যা হয়েছে অবশ্য বিভাসবাবুর কাছে একদিকে ভালোই হয়েছে। হিসেব করে দেখেছেন যে ক-টা মেয়ের সাথে তিনি এককালে লাইন মেরেছিলেন, তার একজনও অনামিকার নখের যোগ্য নয়। একটু একটু করে টাকা বাঁচিয়ে, কীভাবে সংসারটা এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তা অনামিকার থেকে ভালো কেউ জানেন না। এদিকে হামলে পড়ে সংসার করাও আছে, অন্যদিকে তাঁর দিকেও কড়া নজর। স্বামীর ডায়াবেটিসের প্রেমের ছোঁয়া লাগার পর থেকে কীভাবে চায়ে চিনি কমিয়েও চা-টাকে চায়ের মতো বানাতে হয় তাতে অনামিকার মাস্টার ডিগ্রি করা আছে। আবার সামান্য কুচো চিংড়ি যে ইঁচড়কে কোন স্বর্গীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এ ব্যাপারেও তিনিই সেরা। সুতরাং গিন্নি ভাগ্য বিভাসবাবুর ভালোই।
কিন্তু বিভাসবাবু আজকাল ছেলেকে ভয় পান। যে সামান্য সঞ্চয় আছে তাঁর তা এই বাজারে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়। সোনার দাম থেকে শুরু করে ফাউ খেয়ে নিন্দে করে যাওয়া পাঁচশো লোকের খাওয়ানোর খরচও কম না। রূপমের বিয়ের সময়েও বেশ মোটা টাকা খরচা হয়ে গেছে। রূপম তখন সবে সবে চাকরিতে ঢুকেছে। বিয়ে করার জন্য হাত পেতে বসল। চাকরি ছিল তখন। পিএফ থেকে নন-রিফান্ডেবল লোন তুলে ফেললেন ভালো অ্যামাউন্টের। এর আগেও নিতে হয়েছিল রূপমকে পড়াবার সময়ে। এখন ব্যালান্স শিট মিলছে না। মেয়েদের বিয়ে দেবার জন্য তাই রূপমের মুখাপেক্ষী হয়ে তাঁকে থাকতেই হবে। আর রূপমের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হলে ছেলেকে একটু ভয় পেতেই হবে তাকে।
বউমা বাথরুমে গেলেও বিভাসবাবু তাই বেশি জোরে চেঁচাতে পারেন না। শেষে লুঙ্গিতেই হয়ে যাবে বলে পাশের বাড়িতে দৌড়োতে হয় তাকে। মোট কথা তিনি একেবারে ভালো নেই। ভেতরে ভেতরে ভয়ে ভয়ে তিনিও চান ভালোয় ভালোয় ছেলে বউমাকে নিয়ে এ ক-টা দিন থেকে আবার গুরগাঁও ফিরে যাক। ওই ফোনে “কী রে কেমন আছিস, খাওয়াদাওয়ার দিকে নজর দিস” টাই ঠিক আছে। সামনাসামনি হওয়াটাই টেনশনের। কেমন যেন একটা চোরা অস্বস্তি কাজ করে মনের ভিতর।
বাড়িতে লুচি হচ্ছে। বেজার মুখে কাগজটা খুলে বসে মনে মনে খিটখিট করতে থাকেন তিনি। অনামিকা তাঁকে লুচি দেবে না। ডাক্তার বলেছে তেলের জিনিস যত কম শরীরে প্রবেশ করে ততই মঙ্গল। অনামিকা সেই গাইডলাইন এক্কেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেন। এমনকি বাপের অত প্রিয় মেয়ে দুটোও। কিছুতেই একটা ওই হালকা তেলে ভাজা স্বর্গীয় ময়দার জিনিসটা তাঁর পাতে পড়ার কোনও চান্স নেই। সেই রুটি আর ভ্যাদভ্যাদে পেঁপের তরকারি দিয়েই ব্রেকফাস্ট সারতে হবে।
ডাইনিং টেবিলে বসে কাগজ পড়তে পড়তে তাই নিজের অদৃষ্টকে দোষারোপ করছিলেন তিনি, এই সময়ে রূপম এল। বিস্মিত হলেন তিনি, কারণ রূপম সাধারণত বাড়িতে থাকলে এগারোটার আগে ওঠে না। কাগজ পড়তে পড়তেই চশমার ফাঁক দিয়ে ছেলেকে দেখলেন বিভাসবাবু। কেমন শান্ত হয়ে বসে আছে টেবিলে। ছেলের অবস্থা ভেবে তিনিও একটু মুষড়ে পড়লেন। বেচারা! এই বয়সেই এত কিছু চাপ নিয়ে চলতে হচ্ছে। খারাপ লাগছিল। ভয়টা পেরিয়ে আস্তে আস্তে খারাপ লাগাটাই জাঁকিয়ে বসল। গলা খাঁকরানি দিলেন একটা, “কী রে, এত সকালে উঠলি আজ?”
