মোবাইলটা বের করল সে। ঘুম যখন আসছেই না, মোবাইলটাই দেখা যাক। আনলক করার পর মিসড কল দেখে অবাক হল সে। সবটাই মিলি বা রূপসীর ফোন থেকে গেছে। শ্রাবন্তীর ফোন থেকে একটা ফোনও নেই। চমৎকৃত হল সে। বিয়ের পরপর যে শরীরটা তাকে সবচেয়ে বেশি টানত, সেই শরীরটা পাশ ফিরে শুয়ে আছে, যেটা দেখে তার একফোঁটাও কাম জাগল না, পরিবর্তে মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায়। মোমকে পোড়ানো দেখতে পারবে না সে। মেয়ের বন্ধু হিসেবে মোমের মায়ের পাশে গিয়েও দাঁড়াতে পারেনি। প্রবল অপরাধবোধ নেমে আসছিল সেই সময়টা। বাবা যেদিন ভীষণ বকেছিল মোমকে নিয়ে কথা শোনার পরে, সেসময়টা সে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। খারাপ লেগেছিল। কিন্তু মোমের সঙ্গেও সেই সময়টা সে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করেছে। রাস্তায় একদিন মায়ের সাথে মোম যাচ্ছিল বাজারে, তাকে দেখে মোমের মা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন কেন সে হঠাৎ করে তাঁদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিল, প্রত্যুত্তরে রূপম উলটোদিকে হাঁটা দিয়েছিল হনহন করে। মোম পরে একবার বলেছিল সেদিন মা ভীষণ আঘাত পেয়েছিলেন। তারপর মোমের মা-র মুখোমুখি সে কোনওদিন হতে পারেনি। পারবেও না হয়তো আর-কোনওদিন।
মোমের সাথে কাটানো সময়গুলি সারাদিন ধরে ফ্ল্যাশব্যাক হয়েছে তার মাথায়। চোখ বন্ধ হলেও সেসবই ভেসে আসছে। আজ হঠাৎ করেই তার মনে হচ্ছিল আসলেই কি সে শ্রাবন্তীকে কোনওদিন ভালোবেসেছিল? নাকি পুরোটাই শারীরিক আকর্ষণ ছিল? মোম যে এতদিন পরেও এতটা জুড়ে ছিল তাকে, সেটা আজকের দিনটা না গেলে সে জানতে পারত না হয়তো কোনওদিন। আর পাঁচটা লোকের মতোই সংসার করে জীবন চলে যেত।
একটা সময় বাড়ির ল্যান্ডফোন থেকে লুকিয়ে ফোন করত মোমকে। যেদিন পড়া থাকত না, সেদিন কখনও কখনও দিনে ওই এক-দেড় মিনিটের কথাই এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরিয়ে রাখত তাকে। মোম একবার বলেছিল বিয়ে হলে তারা ঘোর শ্রাবণে টিনের চালের তলায় বৃষ্টিতে ভিজবে। কথাটা মনে পড়তেই প্রবলভাবে সবকিছু নষ্ট করে দিতে ইচ্ছা হচ্ছিল তার। একটা মেয়ের স্বপ্ন, ইচ্ছা, সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছে সে। ধর্ষক তো শরীরটা নিয়েছে, মোমের মনের ধর্ষণ তো সে-ই করেছিল আসলে। শুধু তার জন্য একটা মেয়ে সারাজীবন বিয়ে করল না, এরকম পাগলের মতো রাস্তাঘাটে একা একা ঘুরে বেড়াত, বাইরেটা যতই ঠিক থাকুক, ভিতরটা তো সেই কবেই দুমড়ে মুচড়ে গেছিল শুধু তারই জন্য।
রূপম চেঁচাতে চাইছিল, পারল না। চুপচাপ দুজনে পাশাপাশি সারারাত জেগে থাকল। কেউ কারও সাথে একটা কথাও বলল না।
২৫ মিলি
