রূপমের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। একদিনে যেন অনেকটা বয়স বাড়িয়ে ফেলেছে সে। মিলি আর রূপসী রূপম ফিরতেই তাকে ধরে সোফায় বসাল। বিভাসবাবুর অপরাধবোধটা ফিরে এল। রূপম প্রথম কথা বলল, “মা, খেতে দাও খিদে পেয়েছে।”
বিভাসবাবু গলা খাঁকরিয়ে বললেন, “বউমাকে একটু ডেকে নে, মিলি আর রূপসী ডেকেছিল, সেই সকাল থেকে ঘর বন্ধ করে বসে আছে। কিছুই তো সেরকম মুখে দেয়নি।”
রূপম বিভাসবাবুর দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। কেউ কোনও কথা বলছিল না। এক অস্বস্তিকর নীরবতা ধীরে ধীরে তাদের গ্রাস করতে লাগল। একটা সময় রূপম উঠল, ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে রওনা হল।
মিলি ফিসফিস করে বলল, “বাবা দাদাকে জোর দাও, নইলে কিন্তু বউদিও খাবে না, দাদাও খাবে না। আরও সমস্যা হয়ে যাবে।”
বিভাসবাবু অসহায়ভাবে গিন্নির দিকে তাকালেন, বললেন, “তুমি একবার বলে দ্যাখো না।”
সবাই সবার দিকে তাকাল। কেউ কিছু বলল না। বিভাসবাবু বললেন, “চলো খেয়ে নি।”
টেবিলের দিকে তারা এগোতে তাদের সবাইকে অবাক করেই রূপম আর শ্রাবন্তী ঘর থেকে বেরিয়ে চুপচাপ খাবার টেবিলে গিয়ে বসল। রূপমের মা তাড়াহুড়ো করে খাবার টেবিলের দিকে ছুটলেন। মিলি রূপসীর দিকে তাকিয়ে হাসল। রূপসী চোখ দিয়ে মিলিকে বকে দিল। মিলি হাসিটা সাথে সাথে গিলে ফেলল।
সবাই চুপচাপ খেয়ে গেল। কেউ কোনও কথা বলল না।
খেয়েদেয়ে ঘরে ঢুকতেই শ্রাবন্তী দরজাটা বন্ধ করল। তারপর বলল, “মেয়েটা কে ছিল? এক্স?”
রূপম শান্ত স্বরে বলল, “স্নান করব। দরজা খোলো।”
শ্রাবন্তী দরজা খুলল না। বলল, “আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। কে মেয়েটা? এক্স?”
রূপম শ্রাবন্তীর দিকে তাকাল। শ্রাবন্তীকে আজকে অন্যরকম লাগছে? কেন জানে না, তার বারবার মনে হচ্ছিল শ্রাবন্তী ধীরে ধীরে মোমের মতো দেখতে হয়ে যাচ্ছে। মোমের শরীরটা তো সে কোনওদিন দেখেনি, আজকে দেখেছে, থ্যাঁতলানো শরীরটা অনেক জায়গাতেই অক্ষত ছিল। শ্রাবন্তীর শরীরের কথা তখন মনে আসেনি। তাহলে এখন মোমের শরীরটার কথা মনে আসছে কেন?
