মাইতিবাবু আমতা আমতা করতে লাগলেন, “না মানে কই সে তো অনেকদিন হয়ে গেল…”
ওপাশ থেকে রাগে ফেটে পড়লেন বড়োসাহেব, “আপনি কিচ্ছু জানেন না। অথচ আমাকে মিনিস্টার সাহেব সকাল থেকে ফোনে মাথা খেয়ে নিচ্ছেন। একজন স্কুলমিস্ট্রেস কাল ওখানে রেপড হয়ে মার্ডার হয়েছেন। আপনি শোনেননি?”
মাইতিবাবুর অজান্তেই মাথায় হাত চলে গেল। বরবাদ হয়ে গেল বিয়েবাড়ি খাওয়া। এবার শোনেননি বললে তো আরও কেস, তাই ম্যানেজ করার চেষ্টা করলেন, “হ্যাঁ স্যার। আসলে আজকে স্টেশন লিভ করছি তো, তাই মণ্ডলকে চার্জ হ্যান্ডওভার করে যাচ্ছিলাম আর কি।”
ওপাশ থেকে ধমক ভেসে এল, “সব যাওয়া ক্যান্সেল করুন। মিনিস্টার আসবেন ওখানে। ফুল ফোর্স যেন থাকে। এক্ষুনি স্পটে যান। বিরোধী দল যদি থানা ঘেরাও করে একদম বরদাস্ত করবেন না। কড়া নির্দেশ আছে। ভোটের সময় কেউ যেন আপার হ্যান্ড নিতে না পারে। মনে রাখবেন।”
ফোনটা কেটে দিলেন বড়োসাহেব। মাইতিবাবু গিন্নির দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন একটা। বললেন, “তোমরা যাও। দেখি যদি ম্যানেজ করে রাতে যেতে পারি।”
গিন্নি কটমট করে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “পঞ্চাশ হাজার টাকা দাও। আমি কিনে নিচ্ছি সোনার কিছু একটা কলকাতা থেকে।”
মাইতিবাবু করুণ চোখে গিন্নির দিকে তাকিয়ে এটিএম কার্ডটা দিয়ে দিলেন। বললেন, “এটা রাখো।”
গিন্নি ছেলেকে নিয়ে গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। তাঁর গমনপথের দিকে তাকিয়ে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মণ্ডলকে ফোন করলেন, “কী হল মণ্ডল! আবার মার্ডার? কোথায় যেতে হবে?”
মণ্ডল অবাক হল, “সে কী স্যার, আপনি কলকাতায় যাননি?”
মাইতি উদ্গত খিস্তিটাকে কোনওমতে সামলে বললেন, “আর যাওয়া। সকাল সকাল এসপি সাহেব ফোন করে বললেন মিনিস্টার আসবেন। আর শোনো, থানা ঘেরাও-টেরাও হলে পাতি লাঠিচার্জ করে উঠিয়ে দিতে বলেছে।”
মণ্ডল বলল, “অলরেডি ঘেরাও শুরু হয়ে গেছে স্যার। তবে শান্তিপূর্ণ। লাঠিচার্জ করলে বরং সমস্যা বেশি।”
মাইতি এবার রেগে গেলেন প্রচণ্ড, “আমি ওসব জানি না। উপরমহলের যখন অর্ডার আছে, তোমাকে কে চিন্তা করতে বলেছে হে ছোকরা? মেরে ফাটিয়ে দাও। আর বডি কোথায়?”
মণ্ডল বলল, “স্যার পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে গেছে।”
মাইতির রাগ কমছিল না, “তুমি একবার তো আমায় ইনফর্ম করতে পারতে! জানো কী অপদস্থটাই না আমায় হতে হল। একে বিয়েবাড়ি যাওয়া হল না। এ নিয়ে গিন্নির অশান্তি নিতে হবে, তারপরে তোমার ওই। যাই হোক, পোস্টমর্টেম হয়ে গেলে বডি ছেড়ে দিয়ো। মেয়েটার বাড়ির লোকজন?”
