সে ঠিক করল ডাক্তার দেখানো হয়ে গেলে শ্রাবন্তীকে নিয়ে কোনও সাউথ ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় যাবে। গুমোট পরিস্থিতিটা একটু কাটানো দরকার।
শ্রাবন্তী ঠিকই বলেছিল, তিন-চারজনের পরেই ডাক এসে গেল। ডাক্তার আন্টি শ্রাবন্তীকে খুব আদর করলেন। তাকে মজা করে বেশ কড়া গলায় বললেন, “আমার মেয়েকে ভালোভাবে রাখছ তো?”
রূপম হেসে ফেলল।
শ্রাবন্তী একটু ইতস্তত করে বলল, “আন্টি, আমার টেস্ট পজিটিভ এসেছে। প্লিজ কিছু করো।”
আন্টি কিছুক্ষণ শ্রাবন্তীর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বললেন, “পজিটিভ এসেছে মানে?”
শ্রাবন্তী কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “আমি প্রেগন্যান্ট, আন্টি!”
আন্টি একবার রূপমের দিকে আর একবার শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাতে এত দুঃখিত হবার কী আছে?”
শ্রাবন্তী বলল, “আমি এখনই কিছু চাইছি না আসলে। কিছুই তো দেখলাম না জীবনে।”
আন্টি রূপমকে বললেন, “তোমারও কি তাই মত?”
শ্রাবন্তী রূপমের দিকে তাকাল। রূপম স্পষ্ট বলে দিল, “না। তবে যেহেতু পুরো প্রসেসটা ওর ওপর দিয়েই হবে তাই এই ডিসিশনটা আমি ওর ওপরেই ছেড়ে দিয়েছি।”
আন্টি চেয়ারে হেলান দিলেন। একটু থেমে শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে কড়া ভাষায় বললেন, “আপাতত ব্লাড টেস্টটা করা। সেটা দেখ। ডিসিশন নে কী করবি। যদি নিস তাহলেই আসবি আমার কাছে। ঠিক আছে?”
শ্রাবন্তী ফ্যাকাশে হল খানিকটা। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। আন্টি কিছু টেস্ট দিয়ে ছেড়ে দিলেন। টাকা নিলেন না।
রাস্তায় বেরোল তারা। হাওয়া দিচ্ছিল। শ্রাবন্তী বেশ খানিকক্ষণ গুম হয়ে থেকে বলল, “তোমার ওরকমভাবে বলার কী দরকার ছিল? বলে দিলেই পারতে আমি এখন বাচ্চা চাইছি না।”
রূপম বলল, “আমি তো তোমাকে প্রথম থেকেই বলছি এসব ব্যাপারে আমার স্ট্যান্ড খুব ক্লিয়ার। অকারণ জটিলতা বাড়াব কেন? তা ছাড়া অ্যাবরশন করলে তো অনেকরকম কমপ্লিকেসি আসতে পারে। সেক্ষেত্রে কে সামলাবে?”
শ্রাবন্তী আবার চুপ মেরে গেল। হাঁটতে হাঁটতে তারা বাজারের কাছে চলে এসেছিল। সাউথ ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁটা দেখা যাচ্ছিল। রূপম বলল, “চলো একটু ধোসা খাওয়া যাক।”
শ্রাবন্তী অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি তো ধোসা পছন্দ করো না!”
রূপম বলল, “তুমি তো করো। তুমি খাও, আমি ইডলি নি একটা।”
শ্রাবন্তী বলল, “থাক। ইচ্ছা করছে না খেতে।”
রূপম বলল, “চলো, খাও। তারপর কী করবে দেখা যাবে।”
অনেকক্ষণ বাদে শ্রাবন্তী হাসল। রূপমও।
৩৩ মিলি
মাঝে মাঝে পাগলের মতো কাজ করি। যে কাজটার জন্য অনেক ঝাড় খেতে হয় পরে। কিন্তু সেই পাগলামিটা করার জন্য কেন জানি না ভীষণ ইচ্ছা হয়।
রাতে শুয়েছি, দেখি দিদি মোবাইলে খুটখুট করে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হল শিয়োর অয়নদাকেই মেসেজ করছে। আমিও আমার মোবাইল থেকে অয়নদাকে মেসেজ করে দিলাম, “কী করছ?”
