এদের বাড়িতে তিন ভাই। মা আর বাবা থাকে। এরা সব একসাথেই থাকে। এমনিতে এদের বাড়িতে নিজেদের মধ্যে বিরাট গলায় গলায় ভাব। বাইরের লোকে এক ভাইয়ের কিছু করলে বাকি দু-ভাই পারলে খুন করে আসে। কিন্তু নিজেদের মধ্যে এদের মাঝেমধ্যেই লাগে। বিষয়গুলিও হাইফাই। একদিন বড়ো ভাইয়ের পাতে মাছ কেন ল্যাজার পিস দিয়েছিল মেজো বউ, সে নিয়ে লাগল। তখন আমি পরীক্ষার পড়া করছিলাম। এদের ঝগড়া শুনে ছাদে গিয়ে দেখছি বড়ো বউ আর মেজো বউ ঝাঁটা নিয়ে উদোম গালাগাল শুরু করেছে, মেজো ভাই বড়ো ভাই আর ছোটো ভাই মিলে তাস খেলছে। তাদের কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই যে এত বড়ো ঝগড়া লেগেছে কোথায় সামলাবে! মানে চাপের যেন কোনও ব্যাপারই নেই। আমি ইতিহাস মিলিয়ে খুঁজে পেলাম না এরকম কেস কেউ কোনওদিন দেখেছে নাকি! শেষে আর চাপ না নিয়ে নিচে চলে এলাম। ভাইদের মধ্যেও লাগে। তাস খেলা নিয়ে। বিরাট হাতাহাতি। তখন আবার দেখেছি বউরা সেসব ব্যাপারে বেশি নাক গলায় না। মানে টোটাল ডেমোক্রেসি আর কি!
এদের ঝগড়া বাঁধলে পাগলটা এদের বাড়ির সামনে গিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে। দাড়ি-টাড়ি চুলকায়। একা একা লাফায়। মাঝে মাঝে আমি পাগলটাকে খাবারও দিতাম। তারপর দিদি যখন বলল পাগল-টাগলদের কাছে বেশি না ঘেঁষতে, এদের নাকি হট করে শরীরে হাত দেবার প্রবণতা থাকে; তারপর থেকে আর দিই না। শরীরে হাত দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য পাগলদের থেকে ভদ্রলোকেরা কোনও অংশেই পিছিয়ে থাকতে দেখিনি। বাসে উঠলেই ছুতোনাতায় পেছনে ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। কখনও কনুইটা বুকে ছুঁইয়ে ফেলে, এমন একটা ভাব যেন পুরো ব্যাপারটাই অ্যাক্সিডেন্টালি ঘটছে। জেনেবুঝে করেনি। আমি অবশ্য ছোড়নেওয়ালির মধ্যে পড়ি না। একদিন একটা বুড়ো মাল বাসের মধ্যে হঠাৎ বুকের মধ্যে কনুইটা ঠেকিয়েছিল আর আমি দিয়েছিলাম এক চিৎকার, “দাদু কনুইটা ইচ্ছা করেই তোলো নাকি? খালি বাসেও কাছে ঘেঁষে দাঁড়াতে হয়?” বাসের বাকিরা বুড়োটাকে ভালোমতোই দিল। বুড়োটা দেখলাম হে হে করতে করতে পরের স্টপেজে নেমে গেল।
হারামি আর কাকে বল। ইশ, বাজে ভাষা বেরিয়ে গেল। মা শুনলে এবার আমার সব চুল কেটে ছোটো করে দেবে।
১০
দোকানের ছেলেটার হাতটান আছে। নারান ওকে চোখে চোখে রাখে। একটু চোখের নজর এদিক-ওদিক হলেই খুচরো-টুচরো যা পায় পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। সবসময় বকাঝকা দেওয়া সম্ভবও না। বাজারে সবাই তাকে বোকাসোকা দোকানদার হিসেবেই চেনে। দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসলে বিকেলে ছ-টার সময় চা ফ্রিতে পাওয়া যায় বলে অনেকে বসেও। চারদিকের গল্পসল্প হয়। দেশের বিভিন্ন কথাও আলোচিত হয়। নারান ভালোমানুষের মতো মুখ করে সবই শোনে।
