আর আজকাল তো হতাশা জিনিসটাই তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। সবথেকে আনন্দ হয় ঘটনাটা ঘটার পরের দিন। কোনও খেলা জেতার পরে সমর্থকরা যে আগ্রহ নিয়ে পরের দিনের খবরের কাগজ পড়ার অপেক্ষা করে, তারও সেরকম হয় ঘটনা ঘটার পরের দিন। যখন তারই দোকানে বসে বুড়োগুলো দেশের আইনশৃঙ্খলাকে গালিগালাজ শুরু করে। উত্তেজনা প্রথম দু-তিনদিন শিখরে থাকে বুড়োগুলোর। নারানের সেই দিনগুলি দারুণ কাটে। সে চুপচাপ ভালোমানুষের মতো মুখ করে বুড়োগুলোর বাতেলা শোনে। কেউ কেউ আবার রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করে। কী করে কী করে ব্যাপারটা হয়েছিল। নারান বুঝতে পারে অবচেতনে এই লোকগুলিও আসলে তার মতোই ধর্ষক।
সকালেই এলাকা সরগরম হয়ে গেছিল। দোকানের ছেলেটা সকাল আটটায় দোকান খোলে। সে রোজ ন-টায় দোকানে পৌঁছোয়। খুব শরীর খারাপ না করলে এই সময়ের নড়চড় হয় না। “কাণ্ড” ঘটানোর পরের দিন উত্তেজনা একটু বেশি থাকে কোন লোক কী কী বলল সেটা শোনার জন্য। সেদিনগুলিও একদম ন-টাতেই পৌঁছোয় অন্যদিনের মতো। কোনও সময়ের আগুপিছু করে না। ধীরেসুস্থে দোকানে গিয়ে লক্ষ্মী আর গণেশকে পুজো চড়িয়ে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে বসে পড়ে নিজের জায়গায়। পুজোটা নারান মন দিয়েই করে। মাঝে মাঝেই তীর্থ করে আসে। যেটুকু পাপ হয়, তা তো গঙ্গাস্নানেই ধুয়ে মুছে যায়। নিজের কাছে তাই তার কোনও পাপবোধ নেই।
বাজারে এইচআইভি কথাটা আজকাল খুব শোনা যায়। কন্ডোম ব্যবহারের কথা বারবার বলে। তার আবার কন্ডোমে একেবারেই আসক্তি নেই। তার মতে রসগোল্লা তো আর প্লাস্টিকে জড়িয়ে খাওয়া যায় না। এই জিনিসও তাই। সে কুমারী মেয়েদের টার্গেট করে যাতে এইচআইভির কোনওরকম রিস্ক না থাকে।
সকালে দোকানে পৌঁছে পুজো চড়াতেই ছেলেটার উত্তেজিত কণ্ঠে রিপোর্টটা পেয়ে গেল সে। কে বা কারা আবার রেপ করে ইটভাঁটার ওখানে একটা মেয়েকে খুন করে রেখে গেছে। এলাকায় আগামী কাল বন্ধ ডাকা হয়েছে বিরোধী পার্টির পক্ষ থেকে। মন্ত্রী, পুলিশমহলের মাথারা সবাই তাদের এলাকায় আসছে আজ। একজন অবিবাহিতা স্কুলশিক্ষিকাকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা কেউ মেনে নিতে পারছে না। বিরোধী দল থানা ঘেরাও করে রেখেছে সকাল থেকেই। এলাকা এক্কেবারে থমথমে। যে-কোনও সময় বড়ো ঝামেলা বেঁধে যেতে পারে।
নারান চুপচাপ বসে সব শুনে কয়েকবার সহানুভূতিসুলভ শব্দ করল। দোকানে খদ্দের আসা শুরু হয়ে গেছে। দোকানের সামনের বেঞ্চিতে কয়েকজন এসে বসে তুমুল তর্ক শুরু করেছে। নারান কান খাড়া করল । বিভিন্নরকম মন্তব্য ভেসে আসছে –
“এ তো আচ্ছা সমস্যা শুরু হয়েছে মশাই। রাস্তাঘাটে মেয়েদের বেরোনো চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
“সরকার কী করছে বলুন তো দাদা? চুরি পরে বসে আছে?”
