সে বেরিয়েছিল সন্ধেবেলায় হাঁটতে। ক্লাবে গতকাল যাবার পর থেকে ভুলেও ভাবেনি আর যাবার কথা। যেখানে শুধু রাজনীতি ছাড়া আর কিছু হয় না সেখানে যাওয়ার কোনওরকম স্পৃহা তার আর ছিল না। ঘরে থাকতেও ইচ্ছা করে না। একা একাই হাঁটতে বেরিয়েছিল। অনেকদিন পরে নিজের মফস্সলে নিজেকে আবিষ্কার করছিল সে। এই রাস্তা দিয়েই সে পড়তে যেত, সেই মুদির দোকানটা, সব একইরকম আছে। অচেনা মানুষও চোখে পড়ছিল। কেউ অনেক ছোটো ছিল, বড়ো হয়ে গিয়ে কেমন একটা দেখতে হয়ে গেছে। কয়েকজন এসে পরিচয় দিয়ে গেল, কেমন আছে জানতে চাইল, সে কথা এগোচ্ছিল না, দেঁতো হাসি দিয়ে এক-আধটা কথা বলে কাটিয়ে যাচ্ছিল।
মোমের মুখোমুখি হল মোমের বাড়ির সামনেই। তার অবচেতনে যে মোমকে দেখার ইচ্ছা ছিল না সেটা সে অস্বীকার করতে পারে না কখনোই। কিন্তু মোমের বাড়ি ফেরার সময়ই মোমের সাথে দেখা হওয়াতে একটু অপ্রস্তুতই হল সে। মোমই তাকে দেখে এগিয়ে এল, সে ভেবেছিল তাকে হয়তো না দেখার ভান করে চলে যাবে।
মোমই প্রথম কথা বলল, “আরে তুই? ভালো তো?”
রূপম হাসল, “হ্যাঁ, তুই?”
মোম বলল, “দারুণ! বউ কেমন?”
রূপম হাসিটা বজায় রাখল, “ভালোই। তুই বিয়ে করলি?”
মোম হেসে ফেলল, “নাহ। বিয়ে করার সময় পাইনি এখনও।”
রূপম বুঝতে পারছিল না এরপরে কী বলবে। অনেক ভেবে বলল, “দাদার বিয়ে হয়েছে?”
মোম বলল, “হ্যাঁ, আগের বছর। আয় ঘরে আয়।”
রূপম কাটাতে চাইছিল কিন্তু একটা অদ্ভুত চুম্বকের কারণে সে না করতে পারল না। মোমের পিছন পিছন ওদের বাড়িতে ঢুকল সে।
মোমকে তালা খুলতে দেখে সে বলল, “কেউ নেই বাড়িতে?”
মোম বলল, “নাহ। মা দাদার কাছে আছে।”
রূপম উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “এখন চারদিকে যা চলছে তুই এই বাড়িতে একা থাকিস কী করে?”
মোম হাসল, “আমি মনে হয় যমেরও অরুচি”, ঘরে ঢুকতে গিয়ে ছোটো বারান্দায় মোমের হাতটায় একটু হাত ঠেকে গেল তার। বিদ্যুৎ পরিবহন এখনও হয়! শারীরিক চাহিদা তো শ্রাবন্তী মেটাচ্ছে। মোম কি এখনও তার কাছে সেই আবেদন নিয়ে আসে? নাকি এককালে মোমের সম্পর্কে ভালোবাসার থেকে শরীরটাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল?
