয়ে দেখা করব।”
শ্রাবন্তী বলল, “এত তাড়া?”
রূপম বলল, “আমি না থাকলে সেটা যে আরও সন্দেহের সৃষ্টি করে সেটা বোঝো?”
শ্রাবন্তী গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর বলল, “যত সব উটকো ঝামেলা সব আমার কপালেই জোটে। যে মেয়েটার কথা আমি কোনওদিন জানতেও পারিনি, কোত্থেকে উড়ে এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে।”
রূপম কয়েক সেকেন্ড শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে বলল, “মেয়েটা মারা গেছে শ্রাবন্তী।”
শ্রাবন্তী রূপমের চোখে আগুনে চোখ দিয়ে তাকাল। তারপর রেগেমেগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেল। রূপম স্নান সেরে তৈরি হয়ে বেরোতে যাচ্ছিল এই সময়ে শ্রাবন্তীর মা-র সাথে দেখা হয়ে গেল। বললেন, “তুমি কোথায় যাচ্ছ হঠাৎ?”
রূপম বলল, “বাড়ি যাচ্ছি, একটা আর্জেন্ট কাজ পড়ে গেল।”
শ্রাবন্তীর মা তাকে একপ্রকার জোর করেই খাইয়ে দিলেন। রূপম বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে স্টেশনে পৌঁছোতে হবে।
***
-আপনি ভদ্রমহিলাকে কতদিন ধরে চেনেন?
ওসি মাইতিবাবুর সামনে বসে ছিল রূপম।
প্রশ্নটা শুনে বলল, “অনেকদিন থেকেই। একসাথে পড়তাম আমরা।”
-হুঁ। রিলেশন-টিলেশন ছিল?
-কেন বলুন তো?
-তদন্তের স্বার্থে। জানাটা প্রয়োজন।
রূপম বেশ কিছুক্ষণ মাইতিবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার কি মনে হয়, এটা আমি করেছি?”
মাইতিবাবু রূপমের দিকে তাকালেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর বললেন, “শুনুন রূপমবাবু, আপনার বয়স কম, অভিজ্ঞতা কম। তবু আপনাকে একটা কথা বলে রাখি। এই যে আমরা পুলিশে কাজ করি, আমাদের নামে অনেক অভিযোগ আছে, কেউ বলে ঘুষখোর, কেউ বলে চরিত্রহীন, কেউ বলে রাজনৈতিক ছাতা ধরে চলি, কেউ বলে মেরুদণ্ডহীন… এইসব অভিযোগের অনেক কিছুই সত্যি। কিন্তু একটা কথা বলি, পুলিশের সামনে যখন বসে আছেন, তখন এত অ্যাগ্রেসিভ হবেন না।”
