দুঃখী মেয়েরা ভালো বন্ধু হতে পারে হয়তো। দুজনেই অনেকক্ষণ কথা বলি রোজ।
আমার কথা শুনে অনিন্দিতাদি খুব খুশি হল। সত্যিকারের খুশি। আমার বাবার মতো খুশি না। সদুজ্যাঠার মতো খুশি।
বলল, “তুমি পড়াশুনা কমপ্লিট করবে না এবার?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। কলকাতার কলেজে ব্যবস্থা করছে সদুজ্যাঠা। বাবার ইচ্ছা ছিল দূরে কোথাও আমার বিয়ে দিয়ে দেবে। সদুজ্যাঠা খুব চ্যাঁচামেচি করেছে। এত দিন সদুজ্যাঠা কিচ্ছু বলত না। বাবা যা বলত সব মেনে নিত। এবারে মানেনি।”
অনিন্দিতাদি বলল, “তুমি আমার বাড়ি থেকো। যদি বিনা পয়সায় থাকতে অসুবিধা হয়, তবে নাহয় পেয়িং গেস্ট হয়ে থেকো। ভালো লাগবে আমার। আমারও একজন বন্ধু দরকার।”
আমি বললাম, “তোমার সব ভুলে এগিয়ে যাওয়া দরকার। কী জানো তো, আমি গ্রামের মেয়ে, তবু আমার মনে হয় তুমি এবার তোমার অতীতটা ভুলে যাও।”
অনিন্দিতাদি মাথা নিচু করল। চোখ থেকে দু-এক ফোঁটা জল পড়ল। সেটা মুছল না ও।
বলল, “আমার বাবার কথায় রাজি হয়েছিলাম। গত সপ্তাহে এক ছেলে দেখতে এসেছিল।”
আমি বললাম, “তারপর?”
অনিন্দিতাদি বলল, “আমি ছেলেটাকে সব বলে দিলাম। অনিরুদ্ধকে আমি কতটা ভালোবাসতাম, কীভাবে ও আমাকে দিনের পর দিন ঠকিয়ে গেছে। ওরা আর যোগাযোগ করেনি। এরকম কোনও ছেলে নেই যে সব শুনে আমাকে বিয়ে করতে চাইবে। একলা থাকাটা অনেক বেটার অপশন। মুভ অন মানে তো একলা থাকাও হয়। একটা ছেলে সারাজীবন একলা থাকার অপশন নিতে পারলে আমি কেন পারব না? আমার মনে হয় না সারাজীবন আমি আর কারও সঙ্গে কোনও ভাবে থাকতে পারব। যত কাউন্সেলিং করি, যত ওষুধ খাই অ্যান্টিডিপ্রেসিভ, আমি ওকে ভুলতে পারব না। একটা রোবট হয়ে সারাজীবন কোনও ছেলের সঙ্গে থেকে একইসাথে তার এবং আমার, দুজনের জীবন আমি নষ্ট করতে পারব না।”
আমি বললাম, “আমি ভেবেছিলাম একলা থাকার সিদ্ধান্তটা আমার একারই৷ যাকে সারাদিন একটু দেখার জন্য পাগল হয়ে যেতাম, সে যখন…”
অনিন্দিতাদি আমার হাত ধরে বলল, “এসব ভেবো না।”
আমি বললাম, “অ্যাবরশন রুমের অন্ধকারটা খুব ভয়ংকর জানো তো। মনে হয় কেউ দম বন্ধ করে গলা টিপে আমাকে মেরে ফেলে দিচ্ছে। একসময় আমি খুব ভূতের ভয় পেতাম। এখন আর পাই না।”
অনিন্দিতাদি বলল, “ভয়গুলো এভাবেই কাটে হয়তো আমাদের। সামনে যে মানুষগুলো আমাদের দ্যাখে, যারা আমাদের সঙ্গে সবসময় কথা বলে, তারা কি জানে আমাদের ভিতর দিয়ে কতখানি ঝড় চলে যাচ্ছে? আরো বাজে লাগে আমার মানুষের সহানুভূতিপূর্ণ দৃষ্টি। আমি তো কারও সহানুভূতি চাইনি কোনও দিন। মানুষ কি বোঝে না, এই দৃষ্টিগুলো, বা ‘আহা তোর কী হবে’ টাইপ কথাগুলো আসলে আমাদের আরও বেশি করে মেরে ফ্যালে রোজ রোজ?”
