অয়নদা আমার কথা শুনে হেসে বলল, “মিলি এত পেকেছিস কেন রে?”
দিদি বলল, “দেখ না, সারাক্ষণ শুধু টুকটুক করে যত রাজ্যের ভাট বকে যাচ্ছে। নয়তো মোবাইলে খুটখুট করে যাচ্ছে।”
অয়নদা বলল, “হ্যাঁ, ঠিক ঠিক। সেদিন ওটা কী মেসেজ পাঠালি রে, বুঝলাম না কিছু?”
কেলো করেছে। একটা প্রেম-প্রেম মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, অয়নদা সেটাই বলে দিয়েছে। এবার আমার হয়ে গেল। যে করে হোক ম্যানেজ দিতে হবে মুখ করলাম, “আরে আমিও তো ঠিক বুঝতে পারিনি আসলে। তোমাকে ফরোয়ার্ড করলাম যাতে তুমি বুঝিয়ে দাও।”
দিদি এবার আমাকে চেপে ধরার চেষ্টা শুরু করল, “কেন আমি তো বাড়িতে ছিলাম। অয়নকে পাঠাতে হল কেন? দেখা তো কী পাঠিয়েছে।”
অয়নদা বলল, “আরে সেসব কি রেখেছি নাকি? কখন ডিলিট করে দিয়েছি। আসলেই মিলি বোঝেনি ও কী পাঠাচ্ছে।”
আমার চোখ ফেটে জল আসার উপক্রম হল। ওটা শুধু একমাত্র অয়নদার জন্যই পাঠিয়েছিলাম আর অয়নদা ডিলিট করে দিল? আর কিচ্ছু পাঠাব না দাঁড়াও। মুখটা অবশ্য হাসি হাসিই রাখতে হল, নইলে দিদি বুঝে গেলে বড়ো কেলো হয়ে যাবে।
দিদি বলল, “দাঁড়া দাদা আসুক, তোর মোবাইলের ব্যবস্থা হচ্ছে। খুব পেকেছিস তুই। মোবাইলটা যেন টুয়েলভ পাশ করার আগে তোকে না দেওয়া হয় সে ব্যবস্থা করছি।”
অয়নদা হেসে ফেলল, “এ কি আর এভাবে আটকানো যায় নাকি? ও তো যা পাকার পেকেই গেছে।”
আমি অয়নদার এই কথাগুলোর জন্যই আরও বেশি করে ওর প্রেমে পড়ে যাই। কী সুন্দর করে কথাগুলো বলে। দিদি কিছুক্ষণ গজগজ করতে লাগল। তারপর বলল, “তুই জানিস না মিলি কতটা পেকেছে। সারাক্ষণ শুধু গিন্নি গিন্নি ভাব করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
অয়নদা বলল, “সেরকম থাকা ভালো। কিন্তু মিলি, তুই যে এগুলো পাঠাস সেগুলো কোত্থেকে পাস? তোকেও নিশ্চয় কেউ এগুলো ফরোয়ার্ড করে। উলটোপালটা ছেলেদের সাথে মিশিস না তো?”
ওহ… কত কেয়ার করে… আমার আনন্দে নাচতে ইচ্ছা করছিল। যথারীতি ক্যাবলার মতোই বললাম, “কেউ পাঠায় না অয়নদা। ফেসবুকের পেজগুলো থাকে না, ওখান থেকেই ডাউনলোড করে রাখি।”
অয়নদা বলল, “উফ এই এক হয়েছে। সারাক্ষণ ন্যাকা ন্যাকা পোস্টার। তুই চলে গেলি তাই আমি সর্দি ঝাড়া বন্ধ করে দিয়েছি। উফ। ডিসগাস্টিং।”
দিদি বলল, “তুই এসব পেজে কী করিস মিলি? তোর আবার এত প্রেম আসছে কোত্থেকে?”
আমি দিদির দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে বললাম, “তোকেই তো দেখলাম এই টাইপেরই কোনও একটা পোস্ট শেয়ার করলি একটু আগে, আবার আমাকে বলছিস কেন?”
দিদি রাগল, “আমি তোর থেকে বড়ো সেটা ভুলে গেলে হবে মা? তা ছাড়া তোর মতো এইসব পেজে আমি দিন রাত পড়ে থাকি না। আমার পড়াশোনা আছে, আরও অনেক কিছু আছে।”
অয়নদা হাত তুলল, “শান্তি শান্তি। গৃহযুদ্ধ শুরু করে দিলি তো তোরা। এবার বন্ধ কর। তবে এটা ঠিক, মোবাইলের ব্যবহার আমাদের সবারই কমিয়ে দেওয়া উচিত। মিলিকে কালকে দেখলাম হোয়াটসঅ্যাপে লাস্ট সিন রাত দেড়টা। এত রাত অবধি কী করিস মিলি?”
