আলো কম ঘরটার। ভাত খেলে আমার ঘুম পায়। জল খেতে ইচ্ছা হল। খাটের পাশে একটা ছোটো টেবিলে জলের জগ রাখা। জগটা নিয়ে জল গ্লাসে ঢালতে গিয়ে দেখি জগের তলায় একটা খাম।
কৌতূহল হল।
খামটা থেকে কাগজ বের করলাম। একটা মেডিক্যাল রিপোর্ট।
রুবি এইচ আই ভি পজিটিভ!
৮০ জীমূতবাহন
ঋতুজা মার কাছে গিয়ে রান্না শিখছে। ব্যাপারটা প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না আমার। রান্নাঘরে যেতে ব্যাপারটা দেখে অবাক হয়ে গেলাম।
টিভির ঘরে এসে চুপ করে বসলাম। বাবা টিভি দেখতে দেখতেই আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা তোর লাইফ না মহারাষ্ট্র বিধানসভা? কী হচ্ছে একটু বুঝিয়ে বলবি?”
আমি মাথা চুলকিয়ে বললাম, “আমি বুঝলে তোমাকে বুঝিয়ে বলব। আমি নিজেও তো বুঝে উঠতে পারলাম না ঠিক করে।”
বাবা হেসে ফেলল। বলল, “বিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস জানিস তো। তুই চাইলে এর সব কিছু অস্বীকার করতে পারিস। কেউ কেউ পারেও। আবার কারও কাছে এ এমন এক বন্ধন, চাইলেও সারাজীবনেও এর থেকে বেরোতে পারে না। কিছু কিছু সম্পর্ক আছে দূর থেকে দেখতে খুব ভালো লাগে, ভেতরে গেলে দেখা যাবে পুরোটাই ফাঁপা। লোক দেখানো জিনিসে ভর্তি। আবার কোনও কোনও সম্পর্ক আছে, সারাদিন ঝগড়া হচ্ছে, এই বুঝি সুতোটা ছিঁড়ে যাবে যে-কোনো মুহূর্তে, শেষমেশ আর ছেঁড়ে না। দেখা যায় সেই সম্পর্কের সুতোর জোরই আসলে সবথেকে বেশি ছিল!”
আমি বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, “তুমি কি বলতে চাইছ আমার সম্পর্কটা এরকম?”
বাবা বলল, “আমি কিছুই বলতে চাইছি না৷ তবে তোর বাবা তো। যদি এরকম হয়, তাহলে সবথেকে খুশি আমিই হব। আর কোন বাবা চায় তার ছেলে বউ বিরহে হাওড়া ব্রিজের রাস্তায় কেঁদেকেটে একশা হবে? ওরকম করে তাকিয়ে লাভ নেই, সেদিন তোকে পঙ্কজ দেখেছিল বাসে যেতে যেতে। আমাকে ফোন করে বলেছিল তোকে ডাকবে নাকি। আমি বারণ করেছিলাম।”
আমি লজ্জা পেলাম। উঠে বললাম, “ঘুরে আসি।”
বাবা বলল, “বউমার বাড়ির লোককে ডাকিস একদিন। ভালো করে পরিচয় করা যাক। মনে হচ্ছে এ যাত্রায় তোর বিয়েটা টিকেই যাবে।”
আমি আর দাঁড়ালাম না। বাড়ির বাইরে চলে এলাম। বাবা বড়ো সোজাসুজি কথা বলে। পঙ্কজকাকা আমাকে হাওড়া ব্রিজে কাঁদতে দেখেছে বলে বিচ্ছিরি লাগছিল। নিজের ওপরে রাগও হচ্ছিল। কী দরকার ছিল ওভাবে রিয়্যাক্ট করার? একইসঙ্গে ইচ্ছা হচ্ছিল ঋতুজা… থুড়ি বউকে জড়িয়ে ধরতে।
অনিরুদ্ধর কথা মনে পড়তে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ঋতুজার সামনে ও এলে কী করবে? তখন কি আর আমাকে ভালোবাসবে?
