এর কথা শুনে চারদিকে খুকখুক করে একটা হাসি উঠল। নারান মনে মনে একটা গাল দিল। মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদী পাবলিক সব। সুবিধা নেওয়ার সময় আমি তোমাদেরই একজন, আর একটু এদিক-ওদিক হলেই গালাগাল স্টার্ট। ঠিকই করেছে ছেলেটা বেশি চাঁদা চেয়ে। এদের এরকমই শায়েস্তা হওয়া দরকার। এর একটা নাতনি আছে। বেশ ভালো ফিগার। নারান চোখ বন্ধ করে গোটা শরীরটা একবার কল্পনা করে নিল। বেশ কয়েকবার আলতো নজরে লক্ষ রেখেছে সে। কলেজ থেকে ফেরার সময় কেউ না কেউ সবসময়েই সাথে রাখে। একজন থাকলে সেই লক্ষ্যকে বাতিলের খাতায় রাখার নিয়ম নারানের। কিন্তু হয় না, রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয়ে যায় নগ্ন শরীরটা মাথায় চলে এলে।
দুটো মেয়ে হাসতে হাসতে তার দোকানে ঢুকল। সামনের বুড়োদের ভিড়টা একটু নড়েচড়ে বসল। নারান আবার মনে মনে খিস্তি মারল। শালা চুলগুলো একটাও কাঁচা নেই, তবু কচি মেয়ে দেখলে সবারই মনের ভিতরে মরূদ্যান তৈরি হয়, ধর্ষণের ইচ্ছা সবারই থাকে, শুধু ধক থাকে না সবার এই যা।
এই বয়সের মেয়েগুলি সবকিছুতেই হাসে। কারণে হাসে, অকারণে হাসে। দুটো মেয়েরই ফিগার বেশ ভালো, তবে একজনেরটা তার রাতের ঘুম ভুলিয়ে দেবার পক্ষে আদর্শ। এলাকায় নতুন মনে হচ্ছে। অথবা তার দোকানে এই প্রথম এল। এসেই দিব্যি দোকানের ছেলেটার কাছে একটা লিস্ট দিয়ে দিল, আর নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি শুরু করে দিল। নারান চোখ বন্ধ করে ওদের কথায় কনসেন্ট্রেট করল। দুটো নাম কানে এল, মিলি, আর মধুমিতা।
কোন মেয়েটার নাম কোনটা, সেটা বুঝতে এবার চোখ খুলল সে।
১১ মিলি
অয়নদার সব ভালো। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন গম্ভীর মুখে জ্ঞান দেওয়া শুরু করে যে কী বলব। দিব্যি ছিলাম, বাইরে গেছিলাম, ফিরে অয়নদার গলা শুনে খুশিই হয়েছিলাম, কিন্তু ও হরি!
ব্যাটা এসেই দিদির সাথে তুমুল তর্ক জুড়ে দিল। কী নিয়ে শুরু হয়েছিল জানি না, কারণ তখন বউদি কীসব কিনতে দোকানে পাঠিয়ে দিয়েছিল, এসে দেখছি হুলস্থুল কাণ্ড। পৃথিবীর নাকি যা গর্ব, সবই আসলে গরিব শ্রমিকদের শোষণ করে গড়ে উঠেছে। পিরামিড থেকে তাজমহল, আসলে দেখতেই ভালো লাগে, কিন্তু এর পিছনে যে কত লোকের রক্ত আছে সেটা আমরা ভুলে যাই। দিদি যতই বলে, তুই সবকিছু এত গরিব লোকে নিয়ে যাচ্ছিস কেন, কিন্তু কে শোনে কার কথা! ছেলেটা তর্কও করতে পারে। দিদির কথা শুনে বলে, “তুই থাম, গরিব লোকের কথা ভুলব মানে? গরিব লোক সব জোগান দিয়ে যাবে আর আমরা সেটা ভোগ করে যাব? আমরা তো নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি, তবু গরিব লোকেদের কথা আমরাই ভুলে যাই কেন?”
