আমার হাত ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া অত সোজা নাকি!
অয়নদার রিপ্লাই এল, “আমি হ্যান্ডু? কোত্থেকে এসব শিখছিস মিলি? গাঁট্টা খাবি?”
আমি ফিউজ হয়ে গেলাম। যাহ্বাবা, যার ওপর আমার ক্রাশ সে যদি বলে বসে গাঁট্টা মারবে, সেটা কেমন একটা ইয়ে ইয়ে ব্যাপার হয়ে যায়!
কিছু না লিখে আবার সেই হাসতে হাসতে চোখের জল বেরিয়ে যাওয়া স্মাইলিটা পাঠিয়ে দিলাম।
অয়নদা রিপ্লাই করল, “তুই কি আবার বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে ফেললি নাকি? বলা যায় না। যা দিনকাল পড়েছে। পুঁচকি পুঁচকি মেয়েদেরও বয়ফ্রেন্ড দেখছি চারিদিকে।”
আমি তীব্র প্রতিবাদ করলাম, “আমি মোটেও পুঁচকি না অয়নদা। তা ছাড়া আমার বয়ফ্রেন্ড না থাকলেও আমার অনেক বন্ধুদেরই আছে। আর সেটা যথেষ্ট ম্যাচিওর রিলেশনশিপ। তোমার আর দিদির মতোই।”
এই সেই কেলো। মেসেজটা পাঠিয়েই বুঝলাম অতি উৎসাহিত এবং উত্তেজিত হয়ে আসলে বিরাট বাঁশ নিজেকেই নিজে দিয়ে দিয়েছি।
অয়নদা কী রিপ্লাই করল সেটা দেখার জন্য আর অপেক্ষা করলাম না। ফোনটা বন্ধ করে দিলাম।
অয়নদা দিদির সাথে আদৌ প্রেম করে কি না সেটা নিয়েই আমি কনফার্ম নই, এদিকে এটা লিখে দিলাম। যদি করেও থাকে, তাহলেও আমার ঝাড় খাবার সম্ভাবনা প্রবল, না করে থাকলে তো হয়েই গেল। পুরো শহিদ হয়ে গেলাম।
ফোনটা দূরে সরিয়ে রেখে ঠিক করলাম আগাম জামিন নিয়ে রাখি। দিদিকে জানিয়ে রাখতে হবে ঠারেঠোরে। নইলে আরও বড়ো কেচ্ছা অপেক্ষা করবে আমার জন্য।
বললাম, “এই দিদি।”
দিদি মোবাইলের দিকে চোখ রেখেই বলল, “বল।”
“বলছি, অয়নদা কি তোর বয়ফ্রেন্ড?” খুব নিরীহ গোবেচারা গলায় করলাম প্রশ্নটা।
দিদি এবার ফোনের থেকে মুখ সরাল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “মিলি… তুই কিন্তু এবার খুব পেকেছিস। এবার মার খাবি।”
আমি সেই গোবেচারা মুখেই বললাম, “আসলে অয়নদাকেও এখনই এই প্রশ্নটা করলাম তো।”
দিদি শুয়ে ছিল। উঠে বসে আমার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে থাকল।
৩৪
এক-একটা সকাল সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। আগের রাতে ছটফট করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ার পর একটা ঝলমলে সকাল কিছুক্ষণের জন্য হলেও দুঃখকষ্ট সব একদিকে সরিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
ভোর ছ-টাতেই ঘুম ভেঙে গেল রূপমের। আগের দিনের বৃষ্টি এখন আর নেই। সে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। সকাল ছ-টা মানে রীতিমতো সকাল। সবাই বেরিয়ে গেছে কাজে। গুরগাঁওতে থাকলে সেও উঠে পড়ে এই সময়টা। মাঝে মাঝে মর্নিং ওয়াকেও যায়। মোবাইলটা সুইচ অফ করে রাখা ছিল। এবার অন করল। বেশ কিছু মেসেজ এসেছে হোয়াটসঅ্যাপে। অফিস কলিগদের গ্রুপে ঢুঁ মারল না আর। এদের খেয়েদেয়ে কাজ নেই, সারাক্ষণ আদিরসাত্মক কথা বলে চলেছে।
