এইসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাই চলছিল আর সেই সময়েই স্যার পড়া থামিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন। স্যার এমএ-র ছাত্র। আমাদের থেকে বেশি বড়ো না। কিন্তু তেজে এক্কেবারে বিরাট কোহলি।
বললেন, “তোমরা তো সবই জানো দেখছি। পড়াবার কি আর কিছু দরকার আছে? খামোখা পড়াচ্ছি। মাস গেলে মাইনে নিয়ে গেলেই পারি!”
আমি ভালোমানুষের মতো মুখ করে বললাম, “না স্যার, আসলে আমরা রাত্রে একটা গ্রুপ স্টাডির প্ল্যান করছিলাম তো তাই আর কি…”
বলছিলাম আর মনে মনে হাসছিলাম। গ্রুপ স্টাডি না ছাই। কিন্তু ইমেজটাও তো ঠিক রাখার একটা ব্যাপার আছে, তাই না?
স্যার যদিও আমার প্রশ্নে খুব একটা সন্তুষ্ট হলেন না। বললেন, “সেটা তো পড়ার পরেও করা যেত, তাই না? আমি দেখেছি, এই ব্যাচে তুমি আর মধুমিতাই একটু বেশি গসিপিং করো। দ্যাখো, সেরকম হলে কিন্তু তোমার বাবা মা-র সাথে কথা বলব আমি।”
আমি বুঝে গেলাম কেলো আসন্ন। এক্কেবারে আত্মসমর্পণ করে দিলাম, “স্যার, প্লিজ প্লিজ প্লিজ, আর হবে না।”
স্যার গম্ভীর হয়ে বললেন, “ঠিক আছে দেখছি, এরপরে যদি হয় তাহলে বুঝতেই পারছ।”
স্যার পড়ানো শুরু করলেন আবার। আমাদের ব্যাচটা সাতজনের। আমি আর মধুমিতা মেয়ে আর পাঁচটা ছেলে। পাঁচটা ছেলের চারটে এক্কেবারে রাহুল দ্রাবিড়ের মতো কপিবুক ভালো ছেলে। আর-একটা আছে, পার্থ। ব্যাটার নজর ভালো না। কথা বলতে বলতে বুকের দিকে তাকানোর বদভ্যাস আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় চোখ গেলে দি পেন দিয়ে। এখনও যখন স্যারের সাথে আমার এই কনভোটা চলছে, মিটিমিটি হাসছিল। স্যার পড়ানো শুরু করতেই আমি কড়া চাউনি দিলাম একটা ওর দিকে। সামনাসামনি চাউনি খেয়ে একটু ভেবলে গেল।
সত্যি কথা বলতে কী আমিও জানি, আমার বাবা মা-ও জানে পড়াশোনা আমার বেশি হবে না। কোনওমতে মাধ্যমিক পাশ করেছি বটে কিন্তু দাদা আর দিদির মতো সায়েন্স পাইনি। ভাগ্যিস পাইনি, কারণ অঙ্ক দেখলে আমার গায়ে রীতিমতো ভূমিকম্প দিয়ে জ্বর আসে। তা ছাড়া পৃথিবীর সবাইকে অঙ্ক জানতে হবে এরকম মাথার দিব্যিও কেউ দেয়নি। এই কথাটা অবশ্য আমার না। অয়নদার কথা। অয়নদার এই কথা কেন, সব কথাই দারুণ। অয়নদার সঙ্গে কাটানো সব ক-টা সময়ই দারুণ।
অয়নদার হাসি দারুণ, অয়নদার হাতের লেখা দারুণ, অয়নদার লেখা কবিতাগুলি দারুণ, এমনকি অয়নদা যে গ্লাসে জল খায় সেই গ্লাসটা পর্যন্ত দারুণ। আমি গ্লাসটা ধুই না। ওই গ্লাসেই জল নিয়ে খাই। কেমন একটা অদ্ভুত ফিলিং হয়।
আমি একটা জিনিস ঠিক করে নিয়েছি, দিদির সাথে যদি অয়নদার কিছু থেকেও থাকে, আমি তবু অয়নদাকেই ভালোবাসব। তাতে যা হবার হবে।
৫
অনেকদিন কচি মেয়ের গায়ের গন্ধ পায়নি সে।
নিজের মুদির দোকানে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নারান। বয়স হচ্ছে। কিন্তু ইচ্ছাটা তো একইরকম আছে। কাঁহাতক আর এক মেয়েছেলে নিয়ে শরীরের খিদে মেটানো যায়! ওইসব পাড়াতে গেলে আবার বিভিন্নরকম রোগের ভয় আছে। আর ওপরে ফাউ টাকা দিয়ে আসতে হয়, কী দরকার!
