শ্রাবন্তীদের বাড়িতে আসার আগে অবধি রূপমের প্ল্যান ছিল শ্রাবন্তীকে নামিয়ে দিয়েই বেরিয়ে যাবে। তিনটে নাগাদ পৌঁছে লাঞ্চ করে বেরোনো ঠিক ছিল তার। কিন্তু সেসবের কিছুই হল না। বিকেল চারটে নাগাদ বেরোতে যাবে আর সেসময় কালবৈশাখী শুরু হয়ে গেল। শ্রাবন্তীর মা-ই বললেন থেকে যেতে। দুর্যোগের মধ্যে বেরোলে বরং রাস্তায় সমস্যায় পড়ার ব্যাপার থেকে যায়। প্ল্যান ক্যান্সেল করতে হল তাকে।
অনেকদিন পরে বাড়িতে এসে শ্রাবন্তী অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। নিজের ঘর, নিজের সবকিছু নিয়ে বরাবরের মতোই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রূপম টিভি দেখতে চেষ্টা করছিল। মোমের খবরটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিউজ চ্যানেলগুলি দেখাচ্ছে দেখে টিভি বন্ধ রেখে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
ভিজছিল কিন্তু খেয়াল ছিল না। শ্রাবন্তী তাকে ভিজতে দেখে বলল, “ছাদে যাবে? ভিজবে?”
রূপম একটু চমকাল। শ্রাবন্তী হঠাৎ ভেজার কথা বলায় অবাক হল সে। এই মুড চেঞ্জ হওয়া যে বাড়ি ফেরার আনন্দের সাথে যুক্ত সেটা বুঝল। সে বলল, “নাহ, এখানেই ভিজি। যা গরম ছিল।” আসলে সে কথাটা বলল বটে কিন্তু সে যে ইচ্ছা করে ভিজছিল না সেটা আর বলল না।
শ্রাবন্তী জোর করল না। বলল, “স্নান করে নিয়ো। নইলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
রূপম একটা চেয়ার নিয়ে বসল। তাদের বাড়িতে থাকলে যেরকম বৃষ্টি উপভোগ করা যেত, এই জায়গাটা ঠিক সেরকম না। তবুও অনেককেই দেখা যাচ্ছে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে ভিজছে। অনেকদিন প্রচুর গরম পড়েছিল। বৃষ্টিটা হয়ে তাই আবেগের বিস্ফোরণ হয়েছে।
বাড়িতে ফোন করার কথা ভাবছিল সে। বাড়িতে খবর দেওয়াটা দরকার ছিল। মোবাইলটা ড্রয়িংরুমে রেখে এসেছে। মোমের দাদাকেও ফোন করে বলে দেওয়া দরকার ফিরবে না সে।
আসলে কি ভালোই হল ব্যাপারটা? যদি যেত, তাহলে ঠিক কী সান্ত্বনা দিত সে মোমের মাকে? বৃষ্টির মধ্যেও রূপমের চোখের সামনে মোমের শরীরটা ভেসে উঠতে লাগল বারবার।
সে কি কোনওদিন মোমের শরীর কল্পনা করেনি? করেছে তো। তারা যখন প্রেম করত, কল্পনায় অনেকবারই মোমকে নগ্ন ভেবেছে সে। প্রেমে তো অবধারিতভাবেই শরীর এসেছিল। মোমকে প্রথম চুমু খাওয়ার সময় শরীর জেগেছিল।
মোম তো তাকে দিয়েই দিয়েছিল নিজেকে। ভয় পেয়ে সে-ই সরে এসেছিল তখন। তারপরেই বাবার সেই ঝামেলা। অনেক চেষ্টা করেছিল সে মোমকে মুছে ফেলতে।
ধর্ষিত নগ্ন শরীরটা সেই ভুলে যাওয়াগুলিকে বারবার ফিরিয়ে আনছে কেন? তবে কি তারও মধ্যে একটা ধর্ষক লুকিয়ে আছে? আর ভাবতে পারল না রূপম। বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে।
