ক্লাবের দিকে রওনা হতেই তার দেখা হয়ে গেল বাপ্পার সাথে। তাকে দেখে বাইক আস্তে করল। বেশ একটা হোমরাচোমরা ভাব এসেছে। বাপ্পাকে তারা ছোটোবেলায় শালিখ বলে ডাকত। শালিখ নামটা বাপ্পাদের পারিবারিক নাম। সে শুনেছে বাপ্পার বাবাকেও তার বাবা শালিখ বলে ডাকত। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নাম বলা যেতে পারে। বাপ্পা দাঁড়াতেই সে ঠিক করল সেই নামেই ডাকবে। মা-র কাছে খাদ্য সুরক্ষার ব্যাপারে কথা শুনে তার বেশ রাগ হচ্ছিল। সে হাসতে হাসতেই বলল, “কী রে শালিখ, কেমন আছিস?”
বাপ্পার বাইকের পেছনে মনে হয় একটা চামচা বসেছিল। এই ডাকটা শুনে সে অন্যদিকে মুখ ফেরাল। বাপ্পা ব্যাপারটাকে হালকা করতে চাইল হেসে, “আহ গুরু, তুমি এখনও সেই ছোটোবেলাতেই আছ দেখছি।”
রূপম বলল, “হ্যাঁ তুই যে নেই সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। ন্যাতা হয়েছিস নাকি?”
বাপ্পা অপ্রস্তুতের মতো হাসল, “হে হে, গুরু, ওসব কিছু না, সোশ্যাল সার্ভিস আর কি। আগের পার্টি তো সব শেষ করে দিয়ে গেছে, তাই আমাদেরই একটু বেশি দায়িত্ব নিয়ে দেশটা বাঁচাতে হচ্ছে বুঝতেই পারছিস।”
রূপম হাসল, “হ্যাঁ তা তো বুঝতেই পারছি। তা ব্যবসা কেমন চলছে?”
বাপ্পা দাঁত বের করে হাসল, “তা গুরু ভালোই। সবই সোশ্যাল সার্ভিস কি না। যাক গে, তুই বাইকে ওঠ। এই ঘোৎনা, তুই হেঁটে আয়, আমি ক্লাবে যাব।”
রূপম দেখল পেছনের চামচাটাকে নামিয়ে দিল বাপ্পা। সে চুপচাপ বাপ্পার বাইকের পেছনে গিয়ে উঠল। মজাই লাগছিল তার শালিখের সঙ্গ। কেমন একটা হনু হনু ভাব, আর তলায় বইছে একটা জোকারির মলয় বাতাস।
৭ মিলি
দিদি মোবাইলটা খুটখুট করছে। আমি ভালোমানুষের মতো মুখ করে ওকে দেখছি শুধু। ওর সঙ্গে এমনভাবে মিশতে হবে যেন ও জানতেও না পারে ও কী করে বেড়াচ্ছে সেটা আমি জানতে পেরে গেছি।
করছে বলতে অবশ্য সেরকম কিছুই করেনি। অয়নদার সঙ্গে প্রত্যেকবারের মতো পড়তে যায়, মধুমিতা ফলো করবে কাল থেকে। খেলার নিয়ম পরিষ্কার। দিদি এখন আমার শত্রু। আর মধুমিতা যতই শয়তান হোক, এখন আমরা বিক্ষুব্ধ শ্রেণি। আমাদের হাত মেলাতেই হবে।
দিদির মোবাইল আজ আরও একবার ঘাঁটার সুযোগ পেয়েছি। ও যখন স্নানে গেছিল। বেশ কয়েকবার চেক করে নিয়েছি। অয়নদার সাথে বিরাট কিছু কথা হয় না। কিন্তু বেশ কিছু কথা অনেক কিছু মিন করে।
যেমন –
অয়নদা- আজ কলেজের পরে দাঁড়াস। কথা আছে।
দিদি- বটগাছ।