এই বাধা থেকেই তো সে প্রথম রেপ করেছিল সেভেনের মেয়েটাকে। স্কুল থেকে ফিরছিল। আমবাগানের ভিতর দিয়ে শর্টকাট। নারান ক-দিন ধরেই ওঁত পেতে ছিল। একদিন সাইকেল আটকে মুখ চিপে কাছের পরিত্যক্ত ইটভাঁটার কাছে নিয়ে গিয়ে যা করার করে ফেলল। মেয়েটা গোঁ গোঁ করছিল, নারান বুঝতে পারছিল জোরটা বেশিই হয়ে গেছিল। মাথাটা অবশ্য বরাবরই ঠান্ডা তার। জীবনের প্রথম খুনটা করতেও কোনও অসুবিধা হয়নি। যখন মনে হচ্ছিল মেয়েটা একটু বেশিই কাহিল হয়ে পড়েছে, আর রিস্ক নেয়নি সে। গলাটা খানিকক্ষণ অবহেলায় ধরে শ্বাস বন্ধ করে দিল। দশ মিনিট পরে আবার বাজারে নিজের দোকানে নির্বিকারভাবে বসে থাকতে দেখা গেছিল তাকে। এলাকায় ক-দিন ধরে হইচই, দোকানে দোকানে কথা, বাজারে, চায়ের দোকান সরগরম, লোকে লোকারণ্য, নারান কিন্তু চুপচাপ। আর পাঁচটা লোকের মতোই দোকানে বসে আছে। জিনিস বিক্রি করছে। বাড়িতে বউয়ের কথা অনুযায়ী বাজার এনে দিচ্ছে, ছেলেকে সাইকেল করে স্কুলে দিয়ে আসছে। কস্মিনকালেও কেউ কোনওদিন ভাবতে পারেনি এত বড়ো কাণ্ডের মূলে তার মতো একজন “নির্বিরোধী, নিরীহ” লোক এই কাজ করেছে।
একবার না, দুবার না, নারানের হিসেবে এখন পাঁচটা ধর্ষণ করে খুন করা হয়ে গেছে। কেউ বুঝতে পারে না কে করছে এত কিছু। ঘটনা ঘটার ক-দিন খুব পুলিশি তদন্ত চলে, এলাকার পুরোনো পাপীগুলোকে পুলিশ তুলে নিয়ে চলে যায়। এই ক-টা দিন নারান চুপচাপ থাকে। এক্কেবারে কোনওরকম বেচাল করে না। গত তিন বছর আগে শুরু করেছিল এই কাজটা। তিন বছরে পাঁচবার মানে ছ-মাসে একবার। তার নিজের কাছে স্ট্রাইক রেট ঠিকই আছে।
কচি মেয়েগুলি যখন ছটফট করে, প্রথমে প্রবলভাবে বাধা দিতে দিতে একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে, সেই সময়টাই তার নিজেকে সবথেকে বেশি পরিতৃপ্ত মনে হয়। একবার গায়ের জোর পুরোদমে প্রয়োগ হয়ে যাবার পরে তো নিস্তেজ হয়েই থাকে, তারপরে সুইচ অফ করে দেবার মতো করে খুন করাটা আজকাল তার কাছে জলভাত হয়ে গেছে। শেষবারের সময় অবশ্য মেয়েটা মারাই গেল। তাতেও অবশ্য সে কাজটা অসম্পূর্ণ রাখেনি। করেই নিয়েছিল।
