রূপম এসে পুলিশকেই ধমকি দিয়ে দিয়েছে বডি কেন কভার করা হয়নি বলে। থানার মেজোবাবু ছিল, একবার ওকে মেপে নিয়েছে। তারপর তাকে পাশে দেখে ডেকে নিয়েছে। সে-ই বোঝাল মেজোবাবুকে, মাথা খারাপ হয়ে গেছে ছেলেটার খবরটা পেয়ে, সেটা শুনে মেজোবাবু আর কিছু বললেন না। মেয়েটার মা দাদার কাছে থাকে। তার ফোন থেকেই ফোন করল। রূপমের প্রায়ই ফোন বেজে উঠছিল। ফোন ধরছিল না। চোখ-টোখ লাল হয়ে গেছে। বেশ খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক পায়চারি করে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতেই বসে পড়ল। তারপর বলল, “আমি কী করি এবার?”
বাপ্পা বুঝতে পারছিল সান্ত্বনা দেবার বিরক্তিকর কাজটা তাকেই করতে হবে। সে কোনওমতে কাঁধে-টাধে চাপড় মেরে শান্ত করার চেষ্টা করল রূপমকে। কিন্তু সে বুঝলে তো! এদিকে উপরতলার নেতারা তাকেই ফোন করতে শুরু করেছে। বাপ্পা ধরবে না ধরবে না করেও ধরল, এমএলএ। কলকাতার লোক, এখানে ভোটের পরে তাকে আর দেখতে পাওয়া যায় না। কোনও দরকার হলে তাদের ফোন করেই এলাকা দেখাশোনার কাজ করে ফেলেন। এমএলএ-র নাম্বার দেখলে আগে বাপ্পা লাফালাফি জুড়ে দিত যে, যাক, আজকাল উপরমহলেও তার নাম পৌঁছোচ্ছে, কিন্তু এখন বিরক্ত হল, একে রূপমকে নিয়েই মাথা খারাপ হবার জোগাড় হয়েছে, এরপর আবার কী ঝামেলা গায়ের ওপর আসে কে জানে!
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে দাদার খোঁয়াড়ি ভাঙা গলা ভেসে এল, “কী হে বাপ্পা, ওখানে রেপ হয়েছে নাকি?”
বাপ্পা একটু সরে গেল রূপমের কাছ থেকে। রূপমের সামনে এখন এই নিয়ে কোনওরকম আলোচনাই করা যাবে না। এমনিতেই লোক গিজগিজ করছে জায়গাটাতে। বিরোধী দলের কিছু পাবলিকও সুযোগ বুঝে সেন্টু বেচা শুরু করে দিয়েছে। অন্যদিন হলে ছেলেপিলে এনে অ্যাকশান শুরু করে দিত, আজকে চুপচাপ থাকাটাই বাঞ্ছনীয় মনে হচ্ছিল তার।
বাপ্পা প্রশ্নটার উত্তর দিল, “হ্যাঁ দাদা, কাল রাতে হয়েছে, ভোরে লাশ পাওয়া গেছে।”
“লাশ পাওয়া গেছে, তা রেপ হয়েছে কী করে জানলি? ক্যামেরা লাগানো ছিল নাকি?”
প্রশ্নটা শুনে দপ করে মাথায় রক্ত চড়ে গেল বাপ্পার। কিন্তু বুঝতে পারছিল এখন তাকে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। বলল, “না মানে জামাকাপড় ছিল না তো গায়ে।”
একটা হিসহিস শব্দ ভেসে এল ওপাশ থেকে। তারপর শুনল, “ইশ রে, কচি একদম?”
বাপ্পার মনে হচ্ছিল ফোনের ভিতর থেকে হাত বাড়িয়ে শুয়োরের বাচ্চাটার গলা টিপে দেয়, কিন্তু কিছু বলল না। কাটানোর চেষ্টা করল, “হ্যাঁ দাদা, আমার বন্ধুর বান্ধবী ছিল একসময়।”
“অ।” ও প্রান্ত একটু সতর্ক হল, “যাই হোক, অপোনেন্টের মাদারচোদগুলি বেশি লাফালাফি করলে গাঁড় ভেঙে দিবি। এখন ইলেকশনের সময়। মাথা যেন কেউ না তুলতে পারে। বুঝলি?”