আমি দেখলাম আমরা আসলে দুঃখকষ্টকে ভোলবার জন্য অনেক কিছু করতে পারি। আবার বাড়ি থমথমে হলেও যদি যার কারণে থমথমে সে না থাকে, বাড়ি তখন আবার চেষ্টা করে সবকিছু ভুলে নতুন করে বাঁচতে।
এই তো কাল এত কিছু হল, দাদা এত রাতে এল, চুপচাপ খেয়ে নিল, আমি আর দিদি রাত জেগে এত কাঁদলাম, এইসবই কিন্তু ম্যাজিকের মতো চেঞ্জ হয়ে গেল দাদা বউদিকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই। দাদা প্রথমে যেতে চাইছিল না, সকালে উঠে চুপচাপ বসে ছিল খাবার টেবিলে। আমি দাঁত মাজছিলাম। দাঁত মাজতে আমি অনেক সময় নি। অন্য দিন দাদা দেখলেই ধমক দিত, “আরে গাধা এত সময় ধরে কেউ দাঁত মাজে নাকি?” কিন্তু আজ দেখলই না আমার দিকে। আমি খানিকটা দাদাকে খ্যাপাতেই দাঁত বেশিক্ষণ ধরে মাজতাম, আজ ওর মেজাজ খারাপ দেখে মাজলাম না। মা দাদাকে জিজ্ঞেস করল, “কী রে আজ কলকাতা যাবি?”
দাদা তখন বলল, “না, ওকেই পাঠিয়ে দেব গাড়ি করে।”
মা শুনেই চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বাড়ির বউ এতটা রাস্তা একটা অচেনা অজানা ড্রাইভারের সাথে যাবে এটা হয় নাকি তাও এইরকম একটা সময়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষমেশ দাদা দেখলাম তেতো মুখেই রাজি হয়ে গেল যেতে।
ব্রেকফাস্ট করে ওরা বেরিয়ে যেতেই সকালে অয়নদা এল। অয়নদার সাথে বাবা অনেকক্ষণ কলেজ নিয়ে কথা বলল। মা-ও এল। বেশ খানিকক্ষণ আড্ডা হতে দেখলাম বাড়ির পরিবেশ বেশ হালকা হতে শুরু করেছে। আমি যথারীতি যথাসম্ভব ঝাড়ি-টাড়ি মেরে নিলাম অয়নদাকে, তারপরে পড়তে গেলাম।
অবশ্য পড়তে গিয়ে একটু হলেও অবাক হলাম। এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটে গেল কিন্তু কারও মুখ দেখে সেটা বুঝলাম না। সেই হাসিঠাট্টা যেমন চলে সেরকমই চলছে। স্যার যথারীতি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি পড়ছ তো? নাকি সারাদিন মোবাইল ঘেঁটেই কেটে যায়?”
আমি স্যারের দিকে তাকাতে গিয়ে পার্থর দিকে তাকালাম। শয়তানটার নজর আবার দেখি মেয়েদের বুকের দিকে ঘুরঘুর করছে। ইচ্ছা হচ্ছিল খাতাটা ছুঁড়ে মারি। কিন্তু কিছু করলাম না। স্যারের দিকে তাকিয়ে বললাম, “না স্যার, পড়া একদমই হচ্ছে না।”
স্যার ভেবেছিলেন আমি পড়ছি বললে চাটবেন। আমার না শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, “যাহ্, কেন? মোবাইল ঘাঁটছ?”
এটার উত্তর স্যার ভেবেছিলেন না বলব। আমি আবার উলটোটা করলাম। বললাম, “হ্যাঁ স্যার। খুব।”
শুনে সবাই হেসে উঠল। স্যার ধমক দেবার চেষ্টা করলেন, “হাসবে না। এখানে ইয়ার্কি হচ্ছে না। আমি এখানে গোরু চড়াতে আসিনি।”
মধুমিতাটা এমন বিচ্ছু, স্যারের কথাটা শেষ হতেই নিরীহ মুখে বলে উঠল, “স্যার যারা গোরু চড়ায় তারা কি খুব হাসাহাসি করে বুঝি?”
