দিদি একদিন ওকে লুচি খাইয়েছিল। চিনি দিয়ে। সে কী খুশি! অনেকক্ষণ লুচিটাকে দেখে তারপরে খেল।
মুদির দোকানের কাকুটা বাবার সাথে কথা বলতে বলতে প্রায়ই বাইরে তাকাচ্ছিল। শেষমেষ আমি বলেই দিলাম, “কাকু, ভয়ের কিছু নেই, পাগলটা আমাদের কথা শোনে, তুমি নিশ্চিন্তে যেতে পারো।”
কাকুটা আমার কথায় বিশেষ ভরসা পেল বলে মনে হল না। শেষে আমিই বললাম, “আচ্ছা চলো, তোমায় খানিকটা এগিয়ে দি।”
পাড়ার মোড় অবধি কাকুটাকে এগিয়ে দিয়ে এলাম। বেজায় হাসি পাচ্ছিল। ওদিকে যখন এগোচ্ছিলাম পাগলটাও আমাদের পিছু পিছু আসছিল। কাকু একবার সামনের দিকে হাঁটে, আর তারপরেই পিছন ফিরে দ্যাখে পাগলটা কামড়াতে আসছে নাকি।
মোড়ের দোকান থেকে পাগলটাকে একটা বিস্কুট কিনে দিলাম। পাগলটা বিস্কুটটা দেখে আমার সাথে ফিরতে লাগল।
বাড়ি ফিরে মা আবার বেজায় বকা দিল, “তুই পাগলটার কাছে যাস না বেশি। কখন কামড়ে-টামড়ে দেবে তখন বুঝবি কেমন লাগে। জলাতঙ্ক হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে শেষে।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কুকুরে কামড়ালে তো জলাতঙ্ক হয় জানতাম মা, পাগলে কামড়ালেও হয়?”
মা গজগজ করতে লাগল। খানিকক্ষণ পরে বলল, “রূপমকে একটা ফোন কর তো। ছেলেটা ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।”
আমি ফোন করলাম। বেশ কয়েকবার রিং হয়ে গেল। দাদা ফোনটা ধরল না। মাকে সেটা বলতেই মা গম্ভীর হয়ে বলল, “দেখ আবার কী পাগলামি শুরু করল, বউমার সাথে আবার ঝগড়া না করে। ছেলেটাকে নিয়ে আর পারি না।”
দিদি বলল, “আমার দাদা ওরকম না। খামোখা বউদির সাথে ঝগড়া করতে যাবেই বা কেন? বরং বউদিই তো বেশি খুঁতখুঁত করে দেখেছি।”
মা গোমড়া মুখে বলল, “ও তোরা বুঝবি না। বউকে তো ওকেই নিজের মতো করে নিতে হবে। মেয়েটা একটু রগচটা বটে কিন্তু বয়সটা তো কম। ও যেরকমই হোক, রূপমেরও ওকে সময় দেওয়া উচিত। কালকে ওর সাথে ওরকম না করলেই পারত ছেলেটা।”
দিদি বলল, “দাদা কী করবে? দাদার কি আর মাথা ঠিক ছিল কাল? আমারও তো ইচ্ছা করছিল একছুটে গিয়ে মোমদিকে দেখে আসি। আমি তো এখনও ভাবতে পারছি না…”
দিদির গলাটা ধরে এল। মা বলল, “আমি কি আর ভাবতে পারছি রে? কত ভালো মেয়ে ছিল একটা। লাখে একটা পাওয়া যায় এরকম মেয়ে। যেমন ভালো ব্যবহার, তেমন তার কথাবার্তা”, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মা।
আমার ফোনটা বেজে উঠল। দাদা। ফোন ধরতেই বলল, “কী রে ফোন করেছিলি?”
-হ্যাঁ। মা জিজ্ঞেস করছে তুই আজ ফিরছিস তো?