মোম হাতের ব্যাগটা সোফায় ফেলে বলল, “তুই বস, আমি চা বসিয়ে আসি।”
রূপম আপত্তি জানাল, “নাহ, চা খাব না।”
মোম হাসল, “আরে আমি তো খাব। এই এলাম স্কুল থেকে।”
রূপম হাল ছাড়ল, “ঠিক আছে। দে।”
মোম রান্নাঘরে গেল। রূপম ঘরের চারদিকটা দেখল। সেই একইরকম আছে। যখন সে পড়তে আসত এই বাড়িতে। সাজানো গোছানো। মোমের মা খুব ভালো চাউমিন বানাতেন। সে এলে না খাইয়ে ছাড়তেন না। একদিন স্যার চলে যাবার পর কেউ যখন ছিল না মোমকে প্রথম চুমুও এই ঘরেই। জীবনের প্রথম চুমু। অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। প্রথম সবকিছুর মতোই প্রথম চুমু সবসময়েই স্পেশাল। রূপম ধীরে ধীরে উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল। মোম রান্না করছে। একটা অস্বস্তি হল হঠাৎ। এটা কি ঠিক হচ্ছে? শ্রাবন্তী যাই হোক, তার তো বিয়ে করা বউ। একটা অপরাধবোধ গ্রাস করে ফেলল তাকে। সেটা থেকেই হঠাৎ করে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল সে, “এই মোম, একটা খুব ভুল হয়ে গেছে রে। আমি আসছি।”
মোম তার দিকে ফিরল, কোনওরকম প্রতিক্রিয়া দিল না, শুধু বলল, “আচ্ছা, তাহলে চা খাবি না?”
রূপম বলল, “না রে, সরি।”
আর পিছু ফিরল না সে। ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে জোর পায়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিল।
***
বাড়ি ফিরে ড্রয়িংরুমে বসতেই শ্রাবন্তীর তলব, “একটু শোনো।”
রূপম কিছু বলল না। চুপচাপ নিজের বেডরুমে প্রবেশ করল, “বলো।”
শ্রাবন্তী দরজাটা অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে বন্ধ করল। বাড়িতে অন্যরাও আছে, রূপমের দেখে একটু অস্বস্তি হল, কিন্তু কিছুই বলল না। এগুলিকেই তো অ্যাডজাস্টমেন্ট বলে। কিংবা বিয়ের পরের পরিবর্তন।
শ্রাবন্তী জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে ফেলতে ফিসফিস করে বলল, “তোমার বোনের বেডরুমে ছেলে ঢুকে যাচ্ছে তুমি জানো?”
১৩ মিলির কথা
বাড়িতে বিচারসভা বসেছে। আমার বেশ মজা হচ্ছে। টিভির ঘরে বাবা দাদা বউদি মা আমি আর দিদি। সভায় মূল অভিযোগকারী বউদি। যা বোঝা গেছে, দাদাকে বউদি জ্বালিয়ে খাচ্ছিল অয়নদার ব্যাপারটা নিয়ে, তাই রাতে খাবার পরে দাদা বাবাকে বলেছিল, বউদি নাকি আমাদের কিছু বলতে চায়। বাবা ঘাবড়ে-টাবড়ে গেছিল। আমি তখন ওখানেই ছিলাম বলে জানতে পেরেছিলাম। বাবা দাদাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী ব্যাপার বল তো?”
দাদা বিরক্ত আর অন্যমনস্ক গলায় বলেছিল, “দ্যাখো মাথায় কী চেপেছে কে জানে! যাই হোক, সবাইকে কী বলবে বলুক। বেশি কিছু বোলো না, যা বলবে শুনে যেয়ো। ও তো আর বেশিদিন থাকবে না, সুতরাং যা বলবে প্রতিবাদ কোরো না।”
বাবা দাদার কথা শুনে বলল, “আচ্ছা। ঝামেলা না হলেই হল।”
বাবার এই এক স্বভাব। সারাক্ষণ সব ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসে। ক-দিন আগে আমাদের পিছনের বাড়ির যতীন জেঠু দিব্যি ওদের বাড়ির পাঁচিল তোলার সময় আমাদের বাড়ির খানিকটা জমিও জড়িয়ে নিল। মা বলতে গিয়ে কথা শুনে এসে বাবাকে বলল, “দ্যাখো কী করবে।”
বাবা গম্ভীর এবং উদার গলায় বলে দিয়েছিল, “থাক না, ওইটুকু জমি নিয়ে ওরা যদি খুশি থাকতে চায় থাকুক না। ঝামেলা না হলেই হল।”