শ্রাবন্তী খাটে বসল। দৃঢ় গলায় বলল, “আমি কালকে বাড়ি যাব। তুমি যেতে চাইলে যেতে পারো। না যেতে চাইলে যেয়ো না। আমি যেন যাই সে ব্যবস্থা করে দিয়ো।”
রূপম কিছু বলল না। শ্রাবন্তীর অস্থির লাগছিল রূপমের এই নীরবতা। কেন জানে না, তাকে লুকিয়ে অন্য কোনও মেয়ের সাথে শুয়ে এসেছে রূপম এটাই বারবার মনে হচ্ছিল শ্রাবন্তীর। আজকের আগে মেয়েটার নামই শোনেনি শ্রাবন্তী, অথচ আজকের দিনটা তাকে পুরো নাড়িয়ে দিয়ে গেল।
রূপম বেশ খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে বলল, “মোমের কথা তোমাকে আমি কোনওদিন বলিনি, এটা সত্যি। মোমকে আমি মুছে দিয়েছিলাম জীবন থেকে, তাই বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। কিন্তু আজকে ওরা যখন মোমের নগ্ন শরীরটা সবাই অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখছিল, আমার ভীষণ রাগ হয়েছিল। এখন আমি বুঝতে পারছি, মোমকে আসলে আমি মুছতে পারিনি। আমার মনে হল, কথাগুলি তোমাকে বলার আমি বললাম। তুমি কাল বাড়ি যেতে চাও আমি তার ব্যবস্থাও করে দেব। এবার তুমি ঠিক করো কী করবে।”
শ্রাবন্তী বলল, “তাই করো। আমার একটু একা থাকা দরকার।”
রূপম বলল, “এখন থেকে? তাহলে আমি অন্য ঘরে যাচ্ছি।”
শ্রাবন্তী রূপমের দিকে তাকিয়ে বলল, “সিন ক্রিয়েট আর করার প্রয়োজন নেই। কাল আমাকে বাড়ি দিয়ে এসো তাহলেই হবে।”
রূপম আর কিছু বলল না।
২৪
বিছানায় কাছে থেকেও যখন মানসিক দূরত্ব অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তখন ব্যাপারটা মোটেও সুখকর হয় না। রূপমের সাথে শ্রাবন্তীর যে এর আগে একেবারে কোনওরকম ঝগড়া হয়নি তা না, কিন্তু সে সবসময়েই বিছানায় এসে সব ঠিক হয়ে যেত। একজন না একজন নরম থাকলে, অপরজন যত জেদই করুক, সম্পর্কে সমস্যা হয় না সচরাচর। কিন্তু এবার শ্রাবন্তীকে শক্ত হতে দেখে রূপম নরম হল না। সবসময়ে নত হওয়া সম্ভব নয়। আর আজ তো সে প্রশ্নই ওঠে না। যে মেয়ে আর-একটা মেয়ের ধর্ষিত আর খুন হবার থেকে নিজের ইগোকে আগে রাখতে পারে, তার সঙ্গে তাকে বাকি জীবনটা একই খাট, একই ঘর, একই বাড়ি, গাড়ি, পরিবার শেয়ার করতে হবে ভেবে, মাথায় আগুন জ্বলে যাচ্ছিল তার। অবশ্য সেনসিটিভ হওয়া আশা করাও যায় না ওর থেকে। ছোটো পরিবারের শহুরে মেয়ে, কোনও কিছু কারও সাথে কোনওদিন শেয়ার পর্যন্ত করেনি, ওর থেকে এত কিছু আশা করাটাও হাস্যকর।
রাত দেড়টায় একই খাটে দুজন দুদিকে শুলেও রূপম বুঝতে পারল শ্রাবন্তী এখনও ঘুমোয়নি। চুপচাপ শুয়ে আছে। তার রাগ হচ্ছিল। অদ্ভুত মেয়ে সত্যি। আজকের দিনটায় শ্রাবন্তী যে এরকম করতে পারে ভাবতে পারেনি সে। যতবার সবকিছু মাথা থেকে বের করে চোখ বুজতে যাচ্ছে মোমের শরীরটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। এই শরীরটাকে সে কোনওদিন চায়নি সে বলতে পারবে না। কিন্তু সেটা যে এইভাবে তার সামনে আসবে, তাও ঠিক আজকের দিনে, এই আশঙ্কাটা তার কোনওদিন ছিল না। গুরগাঁওতে থাকাকালীন এই ঘটনাটা ঘটলে সে কী করত? কাউকে না জানিয়ে লং ড্রাইভে গিয়ে হয়তো কোনও ধাবায় সারাটা রাত মদ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত হাইওয়ের ধারে। কিন্তু আজকের এই অস্বস্তিকর রাতটা শেষ হবে বলে মনে হচ্ছিল না তার। এ যেন শাস্তির রাত।
