দিদিকে আবার খোঁচাতে ইচ্ছা হল, “কী রে? একটা বিশ্বস্ত জায়গা থেকে শুনলাম তুই নাকি প্রেম করছিস?”
দিদি রেগে গেল, “আমি মাকে ডাকি?”
আমি ভালোমানুষের মতো মুখ করে বললাম, “ডাক না। মাকেও বলি তাহলে?”
দিদি একটু শান্ত হল যেন, “কে এই সব ফালতু কথা তোকে বলে?”
আমি মিটিমিটি হাসতে লাগলাম। “সত্যি কি না বল।”
দিদি রেগেমেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ভালোই রেগেছে মনে হচ্ছে। মোবাইলটা ফেলেই গেছে। আমি আবার হাতালাম ফোনটা।
৮
ক্লাবটা যে মোটামুটি পার্টি অফিসে পরিণত হয়েছে, রূপমের এ সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। ক্লাবের মধ্যেই ভোটের জিনিসপত্র সব ডাঁই করে রেখেছে বাপ্পারা। ভেবেছিল ক্লাবে ঢুকে নস্টালজিক হবে, সেটা আর হওয়া হল না। বাপ্পা এসেই তাকে হঠাৎ করে খুব খাতির করে সবাইকে “এই আমাদের গুরু এসেছে রে” বলে ডেকে নিল। বেশিরভাগ মুখই অপরিচিত। কারও কারও চেহারা দেখেই বোঝা যায় স্বাভাবিক নিয়মে জীবনযাপন করার পাবলিক এরা কেউই নয়।
তাকে ঘিরেই মোটামুটি সব বসল। বাপ্পা বলল, “গুরু তুই তো ঘ্যাম চাকরি করছিস! আমাদের পার্টি ফান্ডে কিছু দে!”
পাপনও ছিল ওখানে। বাপ্পার কথা শুনেই তেড়ে উঠল, “ছেলেটাকে একটু বসতে দে। আসতেই নিজের ধান্দার ঝুলি খুলে বসলি?”
পাপনের সঙ্গে চিরকালই রূপমের বেশি জমত, সে পাপনের কথা শুনে হেসে ফেলল, “বাপ্পাটা বহুত ধান্দাবাজ হয়ে গেছে বল? আর এটা তো আমাদের পাড়ার ক্লাব। এখানে পার্টির কথা আসছে কেন হঠাৎ?”
বাপ্পা দেঁতো হাসি দিল তার কথা শুনে। বলল, “আহ গুরু, তুইও না তেমনি। ক্লাবে একটু ওসব রাখতে হয়। তুই বুঝবি না। গরমেন্টের অনেক গ্র্যান্টের ব্যাপারস্যাপার আছে। সেগুলো তো ক্লাবের কাজেই লাগছে নাকি? এই দেখ না, গত মাসে কম্বল বিতরণ করে ফেললাম।”
রূপম অবাক হল, “এই গরমের মধ্যে কম্বল দিয়ে কী হবে?”
বাপ্পা আক্রমণাত্মক হবার চেষ্টা করল, “কম্বল কত কাজে লাগে জানিস? যারা ফুটপাথে থাকে তাদের তোশকের কাজও করে।”
রূপম হাত তুলে থামতে বলল বাপ্পাকে, “ঠিক আছে। আমি এই ব্যাপারে আর কিছু বলব না। যা ভালো বুঝিস কর। এলাম ক্লাবে পুরোনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতে, আর কিছুই মিলছে না দেখছি।”
বাপ্পা আহত গলায় বলল, “এরকম করে বলিস না। আমি কি তোর বন্ধু না? পাপনও তো আছে।” রূপম বলল, “বন্ধুর থেকে তোকে শাসক বেশি মনে হচ্ছে আজকে।”
পাপন ফুট কাটল, “ও তো এখন পুরোদমে নেতা-ই রে। পরের বার কাউন্সিলরে দাঁড়াচ্ছে।”
বাপ্পা পাপনের দিকে একটা আগুনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “ফালতু কথায় কান দিস না, আমি মানুষের সেবাই করে যেতে চাই বাকি জীবনটা।”
রূপম আর কিছু বলল না। মা-র কথাটা মনে পড়ে গেল। এখানে এখন একটা অদ্ভুত সময় চলছে। কোনও কিছুই নর্ম্যাল না। সবাই কেমন তেতে থাকছে। সবাই কিছু একটা হবার চেষ্টা করছে। সোজা পথে চাকরি হবার রাস্তাঘাট বন্ধ প্রায়। পুরোটাই বাঁকা পথে সমাজসেবা টাইপ ডায়লগ মেরে কেমন একটা পাবলিক গিমিকের চেষ্টা।
পাপন বলল, “তুই আছিস ক-দিন?”
