সকাল আটটা। এখনই রোদ্দুর বাবাজি রোদ্দুর রায়ের মতোই মেজাজ খারাপ করতে শুরু করে দিয়েছেন। দিদির মোবাইলে মনে হয় একটা মেসেজ এল।
অনেক কন্ট্রোল করেও শেষ অবধি পারলাম না। কালকেই প্যাটার্ন লকটা দেখেছিলাম। দিদি রান্নাঘরেই চাপ নিয়ে রান্না করে যাচ্ছে। তবু আর-একবার সেদিকটা দেখে দুরুদুরু বুকে ফোনটা আনলক করলাম।
অয়নদা! লিখেছে, “বিকেলে আসছি। থাকবি তো?”
অয়নদা! দিদি! সত্যি?
২
রূপম জানে শ্রাবন্তী তাদের বাড়ি আসতে পছন্দ করে না। মফস্সল ওর পছন্দ না। কিন্তু সে সবকিছু জেনেও চুপচাপ চলে আসে। এটা নিয়ে ওদের মধ্যে একটা ঠান্ডা লড়াই চলে। শ্রাবন্তীর আবার উপর উপর দেখনদারিটা ভালোই আছে। সে ভালো করেই জানে রূপম তাকে ছাড়া বাড়ি গেলে সেটা মোটেও তার পক্ষে ভালো বিজ্ঞাপন হবে না। সুতরাং এদিক-ওদিক অনেক অজুহাত দেখিয়ে শেষমেষ তাকে যেতেই হয় রূপমের সাথে।
শ্রাবন্তী তাকে একটা লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছে। এই জিনিসগুলি তার চাই। তার জন্য বাড়ি আসার অভিনয়টুকু ও অনায়াসে করে দিতে পারে। লিস্টের মধ্যে যেগুলো আছে –
১) একটা টু বিএইচকে ফ্ল্যাট। রাজারহাটে হলে ভালো। নইলে কলকাতার অন্য কোনও ক্রিম লোকেশনে।
২) একটা সেডান গাড়ি।
৩) বছরে অন্তত একবার একটা বড়ো বিদেশ ট্যুর।
রূপম লিস্টটা মোবাইলের নোটে সেভ করে রেখেছে। মাঝে মাঝে বের করে দেখে। শ্রাবন্তীর এই লিস্টের বাইরেও তার নিজের একটা লিস্ট আছে আলাদা নোটে। সেগুলি হল –
১) বাবার পেনশনে ঘর খুব একটা ভালোভাবে চলে না। তার জন্য বাড়িতে একটা ভালো অ্যামাউন্টের টাকা পাঠাতে হবে।
২) বাবা তাকে বলে রেখেছে তাকে পড়াতে পিএফের একটা বড়ো অংশ চলে গেছিল। দুটো বোনের বিয়ের জন্য টাকা যেন সে রেখে দেয়।
আজকেও রূপম ঘুম থেকে উঠে দুটো লিস্ট দেখল। আর-একবার মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিজের অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স দেখল। তারপরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে “দূর বাল” বলে পাশ ফিরে শুল। চাপ সে কোনওকালেই নিতে পছন্দ করে না, কিন্তু শ্রাবন্তী মাঝে মাঝে ভালো চাপেই ফেলে দেয়। গেল মাসে পাশের ফ্ল্যাটের আগরওয়ালের বাচ্চাটার জন্মদিন গেল। সে অত চিন্তা করেনি। অফিস থেকে ফিরে শ্রাবন্তীকে নিয়ে চলে গেছিল শপার’স স্টপে। শ্রাবন্তীকেই কিনতে বলে দিয়েছিল যা কেনার। শ্রাবন্তী জিনিস পছন্দ করে হাসি হাসি মুখে তাকে বলল, “ক্রেডিট কার্ডটা দাও।” সে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে মোবাইলে ক্ল্যাশ অফ ক্ল্যানস খেলায় মনোযোগ দিতে না দিতে বিস্ফারিত চোখে লক্ষ করল তার বউ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার গিফট কিনে ফেলেছে। সে ওখান থেকে বেরিয়ে শ্রাবন্তীকে এর কারণ জিজ্ঞেস করতেই শ্রাবন্তী তার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলেছিল, “এটা কি তোমার ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুর পেয়েছ? সোসাইটিতে আমার একটা প্রেস্টিজ আছে। তা ছাড়া অত্ত কিউট একটা বাচ্চা।”
