কলিংবেল বাজতে বিভাসবাবু বাইরে গিয়ে দেখলেন বাইরে গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। পাড়ারই পল্লবের গাড়ি। মনে পড়ল রূপমদের আজ কলকাতা যাবার কথা ছিল। ছেলেটিকে বসিয়ে বিভাসবাবু রান্নাঘরের দিকে এগোলেন। গিন্নি মনের সমস্ত শক্তি রান্নায় লাগিয়ে দিয়েছেন। তিনি গিন্নিকেই বললেন, “পল্লব গাড়ি পাঠিয়েছে তো। কী করবে?”
গিন্নি মুখ তুলে তাকালেন তাঁর দিকে। তাঁর চোখেও সংশয়ের ছাপ স্পষ্ট। বললেন, “বউমাকে একবার জিজ্ঞেস করবে?” তারপরই গলা খাটো করে বললেন, “না না, এক কাজ করো, রূপসীকে বলো রূপমকে ফোন করতে। কী বলে দ্যাখো। নইলে কিছু টাকা দিয়ে গাড়িটাকে না করে দিতে হবে তো। এভাবে সারাদিন আটকে রাখা যাবে না তো!”
রূপসী নিজেদের ঘরে ছিল। বিভাসবাবু ডাকলেন ওকে। গাড়ির কথা বললেন। রূপসী বেশ কিছুক্ষণ ফোনে ট্রাই করে হাল ছেড়ে দিল, বলল, “দাদা তো ফোনই তুলছে না বাবা।”
বিভাসবাবু অসহায় বোধ করছিলেন। চুপচাপ সামনের ঘরে গিয়ে বসলেন। ছেলেটা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। বিভাসবাবু বললেন, “তুমি চলে যাও এখন। ওরা যাবে না আজকে। বিকেলের দিকে এসো। কিছু টাকা দিয়ে দেব।”
ছেলেটার মুখ দেখে বোঝা গেল রাগ হয়েছে। কিন্তু বয়স্ক মানুষ দেখে মুখে কিছু বলল না। চুপচাপ গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেল। বিভাসবাবুর মনে হচ্ছিল বউমার সাথে কথা বলা দরকার। মেয়েটা একা আছে। অভিমান করেছে। পাড়ার লোকের সামনে রূপমের অপমান- ব্যাপারটা ভাবলেই অস্বস্তি হচ্ছিল বিভাসবাবুর। বাড়ির বউ, তার সঙ্গে এই ব্যবহারটা মেনে নেওয়া যায় না। আবার রূপমের দিকটাও দেখতে হবে। প্রথম প্রেম, ভোলা কোনওদিনই অত সহজ হয় না। এই খবরটা তো ওর কাছে একটা মারাত্মক শক তৈরি করবে।
রূপমের জন্য হঠাৎ করেই টেনশন শুরু হল বিভাসবাবুর। ছেলেটা যে মানসিক শক পেল, মাথা ঠিক রাখতে পারবে তো? কোথায় গেল ঝোঁকের মাথায়? উদ্বেগটা মাথা চাড়া দিতে লাগল। ছেলেটা ফোন তুলছে না। একবার যাবেন ঘটনাস্থলে? পরক্ষণেই প্ল্যানটা ক্যান্সেল করলেন। সামনাসামনি দেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব না।
বেশ খানিকক্ষণ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলেন। শেষমেষ টিভি চালালেন। খবরের চ্যানেলে তাদের এলাকার কোনও খবরই নেই। মোম এখনও হেডলাইনে আসতে পারেনি। কলকাতা হলে যত তাড়াতাড়ি হেডলাইনে আসত, জেলার মফস্সল বলেই হয়তো সেই দামটা পাচ্ছে না খবরটা। মামুলি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ইচ্ছা হলে দেবে, নইলে না দিলেও হয়। আর ধর্ষণটা এখন এমন জলভাত হয়ে গেছে দিনের পর দিন, যে এই খবরগুলি পাবলিক আজকাল আর খুব বেশি খায় না। খবরের মাঝে জাপানি তেল, বা