বাপ্পা হ্যাঁ বলে ফোনটা রেখে গোঁজ হয়ে রইল। আজকে সে অ্যাকশান করতে পারবে না। অপোনেন্ট যা করার করুক। সব দিন অ্যাকশান করার দিন হয় না।
কিছু কিছু দিন কিছু না করেও কাটিয়ে দেওয়া উচিত। আজকে সেই দিন।
বিরোধী পার্টির চিত্ত ছেড়ে দেওয়ার ছেলে না। তাকে দেখতেই স্লোগান দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। বাপ্পা গুটিগুটি এগিয়ে গেল চিত্তর দিকে। তাকে এগোতে দেখে চিত্ত একটু হকচকিয়ে গেল। বাপ্পা বলল, “ভাই একটু এদিকে আয়।” চিত্ত সন্দিগ্ধ মনে চারদিক দেখে তার সাথে সাইডে চলল। বাপ্পা বলল, “ভাই, তোরা আজ যা পারিস কর, আমাকে ছেড়ে দে। আমার বন্ধুর কেস। এখানে প্লিজ কিছু করিস না।”
চিত্ত তার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড পজ নিয়ে বলল, “বন্ধু মানে?”
বাপ্পা রূপমকে ইশারায় দেখাল। চিত্ত বলল, “হাজব্যান্ড?”
বাপ্পা বলল, “আগে প্রেম করত। বাইরে থাকে। সকালে জানতে পারার পর থেকে পাগলের মতো করছে। এখানে সিন ক্রিয়েট হলে আরও সমস্যা হয়ে যাবে। তোরা দেখ অন্য কোথাও কিছু করলে কর, এখানে লাশটাকে নিয়ে কিছু করিস না আজ।”
চিত্ত একটু ভেবে বলল, “ঠিক আছে, তাহলে আমি ম্যানেজ করছি। থানা ঘেরাও করতে বলি বরং।”
বাপ্পা কৃতজ্ঞ হল। মাঝে মাঝে কথা বললে রাজনীতিতে অনেক সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। এটা যে কেন অনেকে বুঝেও বোঝে না সে জানে না।
২৩
রূপম বাড়ি ফিরল রাত বারোটায়। ফোন ধরেনি একটাও। এলাকা গরম থেকে গরমতর হয়ে গেছে। র্যাফ নেমেছে বিকেলের দিকে। বিভাসবাবু কাউকে না পেয়ে শেষে বাপ্পাকে কোনওমতে ফোনে ধরতে পেরেছিলেন। বাপ্পা জানিয়েছিল, কলকাতা থেকে মোমের মা আর দাদা ফিরেছেন। রূপম কিছুতেই ফিরতে চাইছে না।
বিভাসবাবু আর কিছু শুনতে পাননি। টেনশনে বাড়ির সবাই টিভির ঘরে বসে ছিল সন্ধের পর থেকে। একমাত্র শ্রাবন্তী বাদ দিয়ে। শ্রাবন্তী দরজা বন্ধ করে বসে ছিল। মিলি একবার দরজা ধাক্কিয়েছিল। শ্রাবন্তী ভিতর থেকে বলে দিয়েছিল এখন মাথা ধরেছে। কেউ যেন বিরক্ত না করে। সকাল থেকে কিচ্ছু খায়নিও। বাড়িতেও কারও কিছু খাওয়া হয়নি। রান্না হয়ে খাবার টেবিলে সাজানো আছে সব। বিভাসবাবু সুগারের পেশেন্ট বলে খালি পেটে থাকতে পারবেন না ভেবে গিন্নি রুটি দিতে গেছিলেন সন্ধের দিকে, বিভাসবাবু প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। রূপম যখন ফিরল তখন টিভি চলছিল। টিভিতে মোমের ধর্ষণকে কেন্দ্র করে হওয়া ঝামেলাটাই দেখাচ্ছিল। কলিংবেল বাজলে বিভাসবাবু সতর্কতা নিয়ে টিভিটা বন্ধ করে দিলেন।