রূপম বরাবরের মতোই দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর কিছু বলল না। শ্রাবন্তীকে তার বেশি কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। আসলে কাউকেই তার বেশি কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। ছোটোবেলা থেকেই সে ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট। বিয়ের পরে আরও বেশি করে খোলসে ঢুকে গেছে। মাঝে মাঝে চুপিচুপি বাবার অ্যাকাউন্টে এনইএফটি করে বাড়িতে ফোন করে দেয়। এবার যেমন পইপই করে সবাইকে বলা আছে মাসে পাঠানো টাকার অ্যামাউন্টটা যেন শ্রাবন্তীর সামনে একেবারেই আলোচনা না হয়। ফিল গুড, ফিল গুড, আচ্ছে দিন, আচ্ছে দিন পরিবেশে যেন ভালোয় ভালোয় তারা গুরগাঁও ফিরে যেতে পারে।
বাড়িতে আজ লুচি হচ্ছে। তার ফেবারিট। মা আর রূপসী সেইজন্যই জান লড়িয়ে দিয়েছে সে ভালো করেই জানে। শ্রাবন্তী সকাল থেকে বাথরুম আলো করে বসে আছে। বাবা শেষমেষ পাশের বাড়ি দৌড়েছে আর চাপতে না পেরে। সাড়ে আটটায় ঘুম ভেঙে গেলেও রূপম বাড়িতে থাকলে সাধারণত বিছানা ছেড়ে ওঠে না। আজ উঠল। নিজের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে চোখ পড়তেই রূপসী তাকে দেখে ডাক দিল, “এই দাদা, বউদি কি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করতে বাথরুমে ঢুকেছে নাকি রে?”
হেসে ফেলল রূপম। রূপসী শ্রাবন্তীর ভালোই লেগ পুলিং করে। তবু সে অবাক হয়ে দেখেছে তাদের বাড়ির মধ্যে একমাত্র রূপসীকেই শ্রাবন্তী কিছুটা পছন্দ করে। এর কারণটা সে এখনও আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি। আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতেই আবিষ্কার করতে পারবে।
৩
ছেলেকে আজকাল একটু ভয়ই পান বিভাসবাবু। ছোটো থাকতে কতবার পিটিয়েছেন, কান ধরে বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, বাথরুমে সিগারেটের গন্ধ পেয়ে আগাপাশতলা জুতিয়েছেন, নরেন মাস্টারের মেয়ের সাথে প্রেম করতে গেছিল বলে তিনবেলা খেতে দেননি, এসব আজকাল ভাবলেও ভয় লাগে তার।
রিটায়ারমেন্টের আগে বুকে বল ছিল, দেহে শক্তি ছিল, আগে পিছে ভেবে কাজ করতেন না, যেটা ইচ্ছা সেটা কিনে ফেলতেন… হঠাৎ করে রিটায়ারমেন্টের পরে নিজেই বুঝতে পারলেন এই বেশি বয়সে বিয়ে করা একটা ঐতিহাসিক ভুল হয়ে গেছে। বিয়ে করেছিলেন তাও ঠিক আছে, তিনটি ইস্যু ব্যাপারটা একটা কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে। স্ত্রী অনামিকার সাথে তাঁর দশ বছরের পার্থক্য। বিয়ে করার আগে মেয়েমহলে ভালোই জনপ্রিয় ছিলেন এককালে। ভেবেছিলেন এভাবেই কেটে যাবে। শেষ পর্যন্ত বাবা রেগেমেগে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেন।