রকেট ক্যাপসুলে মানুষের মনে যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দেওয়াটাও সংবাদমাধ্যম বেশ দায়িত্বের সাথেই পালন করে চলেছে। বিভাসবাবু মনে করতে পারলেন না, কবে থেকে খবরের নামে, ব্যবসার নামে এসব শুরু হয়েছে। অথচ একটা সময় ছিল, খবর পড়াটা যান্ত্রিক হলেও, তার একটা গাম্ভীর্য ছিল, একটা আভিজাত্য ছিল। এখন মনে হয় যাত্রাপালা চলছে। একই খবর সারাদিন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখিয়ে যাবে, খবরের থেকে বিজ্ঞাপন চারগুণ দেখাবে, বিভাসবাবু খানিকক্ষণ দেখার পরে সহ্য করতে না পেরে টিভিটা বন্ধ করে দিলেন।
মাথাটা ভার হয়ে এসেছে। প্রেশারের ওষুধ সকালে খেয়েছেন নাকি মনে করতে পারছিলেন না। আজকাল এই এক উপসর্গ যুক্ত হয়েছে। প্রায়ই ভুলে যান কোন ওষুধ খেয়েছেন আর কোন ওষুধ খাননি। মাঝে একবার দুবার প্রেশারের ওষুধ খেয়ে ফেলায় প্রেশার ফল করে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড হয়েছিল।
কিন্তু আজ কি খেয়েছেন? মনে করতে পারছিলেন না তিনি। শেষমেশ কিছু না করে টিভির ঘরে বসেই রইলেন। একা একা।
২২
বাপ্পা কোনওকালেই প্রেম-ট্রেম দু-চোখে দেখতে পারে না। সে জানে জীবনে উন্নতির পথে আসল বাধা হল এই প্রেম। ছেলেপিলে স্কুল পালিয়ে, অফিস পালিয়ে প্রেম করবে আর তারপর সফল হলে ওই মেয়েটাকেই বিয়ে করে আন্ডাবাচ্চা নিয়ে হোল লাইফ খিস্তাখিস্তি করে কাটিয়ে দিতে হবে, আর প্রেম ব্যর্থ হলে নেশা তো আছেই, জীবনেরও লাল লাইট জ্বলে যাবে। এই যে এত সফল ছেলে রূপম, দিব্যি লাল টুকটুকে কলকাতার বউ নিয়ে বাইরে গাড়ি ফ্ল্যাট নিয়ে আছিস, সেই তো পুরোনো ব্যথার যেই দেখলি এত বড়ো কেস হয়ে গেছে, রাস্তার উপর বউকেই ধমকিধামকি দিয়ে চলে এলি? এটা কি ঠিক হল? সে দু-চারবার রূপমকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে, ভাই তুই বাড়ি যা, লাশ-টাশ পোস্টমর্টেমে গেলে তারপরে তোকে ডাকছি, কিন্তু কে শুনবে কার কথা! ছেলেটা চিরকালই একটু ট্যারা। স্কুল লাইফে ভালো ছাত্র ছিল, কিন্তু কোথাও কোনও কিচাইন হলে সবার আগে গিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়াত। পাড়ার ঝামেলাতেও থাকত। পালিয়ে যেত না।
কিন্তু এখন ওকে কে বোঝাবে সময় অনেক পালটে গেছে। পলিটিক্স এখন খুব কঠিন ব্যাপার হয়ে গেছে। কোত্থেকে কী হয়ে যায় কেউ জানে না। সকাল থেকে ইটভাঁটার জায়গাটায় তাকে নিয়ে এসে বসে আছে।
বডিতে কাপড় আলগাভাবে দেওয়া ছিল। চোখ মুখ থ্যাঁতলানো। চাপ চাপ রক্তে মাছি ঘুরঘুর করছে। বাপ্পা একবার দেখেই চোখ সরিয়ে নিল। যদিও যা লোকজন এসেছে, সবাই সেটাই ড্যাবডেবিয়ে দেখছে। বাড়িতে সবারই মেয়ে বউ আছে, কিন্তু পরনারীর শরীর সব সময়েই আকর্ষণীয়, হোক না সে জীবিত কিংবা মৃত।