হোয়াটসঅ্যাপ কন্ট্যাক্টসদের স্ট্যাটাসগুলো দেখছিল সে। এক-একজন বড়ো বড়ো কথা লিখে রেখেছে। বাণীগুলো দেখে হাসি পেয়ে গেল রূপমের। এত কথা বলার কি সত্যিই দরকার? সবকিছুই এত লোক দেখাবার জন্য কেন করা হয়? নিজেকে মাঝে মাঝে ব্যাকডেটেড মনে হয়।
বাপ্পার একটা মেসেজে চোখ পড়ল তার। একটা পেপার কাটিং পাঠিয়েছে। মোমের খবরটা করেছে এক কাগজ। এক পলক চোখ বুলিয়ে নিল সে। সবকিছুরই রাজনীতিকরণ করাটা এই দেশের বদভ্যাস হয়ে গেছে। কোথায় তদন্ত হবে তা না, রাজনীতিকরা থানায় ইট মারল, মন্ত্রী বলে দিল ওসি চেঞ্জ হবে, যেন ওসি চেঞ্জ হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। রূপমের মনটা আবার তেতো হয়ে গেল।
শ্রাবন্তী উঠে পড়েছিল। আর-একবার ইউরিন কালার টেস্টটা করবে বলছিল, সেটা করতেই ঢুকেছিল বাথরুমে। বেরিয়ে স্ট্রিপটা নিয়ে তার কাছে চলে এল। রূপম দেখল। আর-একবার রেজাল্ট পজিটিভ।
সে বলল, “তাহলে কনফার্ম?”
শ্রাবন্তী গম্ভীর মুখে বলল, “আর কী!”
রূপম বলল, “টেস্টগুলো তো বাড়িতেই এসে করে যাবে?”
শ্রাবন্তী বলল, “হ্যাঁ ওই ব্লাড নেবে।”
রূপম বলল, “তোমার মাকে বলেছ?”
শ্রাবন্তী বলল, “মাকে বললে তো হয়েই গেল। লাফাতে লাফাতে পাড়াময় রাষ্ট্র করতে শুরু করে দেবে। তার আগে তো আমাদের সিদ্ধান্তটা নিতে হবে তাই না?”
রূপম কাঁধ ঝাঁকাল, “আমার সিদ্ধান্ত তো বলেই দিয়েছি। নাও।”
তার কথা শুনে শ্রাবন্তী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “হ্যাঁ। তুমি তো তাই বলবে। আমার কথা আর ভাববে না।”
রূপম কিছু বলল না। শ্রাবন্তী অধৈর্য হল, “কী হল? কিছু তো বলো।”
রূপম বলল, “যা বলার বলে দিয়েছি। এবার তুমি বলো।”
শ্রাবন্তী চেয়ার টেনে বসল। তারপর বলল, “তুমি তো অফিসে চলে যাবে। তারপর সারাদিন বাচ্চা আমাকে দেখতে হবে। রান্না আছে তার ওপর। আমি পারব?”
রূপম বলল, “লোক রেখে দেওয়া যাবে। তা ছাড়া সবাই এভাবেই বাচ্চা নেয়। তুমি তো হাউসওয়াইফ। অফিস করেও কতজন বাচ্চা নিচ্ছে।”
শ্রাবন্তী বলল, “যারা নিচ্ছে তারা ঈশ্বর। আমি পারব না। তা ছাড়া কত কিছু করার ছিল আরও। এখন বাচ্চা হয়ে গেলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। কোথাও তো ঘুরতেও যাওয়া হল না সেরকম। এখনই বাচ্চা?”
রূপম বলল, “বেশ তো। তুমিই ঠিক করো কী করবে। ঘুরবে বলে বাচ্চা নষ্ট করে দেবে? এরপরে যদি আর না হয় তখন কী করবে?”
শ্রাবন্তী হাল ছেড়ে দেওয়া গলায় বলল, “আমি এখন কিছু বললে তো আমিই খারাপ হয়ে যাচ্ছি। ডাক্তার আন্টি, মা, তুমি, কেউ তো আমার কথা বুঝতে চাইছ না। আমি হাসপাতাল ভয় পাই। রক্ত… উফ… জাস্ট ভাবতে পারছি না।”
