নারানের মুদির দোকানে তাঁদের সমবয়সিদের একটা আড্ডা চলে। চায়ের জোগানও থাকে। বহুদিন সিগারেট ছেড়েছেন। ওখানে গেলে বাকিদের খেতে দেখলে উশখুশ হয় মনে। মাঝে মাঝে টেনেও নেন ধোঁয়া। আজকে গিয়ে বসতে জমজমাট আলোচনার মধ্যে পড়লেন। সামনে ভোট। রতন চাকলাদার ফিনান্স স্পেশালিস্ট। পিএফ নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করেন প্রতিদিনই। প্রায় লাখ দেড়েক টাকা চিটফান্ডে রেখেছিলেন। মায়ের ভোগে যাবার পর প্রায়ই সরকারের নীতি নিয়ে সমালোচনা করেন। লেগ পুলিংও কম হয় না। ঘোতু সরখেল তো বলেই দিলেন, “তা তুমিই বাপু সস্তায় কিস্তিমাত করতে গেছিলে কেন? রিটায়ার্ড স্কুলমাস্টার। কেউ টাকা রাখে ওখানে? লোভ তো তোমার কম না যা দেখছি।”
রতন রেগে কাঁই হয়ে যান ঘোতুর কথায়, “ফালতু কথা বলবে না একদম, সব কি নিজের ইচ্ছায় চলা হয়? এখানে কে আছে যে নিজের ইচ্ছায় চলে? ছেলের বন্ধু বাপ্পা এসে ধরল, নতুন কোম্পানি দারুণ রিটার্ন, গিন্নির কাছে কাঁচুমাচু মুখ, বেকার ছেলে, একরকম গিন্নির কথাতেই পোস্ট অফিস থেকে টাকা তুলে রেখেছিলাম, সে আমি কী করে বুঝব সব টাকা নিয়ে কোম্পানিতে লাল আলো জ্বলে যাবে? শুরুতে তো কম টাকাই রেখেছিলাম। তারপরে যখন দেখলাম এমআইএসের টাকাটা ঠিকঠাক দিচ্ছে আর সুদ পোস্ট অফিসের থেকে ঢের বেশি, রাখলাম খানিক ওখানে। তাও কপাল ভালো দেড় লাখের ওপর দিয়ে গেছে। আমাদের এখানে অনেকের পুরো পিএফ-ই মায়ের ভোগে গেছে।”
পীযূষ ফুট কাটলেন, “কোম্পানি লাটে উঠল, কিন্তু একটা জিনিস দেখেছ, বাপ্পা কিন্তু ভালোই বাড়ি-টাড়ি করল। প্রথমে খুব কান্নাকাটি করল, বলেছিল সুইসাইড করবে, আমরাই তো ধরেবেঁধে আটকালাম। ক-দিন পরে দেখলাম ছেলে তিনতলা হাঁকিয়ে দিয়েছে। ব্যাপারগুলি বেশ ফিশি যাই বলো।”
রতন বললেন, “ওরকম বোলো না। ছেলেটার ব্যবসাও আছে। ওখান থেকেই হয়তো।”
পীযূষ বললেন, “তা কী করে ব্যবসায় অত তাড়াতাড়ি আঙুল ফুলে কলাগাছ হল শুনি? কোন ব্যবসায় এত তাড়াতাড়ি রিটার্ন আসে? সেটা না, আসল কথাটা বলো।”
রতন অবাক হলেন, “কী আসল কথা?”
পীযূষ মিচকি হাসি দিয়ে বললেন, “শাসক দলের লোক, কিছু বললে পাছে রাতবিরেতে তোমার ধুতি ধরে টান মারে, হে হে, মানে ভয়েই স্রেফ চুপচাপ মেনে নিলে সবটা”…
রতন এবার রেগে গেলেন, “ফালতু কথা বোলো না। নকশাল আমল কাটিয়ে আসা পাবলিক বুঝলে হে? ভয় পেতে যাব কেন?”
পীযূষ বললেন, “সে রামও নেই আর সে অযোধ্যাও নেই। তোমার সেই চওড়া ছাতিতে এখন পেসমেকার। ছেলে বাইরে থাকে। বুড়ো বুড়ি একা থাকো মেয়ের বিয়ে দিয়ে। কিছু কি আর বুঝি না?”
