রূপম বলল, “তুমি যদি অ্যাবর্ট করো তাহলেও তো এই সবকিছুর মধ্যে দিয়েই তোমাকে যেতে হবে, তাই না?”
শ্রাবন্তী আবার চুপ করল। তারপর বলল, “পারব? আমি? তোমার কী মনে হয়?”
রূপম হাসল, বলল, “এবার তোমার মা বাবাকে বলো।”
শ্রাবন্তী লজ্জা পেল, “মাকে বলতে পারব। বাবাকে বলা যাবে না।”
রূপম বলল, “আচ্ছা। তাই কোরো।”
শ্রাবন্তী উঠল। “আচ্ছা। যাই।”
হঠাৎ রূপমের ভালো লাগল খুব। অনেকক্ষণ পরে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
৩৫
সকাল থেকে তিনটে মশা কেটেছে। গোকুলবাবু একটু ভয়ে ভয়ে আছেন। পাগল সাজা সবাই যত সোজা মনে করে ব্যাপারটা মোটেও অতটা সোজা না। নেহাত পেটের দায়। নইলে চাদ্দিকে যা ডেঙ্গি চলছে কার দায় পড়েছিল এই ধ্যাদ্ধেরে মফস্সলে পাগল সেজে বসে থাকার!
খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে শুরু থেকেই। সামনের বাড়ির দয়ালু মেয়েটা গোকুলবাবুকে দুপুরে আর রাতে একটু খেতে দেয়। নইলে খাওয়াটা নিয়ে সত্যিই চাপ হয়ে যায়।
বাজারে সকালে একটা কচুরির দোকানের সামনে গিয়ে বসেন তিনি। চুপচাপ জুলজুল করে কচুরির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। প্রথম প্রথম দোকানদার তাড়িয়ে দিত। পরে দেখল এ পাগল নাছোড়বান্দা আছে। অগত্যা দুটো কচুরি আর একটু তরকারি শালপাতার বাটিতে করে দিত।
আপাতত এই ব্যবস্থাই আছে। দাড়ি বেশ বড়ো হয়েছে। বহুদিন স্নান করেন না তিনি। সে অভ্যাসও হয়ে গেছে। তবে মাঝে মাঝে বিরক্ত যে একেবারে লাগে না সে কথা বললে ভুল হবে। তখন মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে বাড়ি চলে যান।
চলেও যেতেন, কিন্তু ওই মেয়েটার জন্যই আটকে আছেন। আজকাল মনে হয় প্রেমেই পড়ে গেছেন মেয়েটার। অবশ্য মেয়েটার দিক দিয়ে এরকম কোনও সিগন্যাল আসা সম্ভব না। রাস্তার পাগলের সাথে কোনও মেয়ে প্রেমে পড়বে এটা কোনও সিনেমাতেও সম্ভব না।
গোকুলবাবু তবু মাঝে মাঝে ঝিমুনির ফাঁকে নিজের ছোটোখাটো সংসারের স্বপ্ন দেখেন। রূপসী থাকবে আর তিনি থাকবেন, একটা ছোটো মেয়ে থাকবে, বড়ো সাহেবকে পরিষ্কার বলা থাকবে পাগলের ডিউটি অনেক হয়েছে, এবার তিনি সিনিয়র হয়েছেন, দয়া করে রেহাই দেওয়ার কথা চিন্তা করা হোক।
ভোরের স্বপ্নটাও সেরকমই দেখছিলেন তিনি। বেশ একটা ঘোর ঘোর লেগেছিল। ফুটপাথে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে স্বপ্ন দেখতে ভালোই লাগছিল তার। ঘুম থেকে উঠে পাড়ার কলে মুখ-টুখ ধুয়ে নিলেন। লোকেরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে পাগলে। এখন আর কেউ কিছু বলেও না। প্রথম প্রথম পাড়ার ছেলেরা ঢিলও ছুঁড়েছে। দু-চারটে ঢিল, চড়চাপড়, গণধোলাই খাওয়া, সমস্ত ট্রেনিংই থাকে তাঁদের। ধীরে ধীরে পাড়ার ছেলেপিলেও হাল ছেড়ে দিয়েছে। পাগল থিতু হয়ে গেছে পাড়ায়।
