বউ ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “পরের বউয়ের জন্য খারাপ লাগে আর নিজের বউকে তো কোনও দিন বলতেও আসনি যা করছি ঠিক করছি না? সব সময় শুধু মেজাজ নিয়ে গেছ।”
আমি বললাম, “বলেছি৷ আমার বলার ভাষাটা উগ্র ছিল হয়তো। বোঝাটাও হয়তো ঠিক বুঝিনি। মানুষ যখন ভালোবাসায় থাকে তখন ঠিক ভুলের হিসাব বুঝতে পারে না। তুমিও বুঝতে পারোনি। তুমি নিরুপায় ছিলে।”
বউ আমার নাক টিপে বলল, “কত বোঝো তুমি। কত্ত জানো!”
আমি হাসলাম, “তবুও রাতে ঘুম হয়। অবশ্য তোমার মতো না। যা নাক ডাকো, বাপ রে!”
বউ রেগে বলল, “নিজেও নাক ডাকো। একা আমার দোষ দেবে না একদম৷ পচা লোক একটা। তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক, তোমার কাছে থাকলে আমায় ঘুমের ওষুধ খেতে হয় না। তোমার মধ্যে জাদু আছে।”
আমি বললাম, “বেশ তো, তাহলে যে যে মেয়ের রাতে ঘুম হয় না তারা আমার কাছে এসে থাকলেই পারে।”
বউ বলল, “সব পুরুষের ভিতরই অনিরুদ্ধ আছে বুঝলে? তুমিও ওর মতোই।”
আমি বললাম, “তাই বুঝি? খুব মিস করো, না?”
বউ বলল, “করি। খুউউউউব মিস করি। গাধা কোথাকার। এই, শোনো, বর হয়েছ, বরের কাজ করো। আমায় কফি খাওয়াও।”
আমি বললাম, “খাওয়াব তো। আর কী খাবে?”
বউ দুষ্টু হেসে বলল, “অনেএএএক আদর। আর সেই পাগলামি ট্যুরটা আবার শুরু করব। গাড়ি করে বেরোব। যে-কোনো অজানা গ্রামে সন্ধেটা থাকব। ঝিঁঝির ডাক শুনে রাত কাটাব। হেব্বি মজা হবে বলো?”
আমি বউকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “হেব্বি মজা হবে।”
দুজনে হেঁটে ম্যালে এলাম। একজোড়া বয়স্ক দম্পতি আইসক্রিম খাচ্ছেন।
বউ মুগ্ধ চোখে সে দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা এরকম বয়সে এতটা ভালোবাসায় থাকব তো?”
আমি ওর গালে টোকা মেরে বললাম, “থাকব।”
বউ বলল, “অনিন্দিতার জন্য মাঝে মাঝে কষ্টও হচ্ছে জানো। আমি ওর সঙ্গে ঠিক করিনি বলো?”
আমি বললাম, “আমরা যখন কোনও ঘোরে থাকি, তখন কেউ কারও সঙ্গে ঠিক করি না। যখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারি, তখন বড্ড দেরি হয়ে যায়। তোমার দেরি হয়নি। তুমি ওকে দেখো। খেয়াল রেখো।”
বউ বলল, “ও আমাকে সহ্য করতে পারে না। দেখলে রেগে যায়। তুমিই খোঁজ নিয়ো বরং। আমি তোমাকে সন্দেহ করি না। ভেবো না। ইউ আর এ গুড ম্যান।”
আমি বউয়ের হাতটা শক্ত করে ধরলাম।
আমার বউ।
জাপটে ধরে রেখে সারাজীবন কাছে রাখার মানুষ…
৮৩ আত্রেয়ী
অমৃতর বাইকে করে শহর ঘুরতে বেরিয়েছি। জাপটে ধরে আছি আমার বরটাকে।
পাগল একটা মানুষ।
অফিস থেকে ফেরার সময় একগাদা চকোলেট নিয়ে আসবে।
বউদির সামনে পড়লে সব চকোলেট বউদির হাতে দিয়ে বলবে, “তোমাদের জন্য এনেছিলাম।”
বউদি তখন ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বলে, “হ্যাঁ গো ঠাকুরপো, আগে তো আমার জন্য একটা বাতাসাও আনতে না, এখন কবে থেকে এত খেয়াল করা শুরু করলে আমার?”
