ঋতুজা যেদিন কলকাতা আসবে নিশ্চয়ই আমাকে ফোন করবে। আমার সঙ্গে দেখা হলে কী হবে ভাবতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছি। ওর বরের থোঁতা মুখ ভোঁতা হবে। তবে শুধু ঋতুজা কী বলল, তা নয়, ওই শুয়োরটার মুখ না ভাঙা অবধি আমার শান্তি নেই। লোক লাগানো হবে, ঋতুজার থেকেই ডিটেলস নিয়ে নেব। তারপর ঠ্যাং ভাঙব নিজের হাতে।
অনিরুদ্ধ রাউতের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করলে কী হতে পারে তার প্রমাণ পাবে জানোয়ারটা।
মা এল ঘরে ব্রেকফাস্ট নিয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোদের মিটেছে?”
আমি খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে বললাম, “হ্যাঁ।”
মা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী নিয়ে ঝামেলা করলি? বউমা তো কোনও দিন এসবে থাকে না? কী হয়েছিল?”
আমি হাসি দিয়ে কথা ঘোরানোর চেষ্টা করে বললাম, “ও তুমি বুঝবে না।”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোকে নিয়ে আমার ভয় লাগে অনি। বরাবরই তোর দয়া মায়া কম। আর কেউ না জানুক, আমি জানি, রায়দের বাড়ির বাচ্চা বেড়ালটাকে খাবারে বিষ মিশিয়ে তুই মেরেছিলি। তুই এখন এসব পাগলামি করিস না তো বাবা?”
আমি অবাক হয়ে মার দিকে তাকিয়ে বললাম, “হঠাৎ এই কথা বললে কেন বলো তো?”
মা বলল, “মেয়েটা প্রেগন্যান্ট। তোর সন্তান। কোনও পাগলামি করিস না দয়া করে।”
আমি বললাম, “তুমি কী করে জানলে ও প্রেগন্যান্ট? তোমাকে বলেছে?”
মা বলল, “আমাকে বলার জায়গা হলে তো বলবে। আমি শুনেছি। কানে আসে ঠিক। তুই আমাকে বল আগে, তুই ঠিক আছিস তো?”
আমি মার দিকে তাকালাম। মা কেমন একটা অপ্রকৃতিস্থের মতো তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি হাসতে চেষ্টা করলাম, “কবে ছোটোবেলায় কী করেছি তুমি সেসব মনে করিয়ে কী ভাবছ বলো তো? এসব মাথায় আসছে কেন তোমার? আমি ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলছি তো। সব ঠিক হয়ে যাবে, তুমি ভেবো না।”
মা বলল, “তোর বিয়ের আগে বাড়ির ফোনে একটা মেয়ে ফোন করে খুব কাঁদছিল। আমি শুনেছিলাম, সেদিন কিচ্ছু বলিনি। আজ বলছি, মেয়েটার”সঙ্গে এখনও যোগাযোগ আছে তোর?”
আমি সবে খেতে যাচ্ছিলাম। মার কথা শুনে আমার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।
যাদের কখনও হিসেবে ধরি না, তারা মাঝে মাঝে কোত্থেকে হঠাৎ করে সব এলোমেলো করতে চলে আসে? মা ঋতুজার সেই ফোন কলটা শুনেছিল?
গুড গড!
৭৮ জীমূতবাহন
দুপুরবেলা ঋতুজা খুব তৃপ্তি করে খেল। মার কাছে বায়না করে আর-একটা মাছ বেশি নিল।
খাওয়া হয়ে গেলে হাত ধুয়ে বাবার সামনেই আমাকে বলল, “বাবা মনে হয় ফিরে এসেছে। আমি এবার যাই, বুঝলে?”
বাবা খাচ্ছিল৷ ঋতুজার কথা শুনে একবার থমকে আমার দিকে তাকিয়ে আবার খেতে শুরু করল।
আমি বললাম, “আচ্ছা। সাবধানে যেয়ো।”
ঋতুজা বলল, “তুমি একটু দিয়ে আসবে আমাকে?”
