আমি শান্ত ভঙ্গিতে বাবার সামনে মেঝেতেই বসে পড়ে বললাম, “বাবা, আমাকে যখন ওদের বাড়িতে সবাই বিয়েটা করার জন্য জোর দিচ্ছিল, তুমি আমাকে বারণ করোনি কেন? তোমার একবারও মনে হয়নি এটা আমার কতটা ক্ষতি করতে পারে?”
বাবা থতোমতো খেয়ে বলল, “আমি কি অত বুঝে কিছু করেছি? আমি ভেবেছিলাম আমার ছেলে একটা ভালো কাজ করছে। কেন? কী হয়েছে?”
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “কিছু না।”
বাবা বলল, “ভাবিস না। যা হয় ভালোর জন্যই হয়।”
আমি জোরে হেসে উঠলাম। বাবা অবাক হয়ে বলল, “পাগল হয়ে গেছিস? তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে? হাসছিস কেন?”
আমি বললাম, “তুমি জানো বাবা, পৃথিবীর সবথেকে বড়ো ঢপ এই কথাটা? যা হয় সব ভালোর জন্য হয়? তাহলে বলতে চাও হিরোশিমা নাগাসাকিও ভালোর জন্য হয়েছিল?”
বাবা বলল, “হুঁ, যদি বলি সেটা হয়েছিল বলেও মানুষ নিউক্লিয়ার বোমার ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছিল?”
আমি বললাম, “সেটাই যদি বলো তাহলে তো পৃথিবীতে একটা বিয়ের পর আর বিয়েই হত না। সবাই বিয়ের ভয়াবহতা বুঝে যেত।”
বাবা আমার দিকে চোখ ছোটো ছোটো করে তাকিয়ে বলল, “ঝগড়া করেছিস? দেখ এসব সব সম্পর্কে হয়। ভাবিস না। এক কাজ কর, বাজার করে আন। ভালো লাগবে।”
আমি বললাম, “কী খাবে?”
বাবা বলল, “যা ইচ্ছা। তুই আর বউমা যা ভালোবাসিস তাই নিয়ে আয়।”
আমি উঠলাম “ঠিক আছে। ঘুরেই আসি।”
বাবা বলল, “যা।”
বাজার ভোরের দিকে বসে যায়। আমি ব্যাগ নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরলাম।
হঠাৎ করে মনে পড়ল ঋতুজার কী পছন্দ হতে পারে? জিজ্ঞেস করা হয়নি তো। পাবদা খাবে? ভালো পাবদা উঠেছে। মা পাবদার ঝাল বানায় বেশ ভালো।
নিয়ে নিলাম।
মাংসও নিলাম। যদি চলে যায় তবে এগুলো কে খাবে? ভাবতে কেমন একটা অস্বস্তি এল। চলে যাবে? আর আমিই বা ওকে দেখে কাল অত খুশি হচ্ছিলাম কেন? আমার মধ্যে এমন একটা মানুষ বসে ছিল এতদিন, অথচ আমি নিজেকে দেখতে পাইনি?
নিজেকে তো আবেগহীন মানুষ হিসেবেই দেখে এসেছি বরাবর। সে মানুষটা এরকম হয়ে গেল কী করে?
প্রতিটা জিনিস নিচ্ছি আর ওর কথা মনে হচ্ছে। একজন অন্য মানুষের ভালোবাসার লোক, আমাকে ভালোবাসে না জেনেও আমি কেন তাকে ভালোবাসতে যাচ্ছি? জড়িয়ে পড়ার থেকে ভয়ংকর কিছু হতে পারে না।
ব্যাগ নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছিলাম, এমন সময় দেখি ফোন বাজছে। ধরলাম, “অনিন্দিতা বলছি।”
আমি বললাম, “বল।”
অনিন্দিতা গলা নামিয়ে বলল, “একবার আমার স্কুলে আসতে পারবি আজ?”
আমি বললাম, “কটায় বল?”
অনিন্দিতা বলল, “আগে আয়। সাড়ে নটার দিকে আমি স্কুল গেটের সামনে চলে যাব। তোকে ঠিকানাটা পাঠাচ্ছি, দেখ।”
আমি বললাম, “ওকে। কোনও সমস্যা হয়েছে?”
