স্যার রেগে ব্যোম হয়ে গেলেন। মাথায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। খুব রেগে গিয়ে বললেন, “ইয়ার্কি হচ্ছে? ইব্রাহিম লোদি আর বাবরের শাসনকালের মধ্যে তুলনামূলক বিচার করো। এক্ষুনি বলো।”
স্যারের প্রশ্ন শুনেই সবাই খাতার দিকে গম্ভীর হয়ে তাকাল। আমি অবাক হয়ে বললাম, “স্যার ইব্রাহিম লোদি আর বাবর? আপনার মাথা ঠিক আছে তো?”
আবার সবাই হো হো করে হেসে উঠল। স্যার এবার রেগেমেগে বললেন, “তোমরা খুব বাড় বেড়েছ। পরের দিন সবাই গার্জিয়ান নিয়ে আসবে। নইলে আমি পড়াবই না একদম।”
আমি ভাবলাম এই মরেছে। চুপচাপ খাতা টেনে বসলাম। স্যার আবার নোটস দিতে শুরু করলেন। কিন্তু একবার যদি ব্যাচে হাসাহাসি শুরু হয় সেটাকে থামানো খুব কঠিন। কোত্থেকে একটা বদখৎ গন্ধ আসল হঠাৎ করে। একটা ছেলে হঠাৎ রুমাল দিয়ে নাক চাপা দিতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠল। স্যার বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করলেন গম্ভীর হয়ে থাকতে, তারপর নিজেও হেসে ফেললেন। আমার বেশ ভালো লাগছিল। একটা পরিবেশের পরিবর্তন যে মনকে কতটা পালটে দেয় সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। অবশ্য আমাদের এখানে সবকিছু আগের মতো নেই। রাস্তায় আসতে আসতে শুনলাম কাল আবার বন্ধ ডেকেছে। বেশ ঝামেলাও হয়েছে কালকে। থানার দিকে নাকি র্যাফ নেমেছে। কিছু একটা চলছে চারদিকে বেশ বোঝা যাচ্ছে।
স্যার বেরোলে সবাই স্যারের সাথেই বেরিয়ে যায়। আজকে মধুমিতা আমাকে একটা চিমটি কেটে বলল, “থাকবি। একটু পরে যাবি।”
আমি অগত্যা বেরোলাম না। সবাই বেরোতে মধুমিতা বলল, “এই মিলি, মোমদির সাথে তোর দাদার প্রেম ছিল না?”
আমি মধুমিতার দিকে তাকালাম। মেয়েটা সরল কিন্তু লোকের কেচ্ছা ঘাঁটার সুযোগ পেলে ছাড়ে না। অবশ্য সেটা আমিও করি না বলা ভুল। ওর কথা শুনে বললাম “হ্যাঁ। ছিল তো।”
মধুমিতা চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “তোর দাদা কী বলল? কষ্ট পেয়েছে না?”
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমার কাজ আছে। পরে কথা বলব।” বলেই জুতো পরতে ছুটলাম। ওর সাথে বেশিক্ষণ থাকলে পেট থেকে সব টেনে টেনে বের করে ফেলবে। তারপর ক্লাসে যখন ওর সাথে ঝগড়া হবে, অন্য গ্রুপের মেয়েদের আমার ফ্যামিলির কেচ্ছা নুন লংকা দিয়ে মাখিয়ে মাখিয়ে বলবে।
পাতি কেটে পড়লাম।
২৬
গাড়ি বড়ো রাস্তায় উঠলে রূপম চোখ বুজল। রাজ্যের ক্লান্তি এসে চোখে নেমেছে তার। কাল সারারাত ঘুমোয়নি। সারাদিন এত পরিশ্রম।
কলকাতা তাদের অঞ্চল থেকে দুশো কিলোমিটার দূরত্বে। রাস্তা পাকা হলেও মাঝে মাঝে খারাপ রাস্তাও পড়ছে। কয়েক ঘণ্টা পরে রূপমের ঘুম ভাঙল মোবাইলের শব্দে। তার ফোন বাজছে। নম্বরটা দেখে একটু চমকাল সে। মোমদের বাড়ির ল্যান্ডলাইন নাম্বার। এই নাম্বারটা তার মুখস্থ ছিল। এখনও ভোলেনি। মাঝে মাঝেই ইচ্ছা হলে এই নাম্বারে ফোন করে মোম হ্যালো বললেই ফোন কেটে দিত সে।
ফোনটা ধরল সে। ওপাশ থেকে মোমের দাদার গলা ভেসে এল, “রূপম?”