রূপম তার হাতের কাগজটার খেলার পাতা দেখছিল, বাবার প্রশ্ন শুনে বলল, “ঘুম ভেঙে গেল। আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করছিল না। আচ্ছা বাবা, তুমি তো একবার গুরগাঁও ঘুরে যেতে পারো! তোমার ইচ্ছা করে না আমার ওখানে গিয়ে থাকতে?”
ছেলের কথা শুনে ভেতরে ভেতরে “পাগল নাকি” বললেও বাইরে সে মুখের ভাব প্রকাশ করলেন না। বললেন, “না রে, এখন আর কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না। তোর বোন দুটোর বিয়ে হোক, তখন নাহয় মাঝে মাঝে…”
মিলি এসে বসল টেবিলে। বলল, “বাবা! আমাদের বিয়ে ছাড়া কি তোমার আর-কোনও চিন্তা নেই?”
বিভাসবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েকে তিনি কী করে বোঝাবেন… এই চিন্তাটা কীভাবে দিনরাত তাঁর মাথাটাকে ঘিরে পাক খেয়ে যাচ্ছে!
৪ মিলি
স্যার একটা কঠিন মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। দোষের মধ্যে স্যার আকবরের শাসনকাল নিয়ে বকবক করে যাচ্ছিলেন আর আমি মধুমিতাকে ফিসফিস করে দিদির মোবাইলে দেখা মেসেজটার কথা বলছিলাম। মধুমিতাদের বাড়িতে স্যার পড়াতে আসেন। প্রথম প্রথম “স্যার তুমি” করে বলতাম। একদিন দিদি শুনে সে কী হাসি। বলে, ‘পাগলী স্যারকে তুমি করে বলে নাকি? স্যার তো আপনি।” তারপর থেকে আমার আপনি বলা শুরু হয়েছে।
বাড়িতে দাদা বউদি এসেছে কোথায় আজকে ছুটি পাব তা না, মা জোর করে পড়তে পাঠিয়ে দিয়েছে। স্যারের পেছনে গুচ্ছখানেক টাকা যখন যায় তখন স্যারের কাছে একদিনও মিস করা যাবে না! মাথা বেশ গরম ছিল। কিন্তু মধুমিতাদের বাড়িতে আসার পরই প্ল্যানটা চেঞ্জ করলাম। দিদিকে ট্র্যাক করতে হবে। এদিকে ক্লাসমেট আর ওদিকে লাইন চলিতেছে! তাও কিনা আমার ক্রাশের সাথে। সবকিছু জানতে হবে আমায়। সত্যিই কি কিছু আছে কি না! আর এইজন্য মধুমিতাকেই লেডি ফেলুদা নিযুক্ত করতে হবে। সত্যি বলতে কী ছেলে গোয়েন্দারা যতই বড়ো বড়ো সমস্যা সমাধান করে ফেলুক, কারও হাঁড়ির খবর বের করতে মেয়ে গোয়েন্দাদের জুড়ি নেই। একবার যদি এরা মনে করে কোনও তথ্য দরকার, আস্তে আস্তে সব পেট থেকে ঠিক সব কথা টেনে বের করে নেবে। মধুমিতা কিছুদিন অয়নদাকে নজরে রাখুক। দেখুক কোথাকার জল কোথায় গড়াচ্ছে।
