শ্রাবন্তী বলল “আর যদি প্রেগন্যান্ট হই?”
ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে স্টেপনি বের করছে। তাদের কথা ওর শোনার কথা না। তবুও রূপম চোখ দিয়ে ড্রাইভারকে দেখাল।
শ্রাবন্তী বলল, “শুনতে পাবে না।”
রূপম বলল, “সেটা আমি কীভাবে বলব। সেটা তো তোমার ডিসিশন। আমার কথা তুমি শুনবে?”
শ্রাবন্তী বাইরের দিকে তাকাল। বলল, “কেন শুনব না। তোমার বাচ্চা যখন তোমার কথা না শোনার তো কিছু নেই।”
রূপম শ্রাবন্তীর চোখে চোখ রাখল, “আমি হলে তো বলব বাচ্চাটা নিতে। তুমি সেটা নেবে?”
শ্রাবন্তী তক্ষুনি কোনও উত্তর দিল না। একটু ভেবে বলল, “ভেবে দেখব। বাড়ি যাই। তারপর ডিসিশন নি।”
রূপম আর-কোনও কথা বলল না। শ্রাবন্তী এরকমই। প্রথমে বলবে রূপমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তারপর সেই নিজে যেটা বুঝবে সেটাই করবে।
চাকা লাগাতে বেশিক্ষণ লাগল না। গাড়ি রওনা দিল আবার। রূপম চোখ বুজতে গিয়েও খুলতে বাধ্য হল। আবার মোমের শরীরটা ভেসে আসছে চোখের সামনে।
২৭
একটা কচি মেয়ে আর একটা বয়স্ক মেয়ের গায়ে আসলে একই গন্ধ থাকে না। কচি অবস্থায় মেয়েটা যেরকম তাজা থাকে, বয়স বাড়তে বাড়তে মেয়েটার শরীরে অনেকরকম সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। পঁচিশের উপরে মেয়েদের মেরে খুব একটা মজা পাওয়া যায় না। বাচ্চা মেয়েগুলি হাত-পা ছোড়ে বেশি, তাই ওদের মেরে মজা বেশি। এই মেয়েটাকে মেরে খুব একটা মজা পাওয়া যায়নি। মেয়েটা যেন মরেই ছিল। নারানের বিরক্ত লাগছিল। এই ঝামেলা না মেটা পর্যন্ত কিছু করা যাবে না। অথচ খুন করেও সেই মজাটা পাওয়া গেল না, এই ফাঁকে তো কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে! ছ-মাস চুপ করে বসে থাকলে তবে চারদিকের নজর কমবে। তখন ধীরেসুস্থে আবার শিকারে নামতে পারা যাবে।
দোকানেই বসে ছিল সে, এমন সময় কচি মেয়েটাকে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখল নারান। দোকান ভর্তি লোক, ফাঁকা থাকলে একবার জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে নিত। বাঘের শিকারের নিয়ম শুনেছিল সে একবার, সত্যি মিথ্যা যাচাই করে দেখা তার পক্ষে তখন সম্ভব হয়নি। মিত্রবাবু বলেছিলেন একবার, বাঘ নাকি যখন শিকার করে তখন নাকি একবার শুধু টার্গেট ফিক্স করে নেয়। তারপরে আর কোনও দিকে তাকায় না। শিকারের পিছু পিছু যায়। নজর রাখে, তারপর সময় বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের ওপরে। এই ব্যাপারটা তার বেশ মনে ধরেছিল। তারপর থেকে সে এই নীতিটাই ফলো করে।
মেয়েটাকে দোকানের সামনে দিয়ে যেতে দেখে নারান তাড়াহুড়ো করল না। শান্তভাবে ছেলেটাকে বলল, “একটু দোকানে থাক। আমি বাড়ি থেকে আসছি। একটা ওষুধ খেতে ভুলে গেছি।”