অনিন্দিতা বলল, “তুই আয়, তখন বলছি।”
ও ফোন রাখল। আমার উৎকণ্ঠা বাড়ল। আবার কী হল?
বাড়ি পৌঁছেও দেখি ঋতুজা ঘুমাচ্ছে।
ডাকলাম না। মাকে ব্যাগ দিয়ে বাইক স্টার্ট করলাম। অনিন্দিতার স্কুলের যে ঠিকানা পাঠিয়েছে সেটা আমি চিনি। একবার কোনও একটা কাজে ওই অঞ্চলে যেতে হয়েছিল, মনে থেকে গেছে।
বাইকে যেতেও সময় লাগল। পৌঁছে দেখি অনিন্দিতা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে বলল, “এখানেই বলব?”
আমি বললাম, “বল না। কী বলবি বল।”
অনিন্দিতা মাথা নিচু করে বলল, “তুই ওকে ক্ষমা করে দে জিমূত। আমাদের সন্তান আসছে। এটা শোনার পর থেকে অনিরুদ্ধ একেবারে চেঞ্জ হয়ে গেছে। জানিস তো আমি সন্তানটা নষ্ট করতে চলে গেছিলাম। কিন্তু এখন আর করব না। আমি বুঝতে পারছি ও অনেকটাই চেঞ্জ হয়েছে। তুই প্লিজ আর কিছু…”
আমি কয়েক সেকেন্ড অনিন্দিতার মুখের দিকে তাকালাম। কতটা বিশ্বাস থেকে এত কিছুর পরেও মানুষ এই কথাগুলো বলতে পারে। আমার ওর জন্য কষ্ট হচ্ছিল।
বললাম, “দিলাম ক্ষমা করে। ভালো থাক তোরা। আর কিছু বললাম না। আসি রে।”
বাইকটা স্টার্ট দিয়ে এগোলাম। লুকিং গ্লাসে দেখলাম অনিন্দিতা তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
৭৭ অনিরুদ্ধ
অনিন্দিতা স্কুলে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
হোম ফ্রন্ট সামলে নিয়েছি। এটা সবথেকে বেশি দরকার ছিল।
অনিন্দিতাকে লুকিয়ে ঋতুজার সঙ্গে যোগাযোগ করাটা খারাপ দেখালেও আসল কথা হল অনিন্দিতার মতো হোঁৎকা কুশ্রী মেয়ের সাথে কীভাবে আমার বিয়ে হল সেটাই বুঝতে পারি না।
বিয়ে জিনিসটাই আসলে বাজে জিনিস। বন্ধুরা ধরল, মেয়েটা প্রোপোজ করল, ঋতুজা বারণ করল আর আমি মেনে নিলাম। ঐতিহাসিক ভুল। বিয়ে করা মানে একজনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া। এমন স্বীকৃতি দেওয়া যে আমার ক্ষতি করে দিতে পারে। জেলে পাঠাতে পারে। আমার যা ইচ্ছা করাটা আটকাতে পারে।
বিয়ে আমার করা উচিত হয়নি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছিল। এখন আমাকে অনেক সামলে খেলতে হবে।
ঋতুজাকে আমি ছাড়তে পারব না। ও একটা নেশার মতো। আর অনিন্দিতা হল দায়বদ্ধতা। হ্যাঁ, একসঙ্গে শোয়ার সময় আমার এসব মনে হয়নি। তবে আমার কন্ট্রাসেপ্টিভ ঠিকঠাক ইউজ করা উচিত ছিল। ডাক্তার চৌধুরী লোকটা ভালো না। ঠিক জোর করে বাচ্চাটাকে নেওয়াবে।
এ বাচ্চা হয়ে গেলে মহা সমস্যা হয়ে যাবে। আমাকে প্রথমে যেটা করতে হবে তা হল, এই বাচ্চাটাকে অ্যাবর্ট করাতে হবে। হাতে ডাক্তার আছে, চৌধুরীর কাছে না পাঠিয়ে আমার লোকটার কাছে পাঠাতে হবে যাতে ঠিক ভুজুং ভাজুং দিয়ে বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দেওয়া যায়। বাচ্চা জিনিসটাই একগাদা সেন্টিমেন্ট। অনিন্দিতাকে নিয়ে আমি পরে কী করব ঠিক করে উঠতে পারিনি, তবে আমি এ বাচ্চা নেব না, এটাই প্রাথমিক প্ল্যান।
