মা-ও দিব্যি গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেছিল।
আমি কিন্তু এরকম না। নিজের হকের কোনও কিছু আমি ছাড়ি না। নেহাত বাবা ওরকম করল বলে, আমি হলে যতীন জেঠুর প্যান্ট হলুদ করে ছেড়ে দিতাম। ক্লাসে একবার এরকম একটা ঝামেলা হয়েছিল। নন্দিতা আমার একটা পেন দিব্যি তিনদিন আগে নিয়ে আর ফেরত দেয় না। শেষে চাইতেই হল। চাইতেই দেখি আকাশ থেকে পড়ল। আমি দেখিয়ে দিলাম ওকে ওই পেনে আমার নাম খোদাই করা আছে। একটা সাইট থেকে স্পেশাল নাম লেখানোর সিস্টেম দেখে অয়নদা কতগুলি পেন বানিয়ে আমাদের দিয়েছিল। দিদি আমি আরও কয়েকজন বন্ধুকে। আমার নামের পেন ঝেড়ে দেবে! তাও অয়নদার দেওয়া!!! ভাবতেই একদম শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছিলাম।
যাই হোক এবার কাজের কথায় আসি। দিব্যি আমরা খেয়ে-টেয়ে নিয়ে টিভির ঘরে এসে উপস্থিত হলাম। টিভিতে সিরিয়াল চলছিল। বউদি গম্ভীর গলায় বাবাকে বলল, “টিভিটা বন্ধ হলে একটু খুশি হতাম। নইলে আমাদের সবার মনোযোগ ওই টিভির দিকে চলে গেলে সমস্যা হয়ে যাবে।”
বাবা তাড়াতাড়ি রিমোটটা নিয়ে টিভিটা বন্ধ করে দিল। ঘরে থমথমে পরিবেশ। বউদি নাটকীয়ভাবে শুরু করল, “আপনারা জানেন দেশে আনওয়ান্টেড প্রেগনেন্সি কী হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে?”
বউদির কথা শুনে বাবা খুকখুক করে কেশে নিল। দাদা মোবাইল ঘাঁটছিল। বউদি দাদার মোবাইলটা কব্জা করল, “আমি যখন কথা বলব আমার কথা শুনতে হবে।”
দাদা ব্যাজার মুখে বউদির দিকে তাকাল। আমি এটা দেখে দিদিকে একটা চিমটি কাটলাম। প্রত্যুত্তরে দিদিও একটা কাটল। দিদিরটায় জোর অনেক বেশি ছিল। আমার বেশ লাগল। কিন্তু আমি আর রিপ্লাই দিলাম না। পরের জন্য তোলা থাকল। পরে সময় করে হিসেব মিটিয়ে নিলেই হল।
বউদির আনওয়ান্টেড প্রেগনেন্সির কথা শুনে বাবা কী বুঝল কে জানে, বলে বসল, “বউমা, তোমরা আধুনিক কালের মেয়ে। বাচ্চা নেবে না নেবে না সেটা তোমরাই ঠিক করো। আমরা বুড়ো হয়ে গেছি। ক-দিনই বা বাঁচব। তবে যাওয়ার আগে নাতি বা নাতনির মুখ দেখে যেতে পারলে খুশি হতাম, এই যা।”
বউদি অত্যন্ত বিরক্ত হল বাবার কথায়, “আহ, আমি আমার কথা বলিনি।”
বাবা হতভম্ব হয়ে বলল, “তাহলে কার কথা বলছ?”
মা কোনও কথা বলল না। চুপচাপ শুনে যাচ্ছে।
বউদি বলল “আমি রূপসী আর মিলির জন্য বলছি। একটা বাড়িতে মেয়েদের বেডরুমে একটা ছেলে দিব্যি ঢুকে পড়ছে, গল্প করছে, এটা কিন্তু আনওয়ান্টেড প্রেগনেন্সি আনতে পারে।”
আমি খিলখিল করে হেসে দিলাম বউদির কথায়। বউদি রেগেমেগে বলল, “হাসির কী হল মিলি?”
আমি বললাম, “এমনি, একটা জোক মনে পড়ে গেল তাই।”
বউদি আরও রেগে গেল আমার কথায়। “এখানে কী মীরাক্কেল হচ্ছে না আমি কমেডি নাইটস উইথ কপিল করছি?”
দাদা বউদির কথা শুনে বলল, “আহ। তুমি যেটা বলার বলো। আমি যাই। আমার ঘুম পেয়েছে।”
বাবা বলল, “না না, বউমা বলো না। কোন ছেলের কথা বলছ?”