ছেলেটা চাপ নিল না। দোকানে আড্ডা মারা লোকেরাও সেটা দেখলই না। নারান চুপচাপ বেরোল। মেয়েটার সাথে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখে সাধারণ মানুষের মতই হাঁটতে লাগল। ভিড়ে সে যখন হাঁটে তখন কেউ বুঝতে পারে না। নারান ধীরেসুস্থে হাঁটতে লাগল। বাজারে এখনও সব দোকান খোলেনি। বন্ধের একটা রেশ চলছে। অনেক দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। মেয়েটার দিকে নারান একবারও সরাসরি তাকাচ্ছিল না। মেয়েটাকে দেখার এখন তার কোনও দরকার নেই। মেয়েটার রুটটা তার জানা দরকার। ইটভাঁটা অঞ্চলটা ছাড়াও এলাকায় আরও নির্জন এলাকা আছে যেখানে সচরাচর খুব বেশি লোক থাকে না।
নারানের হৃৎস্পন্দন বাড়ছিল। প্রতিবারই এই সময়টা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে যায় তার পক্ষে। জোরে জোরে নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস নিলে তারপরে খানিকটা নিয়ন্ত্রণ আসে। সে জানে, এই সময় কিছুতেই ভুল করতে নেই।
মেয়েটা অশ্বত্থতলার দিক দিয়ে ডানদিকে ঘুরল। নারান খুশি হল। যে রাস্তা দিয়ে মেয়েটা তার মানে বাড়ি ফেরে সেই রাস্তার মাঝখানে ভাঙা মন্দিরটা পড়ে। মন্দিরের পিছনে সুন্দর জায়গা আছে ঘাপটি মেরে থাকার। নারান এবার মেয়েটার দিকে তাকাল। রাস্তায় এখন ভালো লোকজন আছে। পরিচিত লোকেদের সাথেও তার দেখা হয়ে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। হাসিমুখে তাদের পার করে যাচ্ছিল সে। মেয়েটা মাঝে মাঝে মোবাইল বের করছে। খুটখুট করতে করতে হাঁটছে। এটাও একটা পজিটিভ ব্যাপার তার কাছে। এর মানে হল চলাফেরার সময় মেয়েটা একেবারেই সতর্ক থাকে না।
ফলো করার সময় মনে মনে প্ল্যানটা ভাজাও হয়ে যায় তার। পেছন থেকে গিয়ে মুখটা গামছায় জড়িয়ে কোনওভাবে ভাঙা প্রাচীরটার পিছনে নিয়ে যেতে পারলেই কেল্লা ফতে। নারান উত্তেজিত হতে লাগল। শুধু জানতে হবে বিকেল বা সন্ধের দিকে মেয়েটা এই রাস্তা দিয়ে কবে যায় বা আদৌ যায় কি না। মেয়েটার বাড়ি এসে পড়েছিল। চারদিক তাকাতে তাকাতে হেঁটে যেতে লাগল সে নির্বিকার মুখ করে।
কিন্তু এই সময় এমন একটা ঘটনা ঘটল যার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। এই অঞ্চলে কোত্থেকে একটা পাগলের আবির্ভাব হয়েছে সে শুনেছিল বটে কিন্তু কোনওদিন চোখে দেখেনি। চুপচাপ হেঁটে জায়গাটা পার হবার সময়েই তার সামনে লাফ দিয়ে পাগলটা পড়ল। তারপর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে অকথ্য গালিগালাজ শুরু করল। নারান পাগলটাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা যতই করে ততই পাগলটা তাকে ঘিরে ধরে গালিগালাজ করে যায়। বেগতিক দেখে নারান দৌড় মেরে ওই মেয়েটার বাড়িতেই ঢুকে পড়ল।
২৮
কোনও-কোনওদিন না বলে বৃষ্টি আসে। সকাল থেকে গরমে মাথা খারাপ করে দেবে। আর বিকেল নাগাদ এমন বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে, যে আগে থেকে কিছু প্ল্যান হয়ে থাকলে সেসব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। কিন্তু সেসব ভেস্তে গেলেও খুব একটা খারাপ লাগে না। বরং বৃষ্টিটাই তখন ভালো লেগে যায়।
