যেদিন থেকে আমাদের এখানে এরকম রেপ শুরু হয়েছে, যেদিন প্রথম জানতে পেরেছিলাম, আমি তখন টিউশনে ছিলাম। সবাই দেখতে যাবে বলল, ওদের সাথে আমিও চলে গেলাম। আর ওটাই হয়েছিল আমার ভুল। পুলিশ তখন ল্যাংটো শরীরটার গায়ে বাড়ির লোককে কাপড় পরাতে বলছে। আমি তৎক্ষণাৎ ওটা দেখেই বমি করে দি। বাড়ি এসে সারারাত ঘুমোতে পারিনি। সারাক্ষণ মনে হত এই বোধহয় কেউ আমাকে রেপ করতে আসছে। দিদি ভীষণ বকেছিল ওখানে গেছিলাম বলে। আসলে অত ভেবে যাইনি আমি। তারপর ছ-সাত মাস অন্তর যতবার এই ঘটনাটা আমাদের এলাকাতে হয়েছে, তারপর আমি এই দুঃস্বপ্নটা দেখতে শুরু করি। আর-একটা স্বপ্ন দেখি, অঙ্ক পরীক্ষায় বসেছি, আর কিচ্ছু পারছি না। কিন্তু সেই দুঃস্বপ্নটা এতটা ভয়ংকর না, যতটা এটা।
আজকে সকালটা যে এরকম দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে শুরু হবে তা ভাবতে পারিনি। দাদার যাবার কথা ছিল কলকাতায়। আর আজকেই সেই ভয়ংকর খবরটা এল। আমি তো এত কিছু জানতামই না। পড়তে গেছি। সবে স্যার নোটস দেওয়া শুরু করেছেন আর তখনই স্যারের মোবাইলে আমার বাড়ি থেকে ফোন এল। আমাকে এক্ষুনি বাড়ি যেতে বলছে। আমি তো অবাক হয়ে গেলাম। এরকম তো কোনওদিন হয়নি! কী এমন সিরিয়াস ব্যাপার ঘটল, সেটা জানতে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওনা হলাম। বাড়ি গিয়ে শুনতে পারলাম কী ঘটেছে।
শোনার পর থেকে আমি বাথরুমে কল চালিয়ে মাথা ধুয়ে যাচ্ছি শুধু। আমি তো জানি, মোমদি একটা সময় আমাদের কাছে কী ছিল! এমনকি এখনও। রাস্তায় দেখতে পেলে জোর করে ওদের বাড়িতে নিয়ে যেত। কিছু না কিছু না খাইয়ে তো ছাড়তই না, তার ওপরে এটা সেটা কিছু না কিছু দিয়েই ছাড়ত। আজকে ব্যাগ, কালকে একটা বই তো পরশু একটা দারুণ একটা কস্টিউম জুয়েলারিই দিয়ে দিত। আমি যদি বলতাম তোমার সবই কি আমাকে দিয়ে দেবে? মোমদি হেসে বলত, “দেব, তাতে সমস্যা আছে কোনও?”
শুধু দাদার কথা উঠলে মোমদি একটু অন্যরকম হয়ে যেত। মনে হত কেউ জোর করে এক টান মেরে ওর মুখ থেকে হাসিটা সরিয়ে নিয়েছে। আমিও চেষ্টা করতাম যতটা সম্ভব দাদার কথা না তুলতে। তবু চলে আসতই। মোবাইলটা দাদা দেবার পরে যখন ওর বাড়ি গেছিলাম, আমার হাতে মোবাইল দেখে মোমদি বলেছিল, “নতুন মোবাইল?”
