রূপম বুঝল না হঠাৎ ডাক্তার এল কোত্থেকে। সে বলল, “কী হল আবার? ডাক্তার কেন?”
শ্রাবন্তী ধরা গলাতেই উত্তর দিল, “আমি প্রেগন্যান্ট, টেস্ট পজিটিভ দেখছি।”
রূপম ভুলেই গেছিল আসলে এই কারণেই তারা শ্রাবন্তীর বাড়িতে এসেছে। কথাটা শুনে হঠাৎ সব মনে পড়ে গেল তার। এই কথার প্রতিক্রিয়ায় সে খুশি হবে না দুঃখ পাবে বুঝে উঠতে পারছিল না।
সে বলল, “ডাক্তার আন্টির কাছে কেন যাবে?”
শ্রাবন্তী গম্ভীর গলায় বলল, “বিকজ আই ডোন্ট ওয়ান্ট দিস চাইল্ড নাও। এখনও অনেক কিছু দেখার আছে আমার। এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে যেতে পারে না। আমাদের অ্যাব্রোড ট্রুরটাই তো এখনও হল না। এভাবে সব শেষ হয়ে যাবে?”
রূপম চুপ করে বসে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, “সে তুমি যা ভালো বোঝো করো, আমি আর কী বলব। আমি দাঁত মেজে নি।”
উঠল রূপম। সে ঠিক করল এই বিষয়ে শ্রাবন্তীকে আর একটা কথাও বলবে না। যা ইচ্ছা করুক। একটু পরে দাঁত মাজতে মাজতেই অবশ্য প্রশ্নটা মাথায় এল তার। বেরিয়ে বলল, “আচ্ছা তোমার যা দেখার আছে সেটা বাচ্চা হলে দেখা যাবে না কেন?”
শ্রাবন্তী বলল, “অত তোমাকে বোঝাতে পারব না। ওখানে একা একা থাকি। বাচ্চা হলে সামলাবে কে? নিজে তো সারাক্ষণ অফিসেই বসে থাকবে। এদিকে আমি রান্না করব না বাচ্চা সামলাব?”
রূপম ঠান্ডা গলায় বলল, “বাড়িতে থাকবে যখন বাচ্চা ছোটো থাকবে। আমার মা আছে, রূপসী আছে, মিলি আছে।”
শ্রাবন্তী জ্বলন্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে শ্লেষাত্মক গলায় বলল, “আর তুমি সেসময়টা গুরগাঁওতে লীলা করবে তাই তো?”
রূপম মাথা গরম করল না। সে জানে শ্রাবন্তী এই কথাগুলো বলছে তাকে রাগিয়ে দিতে। সে মুখ মুছল টাওয়েল দিয়ে। তারপর বলল, “সকালে লুচি হবে তো আজ?”
শ্রাবন্তী বলল, “আগে তুমি আমার কথার জবাব দাও। আমি ওই ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরে বাচ্চা নিয়ে পড়ে থাকব আর তুমি গুরগাঁওতে মজা মারবে?”
রূপম বলল, “তুমিই তো বলছ তোমার একা থাকা ওখানে সমস্যা। তাই বললাম। আর-একটা কাজও তো করতে পারো, তুমি এখানে থেকে যাও বাচ্চাটা যতক্ষণ ছোটো থাকবে। ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরে তাহলে আর থাকতে হল না তোমায়। সেটা কেমন হয়?”
শ্রাবন্তী বলল, “আমি এখন নিতে চাই না।”
রূপম বলল, “কবে নিতে চাও। বলো।”
শ্রাবন্তী তার দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলল, “অন্তত তিন থেকে চার বছর পরে।”
রূপম কাঁধ ঝাঁকাল, “দ্যাখো, তুমিই সিদ্ধান্ত নাও। আমার তো কোনও সমস্যা নেই।”
শ্রাবন্তী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ওই মেয়েটার সাথে তোমার ফিজিক্যাল রিলেশন ছিল? কোনওদিন কিছু করেছ?”
