আর-একবার স্নান করতে ঢুকল সে। অনেকদিন পর মনটা খুশি লাগছিল। মনের আনন্দে আধ ঘণ্টা কাটিয়ে দিল বাথরুমে।
১৭
সকাল সাতটাতেই গাড়ি বলে রেখেছিল রূপম। প্রথমে ঠিক ছিল শ্রাবন্তী একাই চলে যাবে। পরে ঠিক করল দিয়ে আসবে ওকে। একা একা অজানা ড্রাইভারের হাতে পাঠানো ঠিক হবে না। এমনিতে ভোরে ওঠা অভ্যাস নেই তার, কিন্তু গতকাল রাতেই রূপসীকে বলা ছিল, তারা না উঠলে জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা মারতে। মিলি আর রূপসী ভোর হতেই প্রবল উৎসাহে দরজায় ধাক্কা মারা শুরু করে দিল।
শ্রাবন্তী ঘুমঘোরেই তাকে বলল, “ওদের বলো তো বিরক্ত না করতে, আর-একটু ঘুমিয়ে নি, ক-টা আর বাজে।”
রূপমের ঘুম ভেঙে গেছিল। সে উঠে দরজা খুলে দিল, মিলি সামনে ছিল, ঝাড়বে ভেবেও কিছু বলল না। মনে পড়ল তার কথাতেই তো ওরা এটা করছিল। মিলি বলল, “দাদা ছ-টা বাজে। বউদিকে তুলে দে।”
রূপম বেসিনের দিকে মুখ ধোবার জন্য যেতে যেতে বলল, “দাঁড়া তো। ঠিক তুলে দেব।” রান্নাঘরের দিকে চোখ পড়তে খানিকটা লজ্জিত হল সে। মা সকাল থেকে উঠেই রান্না শুরু করে দিয়েছে। তারা ব্রেকফাস্ট খেয়ে কলকাতা যাবে তারই তোড়জোড় চলছে। সে একটু রাগল, “মা তোমার সকালে ওঠার কী দরকার ছিল বলো তো? আমরা তো রাস্তাতেই খেয়ে নিতে পারতাম।”
মা হাসল, “রাস্তার খাবার খেয়ে আর পেটখারাপ করার দরকার নেই। ওখানে তো বাইরের খাবারই খাস। বাড়িতে যখন এসেছিস তখন বাড়ির খাবার খা। আর কষ্টর কী আছে? তোর বাবার যখন অফিস থাকত ক-টায় উঠতাম ভুলে গেলি?”
রূপম আর কিছু বলল না। মাকে বলে লাভ নেই। মা কিছুতেই বুঝবে না। যত কষ্টই হোক, ঠিক সকালে উঠে রান্না করতে বসবেই। সে দাঁত মেজে দাড়ি কাটতে শুরু করল। শ্বশুরবাড়ি যাওয়াটা আজকাল নতুন না, কিন্তু একমুখ দাড়ি নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়াটা একটু কেমন যেন লাগে। মিলি পড়তে গেল, সকালে ওর নাকি পড়া আছে। শ্রাবন্তী উঠে বাইরে এসে একটা চেয়ার টেনে বসল।
রূপম বুঝতে পারছিল না আজকে কী করবে। শ্রাবন্তীকে দিয়ে আসাটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পর্যায়ে চলে যাবে। একটা সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপার আছে। শ্রাবন্তী অনেকদিন থেকেই বলছিল এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা ও কিছুতেই চায় না। অ্যাক্সিডেন্টালি সেটা হয়ে যাওয়ায় এখন একটা সিদ্ধান্ত তো নিতেই হবে। রূপম দাড়ি কাটতে কাটতে আড়চোখে শ্রাবন্তীর দিকে তাকাল। সকালে এত কিছু মাথাতে রাখেনি ও। দিব্যি মা-র সাথে কথা বলা শুরু করেছে।
বেল বাজল। মা অবাক হয়ে বলল, “এত সকালে আবার কে এল? মিলির কি পড়া হল না নাকি? এই রূপসী।”
রূপসী তাড়াতাড়ি বেরিয়ে দরজা খুলতে ছুটল। কয়েক সেকেন্ড পরেই এসে বলল, “দাদা, তোকে বাপ্পাদা ডাকছে, দেখ তো কী ব্যাপার।”
রূপম অবাক হল, “এত সকালে বাপ্পা? ওকে আসতে বল না!”