পাড়ার পার্কে গিয়ে বসলাম।
ফোন বাজছিল। নামটা দেখে চমকালাম।
অনিরুদ্ধ।
ধরলাম না প্রথমে।
ফোনটা কেটে দিলাম।
কিন্তু ওপাশ নাছোড়বান্দা।
এবারে ধরলাম। “হ্যালো।”
“আমি আপনার কাছে একটা রিকোয়েস্ট করতে ফোন করেছি।”
গলাটা ভেঙে পড়া। এ আবার কী? নতুন কোনও ড্রামা?
শক্ত গলায় বললাম, “কী?”
ওপাশে গলাটা একটু থেমে গিয়ে বলল, “ঋতুজাকে বলে দেবেন, আই অ্যাম সরি।”
আমি বুঝলাম না৷ বললাম, “মানে?”
“আমি অনেকের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছি। যা ইচ্ছে তাই করেছি। এমনকি আপনাকে মারতেও আমি লোক ঠিক করেছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি, বেলাইনে চলতে গিয়ে কখন নিজেই রাস্তা থেকে ছিটকে গেছি। আমি সারাজীবনে নিজেকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসিনি। আপনি ঋতুজাকে ভালো রাখুন। আর পারলে অনিন্দিতাকেও দেখবেন। কারণ… থাক। চলি।”
ফোনটা কেটে গেল।
অবাক হয়ে ফোনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
বাড়ি ফিরলাম রাত নটা নাগাদ। ঋতুজাই খাবার বাড়ল। বাবা শুধু ফিক ফিক করে হাসতে লাগল খাবার সময়টা। আমার রাগ হচ্ছিল, কিন্তু কিছু বলতে পারলাম না।
রাতে খেয়েদেয়ে ঘরে আসতে ঋতুজা খাটে বসেই বড়ো বড়ো হাই তুলতে তুলতে বলল, “উফ, এই খাটটা আমার ফেবারিট। কী সুন্দর যে ঘুম হয়!”
আমি বললাম, “তোমাকে একটা কথা বলার ছিল। অনিরুদ্ধ ফোন করেছিল।”
ঋতুজা বলল, “আমার ওকে নিয়ে কোনও আগ্রহ নেই। ঘুম নিয়ে আছে। আমি ঘুমাতে পারি?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “সে কী? শুনতে চাইবে না ও কী বলেছে?”
ঋতুজা হেসে বলল, “আমি খুব স্বার্থপর পাবলিক। নিজের ঘুমের থেকে প্রিয় আমার কাছে আর কিছু না। তোমার ওর কথা মনে পড়লে তুমি ভাবতে পারো, আমি বরং ঘুমাই। গুড নাইট।”
আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে সত্যিই ঋতুজা খাটে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। আমি সেদিকে তাকিয়ে মাথা চুলকালাম। এ কী ঘুম রে বাবা! এরকম ঘুমাতে পারলে আমি সত্যিই গর্ববোধ করতাম।
ব্যালকনিতে গিয়ে সিগারেট ধরালাম। তার একটু পরেই ফোনটা এল।
অনিন্দিতা।
অনেকক্ষণ ধরে কান্নাকাটির পর জানাল অনিরুদ্ধ মেট্রোতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সুইসাইডের মিনিটখানেক আগে হোয়াটসঅ্যাপে শুধু অনিন্দিতাকে জানিয়ে গেছে, অনিন্দিতা যেন এইচ আই ভি টেস্ট করে নেয়।
এইচ আই ভি? অনিন্দিতাকে করতে হবে? তাহলে কি ঋতুজাকেও?
৮১ কপালকুণ্ডলা
“ছেলেটার জেল হয়েছে।” আমি বললাম অনিন্দিতাদিকে।
অনিন্দিতাদি ম্যাগাজিন পড়ছিল। আমাদের দুজনের একই দিনে তারিখ পড়ে। আমার এক সমস্যা। অনিন্দিতাদির অন্য।
প্রথম প্রথম আমরা কেউ কারও সাথে কথা বলতাম না। কবে যে বলতে শুরু করলাম, আমার মনে নেই। মেয়েরা নাকি ভালো বন্ধু হতে পারে না।