রূপম বলল, “সাত দিন। অফিসে ছুটির হাল খুব খারাপ আসলে। পুজোয় তো আসতেই পারলাম না। এলাকার খবর কী রে?”
বাপ্পা দাঁত বের করল, “ফাইন। একদম ঝাক্কাস।” বাকি ছেলেগুলি তাদের কথোপকথন শুনছিল, কেউ কোনও কথা বলছিল না। ওদের শীতল চোখগুলির দিকে তাকিয়ে রূপমের হঠাৎ একটু অস্বস্তি হওয়া শুরু হয়েছিল। একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল।
পাপন বাপ্পার কথা শুনে মুখ কুঁচকোল, “ফাইনই বটে। মাঝে মাঝেই লাশ পড়ছে। ছ-সাত মাস পর পর রেপ হচ্ছে, ফাইন ফাইন।”
বাপ্পা পাপনকে একটা ধমক দিল, “ফালতু কথা বলবি না। আমাদের প্রতাপনগর কি ভারতের বাইরে? সব জায়গায় যেরকম রেপ মার্ডার হয়, এখানেও হয়। বিহারে ইউপিতে এর থেকে অনেক বেশি হয়। আর তোরা এই রেপ মার্ডার আগের আমলে দেখিসনি? সব কি এই আমলেই হচ্ছে?”
পাপন ছাড়ল না, “সব আমলেই হয়েছে। কিন্তু এরকম বুক বাজিয়ে কোনও গুন্ডাকে নেতাগিরি করতেও দেখিনি।”
বাপ্পা বলল, “দেখ পাপন, এখানে ও এসেছে। আবার শুরু করিস না প্লিজ। তুই আমার বন্ধু বলে এসব বলে পার পেয়ে যাস। আমাদের দলের ছেলেরা যথেষ্ট কথা শোনে আমার তাই। আমি কিন্তু সবসময় তোকে বাঁচাতে পারব না এটা মনে রাখিস। কখন কোন অন্ধকারে মারধোর খেয়ে যাবি, তখন তো আবার কাঁদতে কাঁদতে সেই আমার কাছেই আসতে হবে তোকে।”
রূপম চমৎকৃত হল। বাহ। বাপ্পার তো প্রচুর উন্নতি হয়েছে!!!
৯ মিলি
বাড়ির সামনে কদিন ধরে একটা পাগল আস্তানা গেড়েছে। কোত্থেকে এসেছে কে জানে। বসে থাকে চুপচাপ আর পাড়ার কুকুরগুলি সব তাড়া করে। বউদি একবার দেখেই আমাকে বলে দিয়েছে এইসব ওদের ওখানে ভাবাই যায় না। ট্রেসপাসারস ইত্যাদি নাকি ওদের অ্যাপার্টমেন্টের গেটে ঢুকতেই পারে না। ওরা যেদিন এল সেদিনই আমাদের পিছনের বাড়িতে বিরাট ঝগড়া লেগেছিল। আমাদের মফস্সলে এইসব স্বাভাবিক ঘটনা। বউদি সেটা দেখেও বেশ কয়েকবার বিরক্তি প্রকাশ করেছে।
আমার তো ঝগড়া দেখতে চরম লাগে। একবার যদি দেখি ঝগড়া লেগে গেছে, টুক করে ছাদে চলে যাই, একটু আচার ম্যানেজ হয়ে গেলে তো কথাই নেই। কতরকম নতুন নতুন গালাগাল যে শেখা যায় তার তো সীমা নেই কোনও। বোকাচোদা শব্দটা এই ঝগড়া থেকেই শিখেছিলাম। তখন আমি ক্লাস ফাইভ। দিদির সাথে কী একটা নিয়ে লেগেছিল, মা-ও ছিল ঘরে, আমি দিদিকে “বোকাচোদা” বলে দিয়েছিলাম। মা সেটা শুনে কী মার যে মারল, আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারিনি কেন মেরেছিল। পরে মধুমিতা শিখিয়ে দিয়েছিল বোকাচোদা মানে কী। শুনে ফিকফিক করে অনেকক্ষণ হেসেছিলাম আর মা-র সেই মারটা মনে পড়ে গেছিল। মধুমিতা অবশ্য আমাকে অনেক গালাগালির মানেই শিখিয়ে দিয়েছিল। তার সঙ্গে সব ক-টার সন্ধিবিচ্ছেদ। তবু বাড়ির পিছনে এই সাহাবাড়ির ঝগড়াটা হলেই আমি কান খাড়া করে আমার গালাগালির ভোকাবুলারি বাড়ানোর চেষ্টা করে যাই। ক্লাসে তো সবই নিরিমিষ গালাগালি শুনতে পাই। এখানে মাঝে মাঝে কয়েকটা কড়া জিনিস শোনা যায়। খানকির ছেলে এদের কাছে নার্সারির গালাগালি। কতরকম যে এদের স্টকে আছে কে জানে!