একটা শরীর তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে কাল থেকে। রূপম ঠিক করে উঠতে পারছে না আসলে মোম তাকে তাড়া করছে, না ওই নগ্ন শরীরটা। যে শরীরটা সে অনায়াসে কাছে পেতে পারত, একটা অচেনা অজানা ধর্ষক সেই শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করেছে, আঘাত করেছে বারবার। ছ-মাস সাতমাস পর পর এলাকায় একটার পর একটা ধর্ষণ করে যাচ্ছে লোকটা। কারও না কারও বাড়ির মেয়েকে পৈশাচিকভাবে মেরে চলেছে। রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে যা ইচ্ছা তাই করছে আর কেউ কিছু করতে পারছে না। রূপমের ভীষণ রাগ হচ্ছিল। এই ধরনের লোকের বেঁচে থাকার কোনও অধিকার নেই। কুকুরের মতো টেনে হিঁচড়ে মেরে ফেলা উচিত এদের।
স্নান সেরে বেরিয়ে শ্রাবন্তীর ঘরে ঢুকল সে। এখানে এলে এই ঘরেই থাকে সে। চুল আঁচড়াতে যাবে হঠাৎ শ্রাবন্তী এল। বলল, “আমি তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।”
রূপম বুঝল হোম অ্যাডভান্টেজ নেবার সময় এসে গেছে শ্রাবন্তীর। সে চুল আঁচড়ে খাটের ওপরেই বসল। বলল, “বল।”
শ্রাবন্তীও বসল। একটু দূরত্ব রেখে। তারপর বলল, “তুমি মেয়েটার কথা কোনওদিন বলোনি তো।”
রূপম শ্রাবন্তীর চোখে চোখ রাখল। বলল, “বলিনি কারণ ওই সম্পর্ক থেকে আমিই নিজে থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। তারপরে কোনওরকম যোগাযোগ রাখিনি।”
-বেরিয়ে এসেছিলে কেন? কোনও ঝামেলা হয়েছিল?
-স্কুল লাইফ থেকে কলেজ লাইফে প্রেম ছিল। বাবা তারপরে জানতে পেরে খুব ঝামেলা করেছিল। আমি সেই সময়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আগে নিজের পায়ে দাঁড়াব তারপর এইসব সম্পর্কে জড়াব। সেসময়ে বেরিয়ে আসার পরে আর ওর সাথে সেরকম কোনও যোগাযোগ রাখিনি।
শ্রাবন্তী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুমি তাহলে কাল সকালেই জানতে পারলে ওকে তুমি এখনও ভালোবাস?”
রূপম শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে থাকল। বাইরে বৃষ্টি কমছিল আর ঘরের ভিতর এক অস্বস্তিকর নীরবতা দুজনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে শুরু করল।
২৯ মিলি
উফ, আজ পাগলটা যা কাণ্ড করল!!! এখনও ভাবতেই হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। বাজারের মুদির দোকানের কাকুটা বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। আমি তখন সবে পড়ে ফিরেছি। হঠাৎ পাগলাটা কাকুকে তাড়া করেছিল। উনি একদৌড়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়লেন। আর পাগলটা তখন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁত মুখ খিঁচাচ্ছে।
এত হাসি পেয়ে গেছিল ওনার রিঅ্যাকশান দেখে। কিন্তু হাসতেও পারছিলাম না। বাবা তো কাকুকে দেখে ঘরে বসাল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল বেশ ভয় পেয়ে গেছেন। আমি ঘরে এসে দিদিকে ব্যাপারটা বলে দুজনে মিলে খুব একচোট হাসলাম। পাগলটা আজকাল যা শুরু করেছে না! কোনদিন না পাবলিক পিটিয়েই দেয় ওকে। তবে ও কিন্তু আমাদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করে এটা বলতেই হবে। মা দুপুরে ভাত দেয় রোজ। চুপচাপ খেয়ে নেয়। কোনও কথা বলে না। অন্য সময়টা পাড়ার কুকুরগুলোর সাথে সিভিল ওয়ারে নামে। এ ওকে তাড়া করছে তো ও তাকে তাড়া করছে।