মণ্ডল বলল, “স্যার যা শুনলাম মেয়েটার মা ওর দাদার কাছে থাকে। এখানে থাকে না। বাড়িতে মেয়েটা একাই থাকত।”
মাইতি অবাক হলেন, “একা থাকত? তা তারা খবর পেয়েছে? আসবে কবে? ততদিন কি মর্গে ফেলে রেখে দেব নাকি? এই কথাগুলি ঠিক করেছ কিছু?”
মণ্ডল আমতা আমতা করতে লাগলেন, “মানে স্যার, সকাল থেকে যা যাচ্ছে, তাতে এত কিছু তো ভাবিনি। আচ্ছা আপনি থানায় আসুন, এখানে বরং সব ঠিক করে নিচ্ছি।”
অফিস কোয়ার্টার থেকে থানা মিনিট পনেরোর হাঁটাপথ। মাইতিবাবু ইউনিফর্ম পরে থানার দিকে এগোতেই দেখতে পেলেন জটলা। বেশ ভালো লোক জড়ো হয়ে গেছে। সব বিরোধী দল না, দেখে যা মনে হচ্ছে। সাধারণ পাবলিকও আছে। তিনি বিরোধী দলনেতাকে দেখে তাঁর দিকেই এগিয়ে গেলেন। পরিতোষ বসু। এলাকায় আগে এমএলএ ছিলেন, তাঁকে দেখে ভিড়ের বাকিরা জোরে জোরে স্লোগান দিতে থাকল। “অপদার্থ পুলিশ” ইত্যাদি কথা আজ আর তাঁর রক্ত গরম করে না। অনেক শুনেছেন মাইতিবাবু। আগে যখন এরা ক্ষমতায় থাকত তখন এখনকার শাসক দলের লোকেদের কাছেও শুনতেন কথাগুলি।
পরিতোষবাবুকে বললেন, “স্যার এলাকা খালি করে দিন। আমাদের কাছে লাঠিচার্জের অর্ডার আছে।”
পরিতোষবাবু পুরোনো ঘুঘু। তাঁর কথা শুনে বুঝে গেলেন অনেকদিন পরে হিরো হবার চান্স এসেছে। তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, “সে আপনারা যা করার করতে পারেন, আমার কোনও আপত্তি নেই।”
মাইতি আর কথা বাড়ালেন না। ফোর্স জড়ো করা শুরু করে দিলেন থানার সামনে। এমনি সময়ে একটা ইট এসে কনস্টেবল অমল নস্করের পায়ে এসে লাগল। কিছু করার থাকল না। সংঘর্ষ অনিবার্য ছিল, হয়েও গেল। সবকিছু যখন শেষ হল দেখা গেল মাইতিবাবুর কখন মাথা ফেটে গেছে।
হাসপাতালে ব্যান্ডেজ করার সময়েই খবর এল মিনিস্টার আসছেন। এসপি-ও। মাইতিবাবু মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ভাবতে লাগলেন আজকে ঠিক কার মুখ দেখে উঠেছিলেন!
২০ মিলি
আমি মাঝে মাঝে একটা দুঃস্বপ্ন দেখি। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। দিদি জানে ব্যাপারটা। মাকে বলতে বারণ করেছি। ভীষণ অস্বস্তি হয় স্বপ্নটা দেখলে। সেটা হল আমি রাস্তায় বেরিয়েছি। রাস্তায় লোকজন ভর্তি। আর একটা সময় দেখছি সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছে। এই সময় আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিম স্রোত বয়ে যায়। কারণ এই সময়টা আমি আবিষ্কার করি আমার পরনে একটা সুতোও নেই। বাজারের সবাই আমার দিকে হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর একে একে সবাই আমার দিকে এগোচ্ছে। এই সময়টা আমি দৌড়োতে চেষ্টা করি কিন্তু দৌড়োতে পারি না। যেদিকেই যাওয়ার চেষ্টা করি, পা সরে না। এদিকে সবাই এগিয়ে আসে। এই সময় চেঁচাই আমি। চেঁচিয়ে ঘুম ভেঙে যায়। গলা শুকিয়ে আসে। দিদি প্রথম প্রথম ভয় পেত। আজকাল মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর আবার ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