রেপ নিয়ে আলোচনা অনেকদিন হচ্ছে না। কারণ বেশ কয়েকদিন সেটা বন্ধ আছে। এখন কথা হচ্ছে এলাকায় পলাশের ফিরে আসা নিয়ে। সবাই অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে। পলাশ নাকি বাঘের বাচ্চা। দেবু হালদারকে তুলে নিয়ে গেছে। ক-দিন পরে নাকি লাশ পাওয়া যেতে পারে।
নারান জানে এসব যত বেশি হবে তত ভালো। লোকের ধ্যান সব এইসব রাজনৈতিক ঝামেলার মধ্যে থাকবে। সে কী করে বেড়াচ্ছে কেউ তত খোঁজ রাখবে না। অথবা ভাবতেই পারবে না। রেপের ক্ষেত্রে সবাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের পাবলিকদেরই সন্দেহ করে। এমনিতেই কচি বয়সের ছেলেপুলেই দলগুলিতে বেশি থাকে। তাদের গায়ের রক্ত বেশি গরম থাকে। নারান জানে, ওদের রক্তে উত্তেজনা থাকলেও ওদের ভুল করার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কোনওরকম হোমওয়ার্ক ছাড়াই ওরা মাঠে নামে। এসকেপ প্ল্যান থাকে না। খুব সহজে ধরা পড়ে যায়। আর ধরা পড়ে যাবার পর লোকলজ্জা কিংবা মিডিয়ার ভয়ে রাজনৈতিক দলের হাত ওদের মাথার ওপর থেকে সরে যায়। ওরা যতটা আনন্দে এই অপরাধ করে, জীবন ততটাই দুর্বিষহ হয়ে যায়। তবে ব্যতিক্রমও আছে। এইসব করে বুক চিতিয়ে চলাফেরা করা পাবলিকও আছে। তবে তাদের বাপের প্রচুর পয়সা। নেতা থেকে শুরু করে মেয়ের বাপ সবাইকেই কিনে নেয় তারা। কেউ টাকায় বিক্রি হয়, কেউ হয় ভয়ে।
নারান এইসবের কোনওখানেই তাই থাকতে চায় না। কাজ যেখানে শুরু হবে সেখানেই শেষ হবে। মাঝখানে কোনও কিছু ফেলে রাখার পক্ষপাতী সে নয়।
সন্ধেবেলা দোকানে বসে হিসাব মেলাতে বসেছিল নারান। শ্যাম্পুর স্যাশের হিসেব মেলাতে অনেকক্ষণ সময় লেগে যায়। একটু চোখের আড়াল হবার জো নেই, দেড় টাকা, তিন টাকা চোখের নিমেষে নিজের পকেটে চালান করে দেয় ছেলেটা। দোকানের সামনে কয়েকজন বয়স্ক লোক প্রতিদিনই বসে, তাদের কথাই কানে আসছিল মাঝে মাঝে, একজন যেমন বলছিল, “ভোটের সময় বাপু একটু শান্তিতে থাকা যায়, সবাই কেমন তেল মারে দেখবে এসে, এরকম সারাজীবন যদি ভোট থাকত তাহলে তো ভালোই হত, কী বলো?”
আর-একজন বলল, “যা বলেছ, তবে আমাদের পাড়াতে আবার অত শান্তিও নেই। মাঝে মাঝেই হুমকি শুনতে হচ্ছে। ওই যে তোদের ওই কী যেন নাম হাতকাটা পল্টু না কী, ব্যাটা এখন থেকেই বলে দিচ্ছে ভোটের দিন যেন একটু বুঝেসুঝে ভোট দিই। আমি তো আবার বলেই দিয়েছি, চিন্তা কোরো না বাপু, আমি তো তোমার দলেরই লোক, শুনে কোথায় ভাবলুম খুশি হবে, বলে কিনা, তাহলে কাকু এ বছর চাঁদাটা একটু বাড়িয়েই দিয়েন, অনেক এক্সটারনাল সোর্স তো বন্ধই আছে। বোঝো।”
