দোকানে বিভিন্নরকম বিশেষজ্ঞ বসে। সে সবার কথাই শোনে। এক পক্ষ বলল এটা কিছুতেই একা কেউ করতে পারে না। নিশ্চয়ই কোনও গ্যাং আছে এর পেছনে। কোনও পক্ষ আবার পুরো ব্যাপারটা রসিয়ে রসিয়ে বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করতে লাগল।
সে চুপচাপ নির্বিকার মুখে এদের কথাগুলি শোনে। নারান খুব ভালো করেই জানে, একা এভাবে করাটা কতটা কঠিন। কিন্তু সে নিজেকে একজন শিল্পী বলে মনে করে। যে লোকটা ভালো ছবি আঁকতে পারে, তার থেকে সে নিজেকে কোনওভাবেই কম করে দ্যাখে না। একা একা বসে এক-একটা কেস মনে করে, আর নিজের তারিফ করে। কী অবিশ্বাস্য নিখুঁত দ্রুততায় গোটা ব্যাপারটা করে ফেলেছিল সে।
দোকানে বসে বসে আগের কেসগুলির কথাই ভাবছিল সে। প্রায় সাত মাস হতে চলল সে চুপচাপ বসে আছে। লাস্ট কেসটায় খুব হইচই হয়েছিল। এক মেয়ে ফটোগ্রাফার ক্যামেরা ঝুলিয়ে গ্রামের নির্জন দিকটায় এসেছিল কীসব ফটো তুলতে। নিজেই গাড়ি চালিয়ে এসেছিল। নারান তক্কে তক্কে ছিল। তিনদিনের মাথায় সাফল্য এল। কিন্তু মেয়েটার মাথাটায় চোট লাগার ফলে মেয়েটা আগেই মরে গিয়েছিল। নারান মাথা লক্ষ্য করে ইট মেরেছিল। কাছে গিয়ে দেখেছিল বেজায়গায় লেগে ওখানেই পড়ে আছে। মরে যাবে আগে বুঝতে পারেনি। কাবু করাটাই টার্গেট ছিল। সেটা হয়ে ওঠেনি বলে খারাপ লেগেছিল।
তারপর লাশটাকে কাছের পুকুরে ফেলে চলে এসেছিল সে।
কদিন ধরে আবার মনটা কেমন করছিল তার। অনাবৃত দেহের গন্ধটা স্বপ্নেও আসছিল তার। দোকানে বসে বসেই চোয়াল শক্ত করল সে। অনেকদিন হল। এবার আবার নামতে হবে।
৬
বন্ধুদের মধ্যে কেউ সফল হলে পাড়ার বাকি বন্ধুরা সবাই যে উদ্বাহু নেত্য করে, তা নয়। রূপম জানে, যে বন্ধুদের সঙ্গে কৈশোরে, বয়ঃসন্ধিতে ঘুরে বেড়িয়েছে, মেয়ে দেখেছে, নারী-পুরুষের মিলন সম্পর্কিত জিগস পাজল সলভ করেছে, তারাই এখন অনেক দূরে চলে গেছে। তবু সন্ধেগুলো বাড়িতে বসে সময় কাটাতে তার ইচ্ছা করল না। এর আগেও ক্লাবে গিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। এবারে বসে বসে টিভিতে ঘ্যানঘ্যানে হিন্দি সিরিয়াল দেখার চেয়ে বাইরে যাওয়াটাই ঠিক করল সে। বাড়ির একমাত্র টিভিটা বোনেরা বউদিকে ছেড়ে দিয়েছে। শ্রাবন্তী বসে পড়েছে যথারীতি।
মা আবার রান্নাঘরে লেগে পড়েছে। রূপম ধীর পায়ে রান্নাঘরে ঢুকল। মা বেগুন কাটছে, রূপম বলল, “রূপসী নেই? তুমি তো একাই করে যাচ্ছ দেখছি।”
মা হাসল। বলল, “পড়বে না নাকি রে? তুই জামাকাপড় চেঞ্জ করলি যে? বেরোবি কোথাও?”