বাজার টহল দিতে বেরোলেন গোকুলবাবু। দু-দিন আগে রূপসীদের বাড়ির রাস্তায় বাজারের এক দোকানদারকে মিলিকে ফলো করতে দেখেছিলেন তিনি। ঠিক করলেন তার দোকানের সামনে গিয়েই বসবেন। সিক্সথ সেন্স কিছু কিছু কথা বলে তাঁকে, গোকুলবাবু জানেন, এই কাজে সিক্সথ সেন্স প্রবল থাকা বড়োই জরুরি। ডিপার্টমেন্টের লোকেরা বলে গোকুলের সিক্সথ সেন্স প্রবল, কিন্তু এটা একটা লাইফ হল? গোকুলবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বাজারের দুটো কুকুর পিছু নিয়েছে তাঁর। গোকুলবাবু দৌড়োন না। দৌড়োলে কুকুর বুঝে যায় ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। তখন আরও বেশি করে তাড়া দেয়।
নারানের দোকানের সামনে গিয়ে চুপচাপ বসেন তিনি। ছ-মাসের না-কামানো দাড়ি, চুল, গায়ে একটা ছেঁড়া জামা, লুঙ্গি, স্নান-না-করা উশকোখুশকো চেহারার গোকুলবাবু চুপচাপ বসে থাকেন।
নারান দোকানে এসে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্মী আর গণেশ পুজো করে। পাগলটাকে বসতে দেখে বিরক্ত হল। কাল এই পাগলটাই তাকে তাড়া করেছিল, এখন আবার গন্ধে গন্ধে চলে এসেছে। দোকানের ছেলেটা আজ আসেনি। কোথায় গেছে দিদির বিয়ে ইত্যাদি বলে। প্রায়ই ছুটকোছাটকা ছুটি নিচ্ছে আজকে ছেলেটা ।
নারান পুজো দিতে দিতেই ভাবতে লাগল পাগলটার হাত থেকে কীভাবে বাঁচা যায়। তার চোয়াল শক্ত হওয়া শুরু করল, ধর্ষণ করে খুন করা একটা নেশার ব্যাপার কিন্তু স্বাদবদলের জন্য একটা পাগল খুন করতে কি খুব ঝামেলা হবার কথা?
৩৬ মিলি
ছেলেগুলো যে কবে কথা বলতে শিখবে!
এইজন্য আমার নিজের বয়সি ছেলে একদম পছন্দ হয় না। একটা ছেলে দেখলাম না যে অয়নদার মতো কথা বলতে পারে।
কোচিং থেকে ফিরছিলাম। সকালবেলা। তাড়াতাড়ি পড়া হয়ে গেছিল বলে ভালোই লাগছিল। ক্লাসটেস্ট নেবেন, স্যার এইসব ভুজুংভাজুং দিয়ে ছেড়ে দিলেন। ফাঁকিবাজির মুডে ছিলেন। বাড়ি এসে টিভি দেখব বলে তাড়াতাড়ি আসছিলাম, এই সময়েই একটা ছেলে সাইকেল নিয়ে এসে হঠাৎ করে বলল, “এই তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?”
আমি বললাম। ছেলেটা তারপরে আর কথা খুঁজে পায় না। মানে বাড়ি থেকে মনে হয় একটা ডায়লগই মুখস্থ করে এসে বলে দিল।
আমি কোথাও গেলাম না। ছেলেটা কয়েক সেকেন্ড ধরে আমতা আমতা করতে লাগল। আমি বললাম, “তুমি আর কিছু বলবে?”
ছেলেটা সাইকেলটা বাঁইবাঁই করে চালিয়ে চলে গেল। আমি একা ছিলাম। আমার খুব হাসি পেয়ে গেল।
বাড়িতে দিদিকে এসে বলতেই দিদি আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, “তুই কথা বলতে গেলি কেন?”