এরপরে শুধু অয়নদার একটা স্মাইলি, তাও হাসি হাসি মুখওয়ালা। এর থেকেই বোঝা যায় এদের মধ্যে একটা গভীর আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে। কলেজের পরে কোথায় দেখা হবে একগাদা কিচ্ছু লেখেনি। দিদি শুধু বটগাছ লিখেছে তাতেই দুজনে যা বোঝার বুঝে গেছে। হাইলি সাসপিশাস ব্যাপার, মানতেই হবে। তবে আমার চোখকে ফাঁকি দিয়ে পালাবে কোথায়! আমিও আমার ফোন থেকে অয়নদাকে একটা জোক পাঠিয়ে দিলাম। ইন্টেলেকচুয়ালওয়ালা। ননভেজ পাঠাই না কোনওদিন। মধুমিতা প্রচুর ননভেজ জোক পাঠায়, কোনও-কোনওটা পড়লে রীতিমতো গা ঘিনঘিন করে। সেগুলো পড়েই অবশ্য ডিলিট করে দিই। দিদির চোখে পড়লে দিদি যদি মাকে বলে দেয় তাহলে আর দেখতে হবে না। মা এখনও আমাকে মাঝে মাঝে দু-চার ঘা দিয়ে দেয়। বড্ড লাগে। আমারও একটা প্রেস্টিজ আছে। আমি যে এখন বড়ো হয়ে গেছি মা সেটা বুঝতেই চায় না। ওদিকে নিজেই বলে মেয়েদের শরীর খারাপ হয়ে গেলে মেয়েরা বড়ো হয়ে যায়। দিদিকে মা আমার থেকে অনেক বেশি ভালোবাসে। সেটা আমি বুঝতে পারি। বাসুক। আমাকে কাউকে ভালোবাসতে হবে না। অয়নদা ভালোবাসলেই হবে।
বাবা টিভির ঘরে বউদির সাথে হিন্দি সিরিয়াল দেখছে। বেচারা অন্যান্য দিনগুলিতে এই সময় নিউজ চ্যানেলগুলি খুলে বসে থাকে। আজকে সেটাও করতে পারছে না। দিদিকে বললাম, “এই দি, চ’ বাবাকে একটু জ্বালিয়ে আসি।”
দিদি চোখ পাকিয়ে তাকাল আমার দিকে, “খুব মজা না? যা না, বউদির ওখানে গিয়ে তুই বস না। বাবা বরং একটু ঘুরে আসুক। ওখানে বউদির সঙ্গে কাউকে না কাউকে তো বসতেই হবে। আমরা বসতে পারব না বলেই তো বাবা বসেছে।”
আমি মাথা নাড়লাম জোরে জোরে, “না না, আমার কাল পরীক্ষা আছে টিউশনে। একটা কাজ কর না, তুই-ই যা তাহলে।”
দিদি রেগে গেল, “তাহলে চুপচাপ পড়ে যা। সার্কাস দেখতে হবে না। মাকে ডাকব?”
আমি আর দিদির দিকে তাকালাম না। জোরে জোরে পড়তে লাগলাম। দিদিটা এমনি ভালোমানুষ আছে। কিন্তু বাবাকে কিছু বললেই রেগে যায়। বাবার ন্যাওটা একটা। আমি অবশ্য ছটফট করছি একবার দেখে আসি বউদির সামনে বাবা কী করে সেটা দেখতে।
আজকে সকালে অবশ্য একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে। লুচি নিয়ে বউদি কোনও অভিযোগ করেনি। বরং চারটে দিয়েছিল মা প্রথমে, চেয়ে নিয়েছে আরও দুটো। খাওয়াদাওয়ার পরে আমাদের সবাইকে অবাক করে মাকে বলেছে ইলিশমাছ রান্না শিখতে চায়। দাদা অবশ্য সেসব শুনে কেশে-টেসে একশা করেছে। তাতে আবার বউদি রাগও করেছে। তবে দাদার উপর বউদি রাগ করলেও সেটা আমাদের সামনে বেশি দেখায় না বউদি। বেশ সবার সামনে হাসি হাসি মুখ করে থাকে। আমার সেটা কেমন যেন লাগে। এত ভদ্রতাও মাঝে মাঝে চোখে লাগে।
খানিকক্ষণ পড়লাম। কিন্তু আর ইচ্ছা করছিল না।