রূপম বুঝছিল মাথার ভেতরের আগ্নেয়গিরিটা ধীরে ধীরে জাগছে। অতি কষ্টে নিজেকে সামলাল সে, পরিষ্কার বুঝতে পারছিল মাঝে মাঝেই আজকাল এই টাইপের কথাবার্তা শুনতে হবে তাকে। কিছুই বোঝেনি এমন মুখ করে বলল, “কী করেছি? সেক্স?”
শ্রাবন্তী চোখ মুখ শক্ত করে বলল, “হ্যাঁ। ফার্স্ট লাভ তো। নিশ্চয়ই করেছ তাই না?”
রূপম শ্রাবন্তীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল, “বিয়ের আগে তো আমি সোনাগাছিও গেছি। তোমায় বলিনি। এখন বললাম।”
শ্রাবন্তী বিস্ফারিত চোখে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, “আর ইউ সিরিয়াস?”
রূপম আবার আধশোয়া হল বিছানার ওপরে। তারপর বলল, “তুমি তো অনেকরকম থিয়োরি খাড়া করছ, এটা আমি আমার তরফ থেকে অ্যাড করে দিলাম। কেমন থিয়োরিটা? ভালো না? দ্যাখো না, এ তো হতেই পারে কলেজে পড়তে পড়তে বন্ধুদের সাথে গেলাম। হতে পারে না?”
শ্রাবন্তী বুঝতে পারছিল না রূপম ঠিক বলছে না তাকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। সে বলল, “হতেই পারে। কে দেখতে যাচ্ছে?”
রূপম বলল, “তাহলে সেরকমই কিছু একটা ধরে নাও। কল্পনায় বিরিয়ানিই যখন রাঁধবে তখন ভালো করে মশলা দাও। আর শোন, অ্যাবরশন করাবে করাও, সেটা নিয়ে আমি একটা কথাও বলব না, কিন্তু দয়া করে এসব প্রশ্ন আর ভবিষ্যতে করবে না।”
শ্রাবন্তী তার দিকে জ্বলন্ত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর বেশ শব্দ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
৩১ মিলি
অয়নদা এলে আমি ওদের সামনে থেকে উঠি না। চুপচাপ বসে থাকি। কিছুতেই ফ্রি স্পেস দেওয়া যাবে না ওদের। ফ্রি স্পেস পেলেই আমার যেটুকু চান্স ছিল সেটাও নষ্ট হয়ে যাবে। অয়নদা আজ সকালেই এসেছে। দিদির কীসব নোট আছে সেগুলো নিয়ে।
আমি ভালো মেয়ের মতো চুপচাপ বইটা খুলে রাখলাম আর ওদের দিকে কান খাড়া করে রাখলাম। অয়নদা বলছিল, “মোমদির ব্যাপারটা এখনও ভাবতে পারছি না রে।”
দিদি বলল, “এসব কথা থাক এখন। ভালো লাগছে না।”
অয়নদা বলল, “পালিয়ে থেকে আসলে কি কিছু হয়? আমার তো মনে হয় না। আমার মতে এসব ব্যাপারকে সরাসরি সামনে থেকে দেখা উচিত। আমি তো রূপমদাকে সাপোর্ট করব। সারাদিন ওখানে থাকল। জাস্ট ভাবা যায় না।”
আমি টুক করে ফুট কাটলাম, “হুঁ, আর সব দেখে শুনে বউদি ফায়ার হয়ে গেছে।”
দিদি আগেকার দিনের মুনিঋষিরা যেমন ভস্ম করে দেবার চোখ করতেন সেরকম চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “খুব পেকেছিস মিলি। বউদি ফায়ার হয়েছে না কী হয়েছে সব বলতে হবে?”
আমি যথাসম্ভব সরল মুখ করে বললাম, “কেন রে দিদি অয়নদা কি বাইরের কেউ?”