রূপম বলল, “হ্যাঁ, ক্লাবে যাব ভাবছি।”
মা ক্লাবে যাবার নাম শুনে খুশি হল না। বলল, “দেখিস, পার্টি নিয়ে কোনও কথা বলিস না। এখন সময় ভালো না। কে কখন কোথায় গিয়ে লাগিয়ে দেয়। খাদ্য সুরক্ষা নামে এক নতুন জিনিস শুরু হয়েছে, জানিস আমাদের বাড়ির নামই তোলেনি। তোর ওই বন্ধু, কী নাম যেন, হ্যাঁ বাপ্পা। ওকে তোর বাবা গিয়ে ধরল। বলে কিনা, কাকু বুবাই তো বিরাট চাকরি করছে। কী দরকার। অথচ ওরা নেতা। ওদের যা আয় তাতে তোর পাঁচবার মাইনে হয়ে যাবে। কে বোঝাবে বল এসব?”
রূপম বলল, “খাদ্য সুরক্ষা হোক আর যাই হোক, সেসব নেবার দরকার কী আছে? আমি যা পাঠাই তাতে হচ্ছে না?”
মা বলল, “হয়, কিন্তু সবাই পাবে, আমরা কেন বাদ যাব বলতে পারিস? ছেলে বাইরে চাকরি করে, কলকাতার মেয়ে বিয়ে করেছে, সবার চোখ টাটায় এটা বুঝিস না?”
রূপম হেসে ফেলল, “মা তোমার গর্ব হয়, না?”
মা-ও হাসল। “হবে না? ক-টা ছেলে আছে পাড়ায় তোর মতো? ওই তো একটা সেই ব্যানার্জিবাড়ির ছেলেটা। কিন্তু ওর পেছনে ওর বাপ মা কত খরচ করেছিল সেটা ভুললে হয়? আর তুই তো সব নিজের স্কলারশিপের টাকাতেই পড়েছিস। বাকিগুলো সব কেউ নেতার চামচা, কেউ এর ওর তার সাথে ঝগড়া করে ঘুরে বেড়ায়। গর্ব তো হবেই।”
রূপম বলল, “তাহলে ওদের কিচ্ছু বলার দরকার নেই। উপেক্ষা করো। ওদের কাছে হাত পাততে হবে এত খারাপ দিন আমাদের আসেনি।”
মা তার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই বয়সে এত চাপ নিস কী করে? এত বড়ো একটা সংসারের বোঝা নিয়ে চলছিস, পারবি? তার থেকে আমরা এই করে যদি কিছু করতে পারি সেটাই ভালো হবে।”
রূপমের একটু খারাপ লাগল। শ্রাবন্তী কি মাকে ঠারেঠোরে কিছু শুনিয়েছে? মা তো কোনওদিন এইসব কথা বলত না! সে শক্ত হল। বলল, “দ্যাখো মা, আমি ওইসব বুঝি না। চাপ নিতে হলে নিতে হবে। আমি তো বাড়িরই ছেলে। আমি আরামে থাকব আর তোমরা ওই বাপ্পাদের মতো চামচাদের ধরে রেশনের চা খেয়ে বাঁচবে সেটা হতে দেব না। সে যে যাই বলুক।”
মা হাসল, “সত্যি, তুই সেই রকমই রয়ে গেলি। যাহ্, ঘুরে আয়। আমি আর কাউকে কিছু বলছি না। খুশি?”
রূপম বলল, “হ্যাঁ। খুশি। আমি বেরোলাম।”
মা বলল, “তাড়াতাড়ি ফিরিস।”
রূপম ভাবছিল কোনও কোনও জিনিস কোনও অবস্থাতেই পরিবর্তন হয় না। সে যখন বিকেলে খেলতে যেত তখনও মা এভাবেই বলত তাড়াতাড়ি ফিরিস। আর আজকেও…
টিভির ঘর দিয়েই বাইরে যাবার দরজা। রূপমকে বেরোতে দেখে শ্রাবন্তী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। রূপম বলল, “আসছি ঘুরে। তুমি টিভি দ্যাখো।”
বাবার দিকে একবার তাকিয়ে কোনওমতে হাসি চেপে বাইরে বেরোল সে। বাবা বউমার সামনে এক্কেবারে তটস্ত হয়ে বসে আছে। টিভির দিকে গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে। এমনি সময় সে বা বোনেরা টিভিতে সিরিয়াল দেখলে বাড়ি মাথায় করে তুলত। এখন চুপচাপ বসে বউমার সাথে সিরিয়াল দেখছে।