আমার লজ্জায় পালাই পালাই অবস্থা হয়।
আরও পালাই পালাই লাগে যখন আমি স্কুল থেকে বেরোই আদৃতাদের সঙ্গে আর তিনি বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। আদৃতা অবশ্য আমায় কানে কানে বলেছে “ওরে আতু, যা আনন্দ করার করে নে, কদিন পরে এই বর আর আসবে না। এই হয়। প্রথম প্রথম হেব্বি আঠা।”
আমি মুখে বলি, “ঠিক বলেছিস।”
মনে মনে হাসি।
যদি তা হয়ও, তাতেও কিছু যায় আসে কি? এই পাগলটাকে সারাজীবন জড়িয়ে ধরে বসে থাকব, তাহলেই আমি খুশি। এরকম পাগল কি খুব সহজে পাবে কেউ? কোনও কোনও দিন ঘুম থেকে উঠে বলে, “চলো কোনও নাম না জানা স্টেশনে নেমে ঘুরে আসি।”
বাড়ির কাউকে না বলে চলে গেলাম। যে এলাকায় নামি, লোকজন কেমন সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকায়। বাড়ি ফিরলে শ্বশুরমশাই আমার দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে তাকিয়ে বলেন, “তুইও অমুর পাল্লায় পড়ে পাগলি হয়ে গেলি মা?”
তুমি থেকে তুই হয়ে গেছি কখন যেন এ বাড়িতে। কখনও মনে হয় না অন্য কারও বাড়িতে আছি। আমার বাবাও মাঝে মাঝে চলে আসে। অমৃতর বাবার সঙ্গে মিলে আমার লেগপুল করে। আমি খুব রাগ করি।
বউদি তখন আমার পক্ষ নিয়ে লড়াই করে।
দাদা মাঝেমধ্যেই অফিস থেকে ফেরার পথে কখনও বিরিয়ানি, কখনও পরোটা মাংস নিয়ে আসে। বাবা প্রথমে রাগ দেখায়। বাইরের খাবার খাবে না বলে। খাওয়ার সময় গম্ভীর হয়ে বলে, “ঠিক আছে, একটু টেস্ট করে তো দেখাই যায়, দেখি মা আমাকে একটু দে তো।”
আমিও মাথা নিচু করে ফিক ফিক করে হাসতে থাকি।
আমার মনে হয় আমি যেন কোনও রূপকথার মধ্যে আছি, যেন কোনও স্বপ্ন দেখছি।
অনিন্দিতাদি স্কুলে আসে। অনিরুদ্ধদা মারা যাবার পর অনিন্দিতাদি মানসিকভাবে মারাত্মক ভেঙে পড়েছিল। কাউন্সেলিং চলছে। মাঝে মাঝে একটা মেয়েকে নিয়ে আসে। মেয়েটার নাম কপালকুণ্ডলা। পাগলি একটা। কী সব পাগলামি করে চলে! কে বলবে কত বড়ো একটা কাণ্ড ঘটে গিয়েছে ওর সঙ্গে। আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি ওকে আবার পড়াশুনা করাব। অনিন্দিতাদির সঙ্গে থাকে মেয়েটা। মায়াবী একটা মেয়ে। আমাকে দেখলেই বলবে, “এই দিদি, তুমি এরকম করে চুল কেটেছ কেন? তোমার না কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই। আচ্ছা তুমি আমাকে অঙ্ক করাবে? আমার না অঙ্কে হেবি ভয়। করাবে? বলো না?”
আমি ক্লাসের ফাঁকে ওকে অঙ্ক দেখাই। ওর চোখে শেখার আগ্রহ দেখে আমার নিজেরও ভালো লাগে। মেয়েদের তো এভাবেই ঘুরে দাঁড়ানো উচিত। আমরা একা কে বলেছে? আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য যথেষ্ট।