লেগে গেল দুই বুড়োয়। বিভাসবাবু এদের দেখে হাসছিলেন, মনটা খানিকটা ভালো হল। একটু আগেও কেমন মেঘলা ছিল। মাঝে মাঝে এখানে এসে বসতে হবে।
১৫
“আমরা ফিরছি কবে যেন?” ভারী গলায় রূপমকে প্রশ্ন করল শ্রাবন্তী। রূপম বুঝতে পারল ঝড় আসার চান্স আছে একটা। সে সাবধানে ডিফেন্স করল, “শনিবার। কেন বলো তো?”
শ্রাবন্তী বিরক্তি প্রকাশ করল, “এখনও চারদিন। উফ! কী এমন রাজকার্য এখানে আছে তোমার বলো তো?”
রূপম মোবাইলে মেইল চেক করছিল। অফিসের কলিগদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রচুর মেসেজ এসছে। নোটিফিকেশন ভরে গেছে। সেসবের দিকে মন দেওয়ায় শ্রাবন্তীর প্রশ্নটা ঠিকঠাক শুনতে পেল না, বলল, “কী? কিছু বললে?”
শ্রাবন্তী তার হাতের মোবাইলটা কেড়ে নিল, “আমার সাথে কথা বলার সময় মোবাইল ঘাঁটবে না বলেছি না? আগে আমাকে উত্তর দাও।”
রূপম শ্রাবন্তীর দিকে তাকিয়ে বলল, “ওকে, বলো কী প্রশ্ন আছে।”
শ্রাবন্তী বলল, “আমরা দু-দিন আগে তো এখান থেকে যেতে পারি! বাবার জন্য মনখারাপ করছে আমার।”
রূপম জানত এই কথাটা শ্রাবন্তী যে-কোনও সময় বলবে, প্রশ্নের উত্তর তৈরি করাই ছিল তার, “দু-মাস আগেই তো গেছিলে। এবার একটা কাজ করো না, তুমি কাল বরং চলে যাও। আমি গাড়ি ঠিক করে দিচ্ছি।”
শ্রাবন্তী তার দিকে আগুনে দৃষ্টিতে তাকাল। রূপম অবাক হবার ভঙ্গি করল, “কোনও সমস্যা?”
শ্রাবন্তী বলল, “তোমার আমাদের বাড়ি যেতে কী সমস্যা সেটা আগে বলো!!!”
রূপম ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি তার আগে বলো আমাদের বাড়িতে থাকতেই বা তোমার কী সমস্যা?”
শ্রাবন্তী চিরুনিটা ছুঁড়ে মারল মেঝেয়, “যা ইচ্ছা করো, আমি জানি না কিছু।”
রূপম হাত বাড়াল, “মোবাইলটা।”
শ্রাবন্তী রূপমের দিকে ছুঁড়ে দিল তার দিকে মোবাইল। বলল, “এই নাও। শুরু করো খুটখুট।”
রূপম কিচ্ছু বলল না উত্তরে। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে আবার বন্ধুদের মেসেজ দেখা শুরু করল। কেউ রাজনীতি সংক্রান্ত ছবি পাঠিয়েছে, কেউ পর্ন পাঠিয়েছে, মনে মনে হাসল রূপম। পর্নের চাহিদা মনে হয় তাদের চিতায় ওঠার আগে অবধি থাকবে। সবাই বিবাহিত এই গ্রুপে, কিন্তু ভালো পর্ন পেলেই কেউ না কেউ গ্রুপে দিয়ে দেবে।
রূপম যখন ঠান্ডা হয়ে যায় শ্রাবন্তী সেই সময়টা রূপমকে একটু ভয়ই করে। যদিও সেটা বাইরে দেখায় না। বেশ খানিকক্ষণ গুম মেরে বসে থেকে বলল, “তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।”
রূপম মোবাইলের দিকে চোখ রেখেই বলল, “আবার?”
শ্রাবন্তী থমথমে গলায় বলল, “ডেট মিস হয়েছে।”
রূপম অবাক হল, “মানে? কীসের ডেট? কিছুই বুঝলাম না। কী বলতে চাইছ?”