বউদি বিরক্ত গলায় বলল, “ওই যে সকালে যে ছেলেটা এসেছিল, কী নাম যেন রূপসী ওর?”
দিদি ভাবলেশহীন গলায় বলল, “অয়ন।”
বউদি নিজের হাতের তালুতে আর-একটা হাত দিয়ে একটা ঘুসি মারল, “ইয়েস, অয়ন।” এবার বাবা আর মা-র দিকে ফিরল, “ওই ছেলেটা যে ওদের বেডরুমে গিয়ে আড্ডা মারে আপনারা জানেন না?”
মা বলল, “হ্যাঁ, ও তো বন্ধু ওদের।”
বউদি রেগে গেল, “বন্ধু মানে? বন্ধু হলে বেডরুমে ঢুকে পড়বে? ইয়ার্কি নাকি এটা?”
বাবা অসহায়ের মতো বউদির দিকে চেয়ে বলল, “আচ্ছা বউমা, এরপরে অয়ন এলে বলব টিভির ঘরে গল্প করতে। ওদের বেডরুমে না।”
বউদি বাবার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলল, “ডিসগাস্টিং।”
বলে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল। বাবা দাদার দিকে তাকাল, “কী রে, বউমা রেগে গেল কেন?”
দাদা হেসে বলল, “ভাগ্যিস রেগেছে। নইলে রাতবিরেতে লেকচার শুনতে হত। যাও তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। নইলে আবার এলে আবার উলটোপালটা বকে মাথা খারাপ করে দেবে।”
বাবা বোকা বোকা চোখে দাদার দিকে তাকিয়ে থাকল।
১৪
সন্ধেবেলা সাধারণত বিভাসবাবু বেরোন না কিন্তু আজ বেরোলেন। বাড়িতে বউমা যতদিন আছে, ঠিক করেছেন রোজই বেরোবেন। এই মেয়েটিকে একটু ভয় পাওয়া শুরু করেছেন তিনি। ছোটো ছোটো ব্যাপারগুলি বড়ো করে দেখে সেটা নিয়ে ঝামেলা পাকানোতে এই মেয়ে কম যায় না। তিনি জানতেন রূপমের তার ক্লাসের একটি মেয়ের সাথে বোঝাপড়া আছে। এই নিয়ে একবার বাড়িতে ঝামেলাও করেছিলেন। ছেলে প্রেম করবে কলেজ লাইফে, রক্ষণশীলতার কারণে মেনে নিতে পারেননি। একদিন ভীষণ বকেছিলেন রূপমকে। তারপর রূপম কয়েকদিন গুম মেরে ছিল। চাকরি পেয়ে বাইরে চলে গেল। ভেবেছিলেন কলেজে পড়লে প্রেম করলে হয়তো ছেলেটার রেজাল্ট খারাপ হবে। বকেছিলেন এইজন্যেই যে যা হবে তা খানিকটা যেন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। পরে মেয়ের বাপের সঙ্গে কথা বলে বিয়ে দিয়ে দিলেই হল। মেয়েটা ভালোই। পরিবারও ভালো। মাঝে মাঝে খেজুরও করেছিলেন মেয়েটার বাবার সাথে। ওদের বাড়ি থেকেও ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু ছেলে যে অতটা চাপ নিয়ে নেবে বোঝেননি।
বাপের বকা খেয়ে মেয়েটাকে একেবারে ভুলেই গেছিল। তারপর হঠাৎ ফেসবুকে শ্রাবন্তীর সাথে আলাপ। বাড়িতে ফোন করে বলল, “বিয়ে ঠিক করো।” সব কেমন তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। আজকাল মনে হয় ছেলেটা রাগের বশে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। এই বাড়ির জন্য এত হাইফাই মেয়ে দরকার ছিল না। এইসব মেয়েরা কলকাতার ফ্ল্যাটে থাকা মেয়ে। বাপ-মায়ের এক মেয়ে, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে মানুষ। জীবনেও কারও সাথে কোনও কিছু শেয়ার করতে হয়নি, বুঝবেই না সবাইকে নিয়ে কীভাবে থাকতে হয়। বাড়িতে এলেই কেমন একটা থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। তা ছাড়া মফস্সলে শহরের অনেক মেয়েরই মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়। শ্রাবন্তী তো তার ওপরে গুরগাঁওতে থাকে। আরও নাকউঁচু হয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন। এতশত ভেবে একপ্রকার পালিয়েই বাজারের দিকে রওনা দিলেন তিনি।