দিদি একেবারেই ঝগড়া করতে পারে না। ঝগড়া করতে গেলে দিদির কান মাথা সব লাল হয়ে যায়। অয়নদা যদিও আমার জান, তবু, দিদিকে এই অবস্থায় দেখে আমি খুব একটা খুশি হতে পারলাম না। কিন্তু আমিও যুক্তি খুঁজে পাই না। শেষমেষ আমি আর দিদি চুপচাপ বসে থাকলাম আর অয়নদা যত দুনিয়ার গরিব মানুষদের নিয়ে পড়ল। হঠাৎ দেখি অয়নদা চুপ করে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি কখন যেন বউদি এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের দরজায়।
বউদি বলল, “রূপসী, ও তোর সাথে পড়ে?”
দিদি মাথা নাড়ল। আমি খুব উত্তেজিতভাবে ইন্ট্রো দিতে গেলাম, “জানো বউদি, অয়নদা খুব ভালো পড়াশোনায়, যে-কোনও সময় বিদেশে রিসার্চ করতে যেতে পারে।”
বউদি বলল, “মিলি তুই একবার শুনে যা।”
বউদি বলেই নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। আমি একবার দিদির দিকে একবার অয়নদার দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বউদির ঘরের দিকে গেলাম। দাদার ঘরে ঢোকার পরে বউদি দরজা ভেজাতে বলল আমায়। দাদা এখন বাড়ি নেই। কোথাও একটা বেরিয়েছে। পাড়াতেই হয়তো।
দরজা ভেজানোর পরেই বউদি যেন খুব বড়ো কোনও কথা বলবে এভাবে আমাকে ফিসফিস করে বলল, “এখানে তোদের ঘরে একটা ছেলে চলে আসছে, তোর বাবা মা কেউ কিছু বলে না?”
আমি বউদির কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। এটা নিয়ে তো কোনওদিনই আমরা ভাবিনি। অয়নদা যখন ফাইভে পড়ে তখন থেকেই আমাদের বাড়ি আসে। বাবা বা মা-ও তো এটা নিয়ে কোনওদিন ভেবেছে বলে মনে হয় না।
আমি বললাম, “না, ও তো বন্ধু। দিদির বন্ধু। তা ছাড়া খুব ভালো পড়াশোনায়।”
বউদি বিরক্ত গলায় আমাকে থামাল, “বন্ধু মানে কী? বন্ধু বলে আবার কিছু হয় নাকি? একটা বয়সের ছেলে তোদের ঘরে ঢুকবেই বা কেন? স্ট্রেঞ্জ!”
আমি অবাক হলাম। বউদি তো কনভেন্টের স্টুডেন্ট। ওদের আবার এত সমস্যা থাকে নাকি ছেলেমেয়ে নিয়ে? নাকি আমাদের বাড়িতে একটু বেশি গার্জিয়ানগিরি ফলাচ্ছে? অয়নদাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে কোনওদিন যে কোনও সমস্যা হতে পারে সেটাই আমার কোনওদিন মাথাতে আসেনি।
আমি বললাম, “অয়নদাকে কিন্তু তুমি যেরকম ভাবছ সেরকম না।”
বউদি গলা নামিয়ে বলল, “ওরকম তোরা ভাবছিস। কত বদনাম হতে পারে সে খেয়াল আছে? লোকে কত কথা বলবে তোদের নামে, তোদের বিয়ে দেওয়াটাই চিন্তা হয়ে দাঁড়াবে একসময়।”
আমার ভীষণ হাসি পেল। মধুমিতা একটা কথা বলে আজকাল খুব। কিছু হলেই এই কথাটা বলে। এখন খুব সেই কথাটা বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল। বললে বউদির মুখটা কেমন দাঁড়াবে সেটা ভেবেই আমার পেটের ভিতরটা গুড়গুড়িয়ে উঠছিল। কথাটা আর কিছুই না, সেটা হল “বউদি, তোমায় দেয় কে?”
১২
জীবনটা আসলে সিনেমা না। তাই কোনও কোনও গল্প শেষ হয়ে গেলেও সেটা ফিরে ফিরে আসে। যে অস্বস্তিকর অধ্যায়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার কথা ভাবে সবাই, জীবনে সেটা হয় না। নইলে মোমের সাথে দেখা হবার কোনও মানে হয়?