-না রে এখানে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। কাল যাওয়ার চেষ্টা করছি।
ফোনটা কেটে গেল। মা আর দিদি দেখি আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। মাকে বললাম দাদা থেকে যাবে।
মা খুশি হল, “ভালো হয়েছে। থাকুক। ওর ওখানেই থাকা উচিত। আমি ভাবছিলাম বলি। তারপর দেখলাম ওতে যাও বা যাবার জন্য বলেছিলাম, পরে যদি ভেস্তে যায়, তাই আর বললাম না। থাক ওখানে। একসাথে থাক দুজনে।”
দিদি বলল, “মা কাল একটু বেরোব। টিউশনের নোটসের জন্য। অবশ্য অয়ন থাকবে সাথে।”
মা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “অয়ন যেন বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে যায়। যা দিনকাল পড়েছে আজকাল।”
আমার খুব রাগ হল কথাটা শুনে। অয়নদার সাথে টিউশনের নাম করে লুকিয়ে লুকিয়ে অ্যাপো মারা হবে? দাঁড়া দেখছি তোকে।
ভালোমানুষের মতো মুখ করে বললাম, “এক কাজ কর না দিদি, অয়নদাকে বল নোটসগুলি নিয়ে আসুক। যা দিনকাল পড়েছে। একা যাবি?”
দিদি রোষকষায়িত নেত্রে আমার দিকে তাকাল। আগের দিন হলে নির্ঘাত ভস্ম হয়ে যেতাম। তারপর বলল, “অয়ন আমাদের চাকর না মিলি। এটা বোঝার চেষ্টা কর।”
আমি বললাম, “আর ওই সিনেমা পেন ড্রাইভে করে আনার দরকার হলে তখন অয়নদা আর চাকর থাকে না, না?”
দিদি রেগে আমার কানটা মুলে দিল, “বেশি পাকা হয়েছ না? চুপচাপ নিজের কাজ কর। পড়াশোনা করতে বস।”
আমিও দিদিকে চিমটি কেটে দিলাম। লেগে গেল দুজনে।
৩০
রূপমের শেষরাতে ঘুম এসেছিল। শ্রাবন্তী ঘুমিয়ে পড়েছিল আগেই। রাতে খিচুড়ি ডিমভাজা রাঁধল শ্রাবন্তী। নিজে থেকেই মা-র সঙ্গে রান্না করল। শ্রাবন্তীর বাবা অফিস থেকে ফেরার পর রূপমের সঙ্গে মোমকে নিয়েই কথা বলে গেলেন। তিনি মোমকে চেনেন না। তাদের এলাকার ঘটনা টিভিতে বারবার দেখানো হচ্ছিল বলে সেটা নিয়েই কথা হচ্ছিল। রূপম বলল না মোমের ব্যাপারে কিছুই। গোটাটাই ওপর ওপর দিয়ে গেল।
রাতে সেই সমস্যাটা ফিরে এল। শুল কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছিল না। শ্রাবন্তী শুয়ে পড়েছিল। বেশ কয়েকবার এপাশ-ওপাশ করে তারপরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল রূপম। অনেক ঘরেই এখনও লাইট জ্বলছে। নিশাচর হয়ে পড়ছে মানুষ। আগে তাড়াতাড়ি ঘুমাত, এখন ইন্টারনেট জাগিয়ে রাখে সারারাত। বৃষ্টি হয়ে গেছে বলে ঠান্ডার আমেজটা ছিল। অবশ্য শ্রাবন্তীর ঘরে এসি আছে। রূপম রাত দুটো অবধি বারান্দায় বসল। তারপর এপাশ-ওপাশ করতে করতেই ঘুম এল।
সকাল আটটা নাগাদ শ্রাবন্তী ঘুম ভাঙাল তার। রূপম ঘুম জড়ানো গলায় বলল, “এখন তুললে কেন? আর-একটু ঘুমিয়ে নিতাম।”
শ্রাবন্তী ভারী গলায় বলল, “ওঠো, কথা আছে।”
রূপম বুঝল না আবার কী হল। এই তো আগের দিনই ঠিকঠাক ছিল। সে উঠে বসল। বলল, “এবার বলো।”
শ্রাবন্তী বলল, “ডাক্তার আন্টির কাছে যেতে হবে। আজই।”