আমি ক্যালানের মতো বলে দিয়েছিলাম, “হ্যাঁ, দাদা দিয়েছে।”
কথাটা শুনে সাথে সাথে মোবাইলটা আমাকে ফেরত দিয়ে দিয়েছিল মোমদি। দাদা আর মোমদির মধ্যে যখন কুছ কুছ হত তখন আমি নিচের ক্লাসে পড়ি। তবে মোমদি এলেই আমি মোমদিকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতাম। ভীষণ প্রিয় ছিল মোমদি আমার। আর মোমদি আমাকে নিজের ছোটো বোনের মতোই ভালোবাসত।
আমার দুঃস্বপ্নটা যে মোমদির ক্ষেত্রেই এভাবে সত্যি হয়ে যাবে আমি ভাবতে পারিনি। যতবার সেই আগে দেখা ধর্ষিতা মহিলার মুখে মোমদির মুখ বসাচ্ছি, আমার কেমন একটা অস্বস্তি শুরু হচ্ছে। এটা যে আমাদের বাড়ির উপর কতটা প্রভাব ফেলবে তা খানিকটা হলেও আন্দাজ করতে পারছি। দাদা সেই যে বেরিয়েছে বাপ্পাদার সাথে এখনও ফেরেনি। গাড়ি এসে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে আমি আসার পর থেকে দেখছি বউদি দরজা বন্ধ করে বসে আছে। কী হয়েছে কিছুই বুঝলাম না। বাবা কথা বলতে পারছে না। বাইরের ঘরে চুপচাপ বসে আছে। শুধু মা এত কিছুর মধ্যেও রান্না করে যাচ্ছে। কোনওমতে সবকিছু স্বাভাবিক রাখার একটা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু ভেতরের কষ্ট কি আর এভাবে আটকানো যায়? মোমদি তো মারও ভীষণ প্রিয় ছিল। আমাদের বাড়ি এলেই শুধু চাউ খেতে চাইত মা-র কাছে। ওর মা-র থেকেও নাকি আমার মা বেশি ভালো চাউ বানায়। আর কী আশ্চর্য, আজকে সকালে আমি মা-র কাছে চাউ খেতেই চেয়েছিলাম! দিদি চুপচাপ রান্নাঘরেই বসে আছে। কোনও কাজ করছে না। আমিও কী করব বুঝতে না পেরে চুপচাপ নিজের ঘরে এসে বসলাম। মাথাটা ভীষণ ধরেছে। মনে হচ্ছে কোনওদিন এই মাথা ধরা সারবে না আমার।
২১
বাড়ির মাথা হবার অনেক সমস্যা। বাড়ি সামলাতে হয়। বাইরের ঝড়ঝাপটা সামলে বাড়ি ঠিক রাখতে হয়। বিভাসবাবু জানেন তাঁরই কাজ এত কিছুর পরে বাড়িটা ঠিকঠাক রাখা। কিন্তু আজ ভীষণ অসহায় বোধ করছিলেন। নিজের প্রতি একটা অদ্ভুত ঘেন্না আসছিল তাঁর। পুরো ব্যাপারটার জন্য অবচেতনে নিজেকেই দায়ী করে যাচ্ছিলেন তিনি।
ব্যাপারটা যখন শুনলেন টিভির ঘরের সোফায় চুপ করে বসে পড়েছিলেন তিনি। প্রথম যে কথাটা তাঁর মাথার মধ্যে এসেছিল সেটা হল রূপমের সঙ্গে বিয়ে হলে হয়তো মোমের এই পরিণতিটা হত না। এত কিছুর পরেও মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আর-কোনও সম্পর্কে জড়াতে পারল না। এই কি নিয়তি ছিল?
বয়স হলে অনেক সমস্যা বাড়তে থাকে। সুগার প্রেশার স্বাভাবিক নিয়মেই এসেছে বিভাসবাবুর। মাঝে মাঝে বেশি হাঁটলে হাঁফও ধরে আজকাল। বার্ধক্য থাবা বসাচ্ছে জীবনীশক্তিতে। খবরটা শোনার পরে মাঝে মাঝে মাথাটা ব্ল্যাংক হয়ে যাচ্ছে তাঁর। কাউকে বলছেন না। বাড়িতে বজ্রপাত হয়েছে স্পষ্ট বুঝতে পারছেন। ছেলে বেরিয়ে গেছে, বউমা দরজা বন্ধ করেছে। নিশ্চয়ই কিছু আঁচ করছে। আজকের পরে ওদের সম্পর্কটাও বোধহয় স্বাভাবিক থাকবে না।