“এটা বিরোধী দলের লোকও তো করতে পারে দাদা। ইচ্ছা করে এমন করা যাতে সবাই সরকারকে দোষ দিতে পারে।”
কয়েকজন আবার অতি উৎসাহে লাশ দেখতে যাবে বলল। নারান মুখ ব্যাঁকাল। যাক। সবাই দেখে আসুক। সে লাশ দেখতে যায় না। লাশ দেখতে গিয়ে যদি চোখে পড়ে কোনও ক্লু ফেলে এসেছে সেটা টেনশনকে বাড়িয়ে দেয়। পুলিশ না বুঝলেও সে তো বুঝতে পারবে ক্লু ফেলে এসেছে। তারপর রাতের ঘুমের দফারফা হয়ে যাবে খামোখা। পরীক্ষা দিয়ে আসার পরে অনেকে যেমন বাড়ি ফিরে আর উত্তর মেলাতে বসে না পাছে কোনও ভুলভ্রান্তি ধরা পড়ে সেটা টেনশন বাড়িয়ে দেয়, নারান একেবারে সেই গোত্রে পড়ে।
দোকানের ছেলেটা একটু পরে এসে খবর দিল, থানা ঘেরাওয়ে বিরাট লাঠিচার্জ হয়েছে। পুলিশকে ইট মারায় পুলিশও প্রবলভাবে পিটিয়ে দিয়েছে বিরোধী দলের লোকেদের। তিন-চারজনকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভরতি করতে হয়েছে। ওসির মাথা ইট লেগে ফেটে গেছে। সব মিডিয়া এসে গেছে।
নারান নিজের পিঠ নিজেই চাপড়াচ্ছিল মনে মনে। তার জন্য এত বড়ো ব্যাপার হয়ে গেছে, এটাই তো প্রমাণ করে সে একজন গুরুত্বপূর্ণ লোক। মোটেও ফেলনা নয়।
খানিকক্ষণ বাদে বিকেলের বুড়োদের দলের কয়েকজন এল। প্রত্যেকের মুখই থমথমে। এর আগের বেশিরভাগ কেসগুলোই একটু গরিব মানুষের বাড়ির কেস করে আসছিল নারান। এবার একেবারে স্কুলটিচার শিকার করেছে, স্বাভাবিকভাবেই লোকের ক্লাস-কনশাসনেস চাগাড় দিয়ে উঠেছে। এবার তাদের ঘরেও হাত পড়ে গেছে ধরে নিয়ে সবাইকেই বেশ মুষড়ে পড়া দেখাচ্ছিল।
মেয়েটার শরীরটার কথা আর-একবার মনে করে নিল নারান চোখ বন্ধ করে। শরীরটা উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। প্রতিটা অজানা শরীর একটা নতুন না-পড়া বইয়ের মতো। প্রত্যেকটায় আলাদা আলাদা মজা। সবকিছু হয়ে যাবার পর ক্ষতবিক্ষত শরীরটার স্মৃতি তার ছুঁচিবাইগ্রস্ত বউয়ের শরীর থেকে দূরে থাকা অতৃপ্ত শরীরটাকে তৃপ্ত করে।
পরের টার্গেট ঠিক করার কাজে লেগে যেতে হবে। চোখটা লোভে জ্বলজ্বল করে উঠল নারানের।
১৯
অফিসার-ইন-চার্জ মাইতিবাবুর মাথা সকাল থেকেই খারাপ হয়ে আছে। আজ যাবার কথা ছিল কলকাতায়, বড়ো শালির মেয়ের বিয়ে, তিনদিনের ছুটি নিয়ে বউ বাচ্চা নিয়ে স্টেশন লিভ করতে যাবেন এমন সময় এসপি-র ফোন এসে গেল। ধরব না ধরব না করেও ফোনটা ধরতে হল। আর ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল প্রচণ্ড বকাঝকার শব্দ, “কী হচ্ছে বলুন তো মাইতি? দিনের পর দিন আপনার এলাকায় রেপ, মার্ডার হচ্ছে আর আপনি কী করছেন?”