আমি বললাম, “বাইকে তেল ফুরিয়ে গেছে।”
বাবা বলল, “আমার স্কুটারটা নিয়ে যা।”
আমি বিরক্ত মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমি স্কুটার চালাতে পারি না। ও ক্যাব ধরে চলে যাক।”
বুকে একটা চিনচিনে ব্যথা হচ্ছিল, একই সঙ্গে ভীষণ রাগও হচ্ছিল। কী দরকার ছিল আশা জাগাবার?
ঋতুজা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “ঠিক আছে৷ আমি রেডি হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি।”
ঋতুজা উপরের ঘরের দিকে রওনা দিতে বাবা আমাকে বলল, “কী হচ্ছে জানতে পারি?”
আমি বললাম, “বাড়ি যাবে। মিউচুয়াল ডিভোর্স করতে হবে বাবা। আমাদের তো রেজিস্ট্রি হয়নি। কী করতে হবে জানো কিছু?”
মা খেতে দিয়ে স্নানে গেছিল বলে বাবাকে সরাসরি প্রশ্নটা করলাম।
মা থাকলে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলত।
বাবা বলল, “বিয়েটা টেকাতে পারলি না?”
আমি মাথা নাড়লাম।
বাবা বলল, “দিয়ে আয় ওকে। একা ছাড়া ঠিক না।”
আমি বললাম, “নাহ। যাক। যাবে যখন ঠিক করেছে, একাই যাক।”
বাবা বলল, “দেখ কী করবি।”
আমি উপরের ঘরে গেলাম।
দরজা বন্ধ ছিল। নক করলাম। ঋতুজা দরজা খুলতে দেখি অন্তর্বাস পরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে বললাম, “আমি পরে আসছি।”
ঋতুজা ঠান্ডা গলায় বলল, “শরীরে লজ্জা পাবার কিছু নেই। এটা খুব স্বাভাবিক একটা জিনিস। চোখ খোলো। যা বলতে এসেছিলে বলো।”
আমি বললাম, “না, তুমি কিছু পরে নাও, তারপর কথা বলব।”
আমার প্রবল শারীরিক অস্বস্তি হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম।
ঋতুজা বলল, “পরেছি। চোখ খোলো।”
চোখ খুলতে দেখলাম কিছু পরেনি। আমি আর কিছু বললাম না। খাটে বসলাম।
বললাম, “এখন নিশ্চয়ই সরাসরি অনিরুদ্ধর কাছে যাবে?”
ঋতুজা কুর্তা পরতে পরতে বলল, “গেলে খুশি হবে?”
আমি বললাম, “খুশি হব নাকি বলিনি তো! জানতে চেয়েছি শুধু।”
ঋতুজা বলল, “আমার উপর খুব রাগ হচ্ছে, না? পাড়ার লোকেদের ডেকে আমাকে ঝাড়তে পারো সবার সামনে। এক্সপোজ করে দিতে পারো একজন বিবাহিত মানুষের সাথে বিয়ের পরেও যোগাযোগ করছিলাম এই অপরাধে। তোমার সে অধিকার আছে। করতে চাইলে করো।”
আমি বললাম, “ডিভোর্সটা যেন হয়ে যায় তাড়াতাড়ি।”
ঋতুজা আয়নার সামনে ঠোঁট দুটো এগিয়ে লিপস্টিক মাখতে মাখতে বলল, “আর?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “আর কী?”
ঋতুজা বলল, “তোমার সময় নষ্টের ক্ষতিপূরণ? চাই না? এক কাজ করো…”
ঋতুজা গলার হার খুলে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে বলল, “এটা বের করে ভালো টাকা পাবে। দু-এক দিন অপেক্ষা কর, আমি আরও ব্যবস্থা করছি।”
আমার মাথায় আগুনটা হাওয়া পাচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম। ওকে বললাম, “হারটা পরো। তোমার টাকায় আমি থুতু ফেলি। তৈরি হয়ে বেরিয়ে যাও। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ো না দয়া করে।”