-হ্যাঁ বলছি।
-তুই কি আছিস এখন?
-না, আমি কলকাতা যাচ্ছি একটু। ওকে দিয়ে আসতে।
-ওহ। না রে, তাহলে তুই কি ফিরবি আর, না ওখান থেকেই চলে যাবি?
রূপম বুঝল না কী ব্যাপার। জিজ্ঞেস করল, “কেন বলো তো?”
-আসলে বুঝতেই পারছিস, কাল থেকে মা কিছুই খায়নি প্রায়। কতবার যে বোঝানো হচ্ছে। কাঁদছে আর অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে শুধু। তুই যদি একবার এসে কথা বলতি…
রূপম আড়চোখে একবার শ্রাবন্তীর দিকে তাকাল। ঘুমোচ্ছে, কিন্তু চোখ বুজে থেকে তার দিকে কান দিয়ে সব শুনছে নাকি সেটা বুঝতে পারল না সে, সে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, দেখি আমার ফেরার কথা আছে, আজ রাতেই কলকাতা থেকে ফিরে আসব। কাল সকালে নাহয়…”
-আচ্ছা তাহলেই হবে। ঠিক আছে এখন রাখছি রে।
ফোনটা কেটে গেল। রূপম জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে। শুধু ইট কাঠ বালি পাথর চলে আসছে লরিতে করে। কেউ বাড়ি করছে, কেউ দোকান করছে, সবকিছুই কংক্রিটের করে নিতে হবে। আগে তাদের মফস্সলে মাটির বাড়ি ছিল, এখন একদম গ্রামের দিক ছাড়া সেসব দেখাই যায় না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। এত ধর্ষণ, এত নির্যাতন তাদের ছোটোবেলায় তো এই বিপুল পরিমাণে ছিল না! তাহলে সবই কি নগরায়ণের সাইড এফেক্ট! ছোটো ছোটো ছেলেদের হাতে হাতে মোবাইল, তাতে অবাধ পর্ন, এই সমস্তই কি আসলে অনিবার্য ধর্ষণের দিকে সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে না?
কিন্তু খটকা তার অন্য জায়গায় লাগছে। মোমকে যেভাবে খুন করেছে সেটা নিয়ে। কারও ওপর ব্যক্তিগত রাগ থাকলে লোকে এরকমভাবে খুন করে। অথচ সে ঘটনাস্থলেই শুনল যে লোকটা এসব করছে, আসলে প্রায় সব খুনই এই একই ভাবে করে গেছে। প্রচণ্ড বেশি জোরে শরীরে আঘাত দিয়েছে। এত রাগ কেন হবে মেয়েদের প্রতি তার? কারণটা কী হতে পারে? আচমকাই হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল তার। হাতের কাছে যদি কোনওদিন সে পায় এই খুনিকে, এক মুহূর্তের জন্যও বাঁচিয়ে রাখবে না সে।
গাড়িটা রাস্তার মাঝখানে বিকট শব্দ করে পাংচার হয়ে গেল। শ্রাবন্তী ঘুম থেকে উঠল। বলল, “কী হল?”
রূপম বলল, “পাংচার।”
শ্রাবন্তী চোখ বন্ধ করল আবার। বলল, “তুমি আজকে কলকাতায় থাকবে না?”
রূপম বুঝল ফোনের কথোপকথন সবই শুনেছে শ্রাবন্তী। সে বলল, “নাহ। গাড়িটা ফিরবে তো। ওর সাথেই ফিরে আসব। নইলে খামোখা একদিন দু-দিন পরে যবেই আসি আবার বাড়তি খরচ।”