আমি বললাম, “তোমার সত্যি এখনও কোনও প্রেমিক হয়নি অনিন্দিতাদি?”
অনিন্দিতাদি আমার দিকে ক্লান্ত মুখে তাকিয়ে বলল, “একজন আছে। ফেসবুকে আলাপ হয়েছিল অনেক আগে। অনিন্দ্য নাম। বাড়ি অবধি চলে এসেছিল। আমি খুব বাজে ব্যবহার করে তাড়িয়ে দিতে গেলাম। গেল না। আমি কী করব, খারাপ লাগল। বসিয়ে খাওয়ালাম। খেয়েদেয়ে সে চলে গেল। মাঝে মাঝে মেসেজ করে, আমরা কি একসঙ্গে থাকতে পারি না? আমি উত্তর দি, না।”
আমি হেসে ফেললাম, “আহা রে, সত্যি ভালোবাসে তোমাকে।”
অনিন্দিতাদি বলল, “আমি তো আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না। খামোখা তার জীবনটা নষ্ট কেন করতে যাব? তার লেখা পড়েছিলাম, ভালো লেগেছিল, বলেছিলাম। সে এটাকে ভালোবাসা বুঝে নিয়েছিল হয়তো। আমার পক্ষে আর কারও সঙ্গে জড়ানো অসম্ভব।”
অনিন্দিতাদির ডাক এল। ও উঠে বলল, “তুমি আমার কাছেই থেকো কপালকুণ্ডলা। একজন ভালো বন্ধু পেলেও হয়তো বাকি জীবনটা নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।”
আমি ম্লান হেসে বললাম, “থাকব। তুমি যাও, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
অনিন্দিতাদি চলে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, “আর শোনো, বাচ্চাটা আমি নেব ঠিক করেছি। নষ্ট করব না। আমার বর যা করে থাকুক, আমি তো সৎ ছিলাম। আমার সন্তানকে সেটুকু সততা দিয়ে মানুষ করব। ভুল করছি আমি?”
আমি হাসতে হাসতে কেঁদে ফেললাম “একদম না… একদম না”…
৮২ জীমূতবাহন
গাড়ি চলেছে পাকদণ্ডি বেয়ে। আমরা আবার পাহাড়ে এসেছি। বউ অবশ্য আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চোখ বুজে ফেলেছিলাম কখন বুঝতে পারিনি।
মানুষ একবার হানিমুন করে।
আমি দুবার করি৷
দ্বিতীয়বার হানিমুন করি প্রথমবারের ফ্লপ সিনেমাটাকে ভুলে যাওয়ার জন্য।
ঘিঞ্জি দার্জিলিং-এ পৌঁছোলাম আমরা। প্রচণ্ড ঘিঞ্জি অথচ প্রাণশক্তিতে ভরপুর৷
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। একটুও মেঘ নেই। বউ আমায় জড়িয়ে ধরে বলল, “রোমান্টিক লাগছে খুব।”
আমি গলা নামিয়ে বললাম, “ড্রাইভার কী ভাববে?”
বউ বলল, “ভাববে নিজের বউকে আদর করছ।”
আমি ওর কপালে চুমু খেয়ে বললাম, “বাকিটা হোটেলের জন্য থাক?”
বউ বলল, “আমার এইচ আই ভি ধরা পড়লে কী করতে তুমি? ফেলে দিতে রাস্তায়?”
আমি মাথা নাড়লাম, “না। চিকিৎসা করাতাম৷ আমার মনে হয় অনিরুদ্ধরও আদৌ কিছু ছিল না। একটা মানুষ ভুল কাজ করতে করতে ভাবতে থাকে সে সবই ঠিক করছে। একটা সময় এমন আসে যখন হঠাৎ করে সমস্ত পাপ এসে ঢেউয়ের মতো তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। অনিরুদ্ধর তাই হয়েছিল। ও তুমুল আতঙ্কে কাজটা করে ফেলেছে। খারাপ লাগে অনিন্দিতার জন্য।”