রূপসী বলল, “না না, কেমন একটা লাগছে ওর মুখ দেখে। তুই দেখ শিগগির।”
রূপসীর কথা শুনে শ্রাবন্তী বলল, “বাপ্পা কে?”
মা বলল, “পাড়ার ছেলে। রূপমের বন্ধু।”
রূপমের প্রায় শেষ হয়েই এসেছিল দাড়ি কাটা। সে মুখে জল দিয়ে বাইরে বেরোল। বাপ্পার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেউ ব্লটিং পেপার দিয়ে সবকিছু শুষে নিয়েছে। অবাক হয়ে সে বলল, “কী রে! এত সকালে? কিছু হয়েছে নাকি?”
বাপ্পা বলল, “বাইরে আয়।”
রূপম বাইরে বেরোল। বাপ্পা কাঁপছিল। রূপম বুঝতে পারল না কী এমন হয়েছে বাপ্পা এরকম করছে। সে আবারও জিজ্ঞেস করল, “আরে এত ভয় পেয়েছিস কেন? কেউ মার-টার দিয়েছে নাকি?”
বাপ্পা বলল, “মোমকে রেপ করে কে ফেলে দিয়ে গেছে ইটভাঁটার ওখানে। গোটা বডিতে অসংখ্য আঘাতের দাগ। লাশটা সকালে দেখেছে ওই পালপাড়ার কে একজন।”
রূপম বুঝতে পারল না কী বলবে। তার মনে হচ্ছিল পায়ের তলায় মাটি সরে যাচ্ছে। সে রাস্তার ওপরেই বসে পড়ল। বাপ্পাও বসল। বলল, “আমার কিছু মাথায় আসছে না রে কী করব। আমি একদম ব্ল্যাংক হয়ে গেছি।”
শ্রাবন্তী কৌতূহলবশত বাইরে চলে এসেছিল। তাদের দুজনকে রাস্তার ওপরে বসে থাকতে দেখে অবাক হল, বলল, “কী হল? ওখানে এরকম বসে আছ কেন?”
রূপম উত্তর দিল না। তার মাথা কাজ করছিল না। বাপ্পা উঠে দাঁড়াল। শ্রাবন্তীর কাছে গিয়ে বলল, “আমাদের এক ছোটোবেলার বন্ধু মারা গেছে বউদি। তাই আমরা একটু আপসেট হয়ে গেছি।”
শ্রাবন্তী তার দিকে এগিয়ে গেল, “এই ঘরে এসে বসো। চলো ঘরে চলো।”
রূপমের মাথা হঠাৎ ভীষণ গরম হয়ে গেল। চেঁচিয়ে উঠল, “চোপ। একদম চোপ। যাও ঘরে যাও।”
রূপম এত জোরে চ্যাঁচাল শ্রাবন্তী কেঁপে উঠল। রাস্তার মাঝখানে লোকজনের সামনে রূপমের এই ব্যবহারে অপমানিত হয়ে সে রেগেমেগে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। রূপম সেদিকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না। রূপসী বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে দাদার চিৎকার শুনে। বউদিকে ঘরের ভিতর ঢুকতে দেখে সে শ্রাবন্তীকে সামলাতে ছুটল। বাপ্পা কিছুটা ধাতস্থ হয়েছিল। বলল, “বউদিকে এভাবে বলাটা তোর ঠিক হল না রে।”
রূপম রাস্তার ওপর পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। মোম!!!
শেষে মোম!!!
১৮
সাফল্য পাওয়াটা জীবনে খুব কঠিন। এককালে পাস কোর্সে সায়েন্সে গ্র্যাজুয়েট হয়েও নারানকে শেষমেষ মুদিখানার দোকান দিতে হয়। আজকাল নিজেও ভুলে গেছে যে সেই সময়টা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত চাকরি না পাওয়ার হতাশায় কেটে গেছে।