মিনিট পাঁচেক কোনও রিপ্লাই এল না। দিদিকে দেখে বুঝলাম না অয়নদা ওকে এই নিয়ে কিছু বলেছে নাকি। চুপচাপ শুয়ে রইলাম। হঠাৎ দেখি অয়নদা রিপ্লাই করেছে, “পড়ছি।”
সাথে সাথে রিপ্লাই করলাম, “প্রেম করছ না?”
মেসেজটা পাঠিয়ে বুঝলাম বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। সাথে সাথে একটা হাসতে হাসতে চোখের জল বেরিয়ে যাওয়া স্মাইলি পাঠিয়ে দিলাম। অয়নদা রিপ্লাই করল, “প্রেম করব মানে? কী বলতে চাইছিস?”
আমি একটু ভাবলাম। তারপর লিখলাম, “প্রেম করবে মানে প্রেম করবে। তোমার গার্লফ্রেন্ডের সাথে।”
রিপ্লাই এল, “আমার গার্লফ্রেন্ড? কে সে?”
আমি পড়লাম মহা ফাঁপরে। কী উত্তর দেব ভাবতে লাগলাম। তারপর উত্তর না দেওয়াই ঠিক করলাম।
দেখি আবার মেসেজ করেছে, “কী রে, কী বলছিস খুলে বল। কিছুই বুঝতে পারছি না তো! আমার গার্লফ্রেন্ড পেলি কোত্থেকে তুই?”
আমি বুঝে গেলাম নিজেই নিজের বাঁশ টেনে এনেছি। লিখলাম, “না তোমার তো গার্লফ্রেন্ড থাকবে এটাই তো ন্যাচারাল, না? তুমি এত হ্যান্ডু।” বলে আবার একটা স্মাইলি দিয়ে দিলাম, বেগুনিমুখো শয়তানওয়ালা।
অয়নদা দেখি টাইপ করছে। আমি এবার আড়চোখে দিদির দিকে তাকালাম। দিদিও টাইপ করছে।
হঠাৎ কেমন যেন একটা খটকা লাগল। দিদি অয়নদাকেই মেসেজ করছে তো? নাকি অন্য কাউকে? ব্যাটা বিরাট চাপা স্বভাবের মেয়ে। পেটে বোম মারলেও ওর পেট থেকে কিছু বের করা শিবেরও অসাধ্য।
মা প্রায়ই বলে রূপসী আর মিলি যে কী করে বোন হল কে জানে। একটা তো কিছু হলেই ঢাক ঢোল নিয়ে গোটা পাড়া রাষ্ট্র করতে বেরিয়ে যায়। আর-একটা আছে, কিছুতেই কিছু বলবে না।
আমি তখন দিদিকে খ্যাপাতে বলি, “মা দিদির নাম চাঁপা রাখতে পারতে।”
দিদি কটমট করে আমার দিকে তাকায়।
সেই দিদি এখন কাকে টাইপ করছে? অয়নদাকে? আমার নিজের মাথায় একটা গাঁট্টা মারতে ইচ্ছা হল। সেদিন যখন দিদির মোবাইল প্যাটার্ন লক ভেঙে দেখছিলাম, অন্য মেসেজগুলো একটাও দেখিনি। অয়নদার নামটা দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটায় কী লেখা আছে সেটাই দেখছিলাম। আমার উচিত ছিল দিদির অন্য মেসেজগুলো পড়া।
সেদিনের পরে দিদি কিছু একটা সন্দেহ করেছিল। মোবাইলের প্যাটার্ন লক চেঞ্জ করে দিয়েছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেও খুলতে পারিনি। জাসুসি করা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। ও যখন মোবাইল ঘাঁটে আমি শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। আনলক করার সময় খুব সতর্ক হয়ে যায় আজকাল। তবুও পালিয়ে যাবে কোথায়।