কথাটা শুনে আমার দুরকম প্রতিক্রিয়া হল। যাকে বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ভালো প্রতিক্রিয়াটা হল এই, তার মানে অয়নদা আমার লাস্ট সিনটা দ্যাখে। একটু হলেও চিন্তা করে আমার জন্য। আর খারাপটা হল এত রাত অবধি দেখে থাকলে খারাপ কিছু ভাবছে না তো? তাই আগেভাগেই কাঁদুনি গেয়ে রাখলাম, “এটা মোবাইলের প্রবলেম অয়নদা। মনে হয় ফোনে কোনও সমস্যা আছে।”
দিদি থামাল, “তুই চুপ কর। রাতে তো কোনওদিনও দুটোর আগে ঘুমাস না। ইয়ার্কি হচ্ছে এখন? ফোনে সমস্যা? যতসব!!!”
আমি কটমট করে দিদির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
৩২
কলকাতার সাথে রূপমের পরিচয় কম। মফস্সলে কিংবা কলেজে থাকা অবস্থাতেও তাই দেখে এসেছে। চাকরি পেয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে চলে যাবার পর কলকাতা তো একেবারেই দূরে সরে গেছিল তার কাছে। শ্রাবন্তীর সঙ্গে বিয়ের আগে মাঝে মাঝে ঘুরেছে বেশ কিছু মলে। কিন্তু তাও ট্যাক্সি করে যাতায়াত হত। গন্তব্য বলে উঠে পড়ত, ফেরার সময়েও ট্যাক্সি। কলকাতার মধ্যে শ্রাবন্তীদের বাড়ি থেকে বেশি দূরে টুরে যেতে হলে একটু অস্বস্তিই হয় তার।
শ্রাবন্তীর ডাক্তার আন্টি ফ্ল্যাটের কাছেই বসেন সেটা জেনে একটু স্বস্তি পেল সে। দুজনে মিলে যখন বেরোল তখন সন্ধে নেমেছে। শ্রাবন্তীদের ফ্ল্যাটের সামনে থেকে খানিকটা গেলেই একটা ওষুধের দোকান। সেখানেই বসেন উনি। পৌঁছে দেখা গেল বেশ ভিড় হয়েছে। নাম লেখানো ছিল না। শ্রাবন্তী আশ্বাস দিল তাকে দেখলেই নাকি উনি কাউকে দিয়ে ঠিক ডাকিয়ে নেবেন। তবু রূপম নাম লিখিয়ে নিল। বোঝা যাচ্ছিল ভদ্রমহিলা বেশ নামকরা গায়নোকলজিস্ট। রূপম চারদিক চোখ বোলাল। বেশ কয়েকজন সন্তানসম্ভবা। কেউ কেউ আগের জনকে নিয়েও এসেছে। স্বামী কাজে গেছেন হয়তো, বাড়ি ফাঁকা, কিছু করারও নেই।
শ্রাবন্তীকে বসিয়ে রূপম মোবাইলে ডেটা অন করল। কলিগদের গ্রুপে সানি লিওনই টপে যাচ্ছে এখন। যারা বেশি বয়স্ক তাদের মধ্যেই আবার এই ছবিগুলো বিতরণের প্রবণতা বেশি। প্রেম সিং বলে একজন সিনিয়র আছেন, সারাদিন এইসব পাঠিয়ে যাবেন। বলেন সানি লিওন নাকি পাঞ্জাবের গর্ব। ওদিকে ওঁর বাড়িতে উনি একজন গম্ভীর অভিভাবক। দুই ছেলেকে সকাল বিকেল শাসনে অতিষ্ঠ করে দিচ্ছেন। তবে ভাবিজি অসাধারণ রান্না করেন। প্রায়ই রূপম পঞ্জাবি খাবার খেতে চলে যায় প্রেম সিংয়ের ফ্ল্যাটে। বেশ দিলদরিয়া আমুদে লোক প্রেম সিং। গেলেই বোতল খুলে বসে পড়বেন। ছুতো পেলেই হল। শ্রাবন্তী রাগ করে দু-পেগের বেশি হয়ে গেলে। তবে ও অন্য ঘরে থাকে, ভাবিজির সাথে গল্প করে। ওই সময়ে রূপম দু-চার পেগ আরও চড়িয়ে নেয়। মিস্টার আইয়ার বলে আর-একজন সিনিয়র থাকেন। তিনিও খুব অতিথিপরায়ণ। তার বাড়িতে আবার শ্রাবন্তী বেশি যেতে চায়। সাউথ ইন্ডিয়ান খাবারের ভীষণ ভক্ত ও। রূপমের সাউথ ইন্ডিয়ান পোষায় না। সম্বর মশলা খুব একটা ভালো লাগে না। রূপম ভাবছিল এরকম চাকরিই তার পক্ষে সব থেকে ভালো হয়েছে। গোটা দেশের লোকেদের সাথে কথাবার্তা হয়। পশ্চিমবঙ্গে থেকে যে মানসিক সংকীর্ণতা তৈরি হয় তার থেকে রাজ্যের বাইরে চাকরি করাটা অনেক ভালো হয়েছে। বাড়ি থেকে দূরে থাকাটা যদিও একটা সমস্যা তবু হোমসিকনেসটা কাটিয়ে ফেললে বাইরে থাকাটাই অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক তার কাছে।
