মা আমার থেকেও বেশি অবাক হয়ে বলল, “তুই জানিস না?”
আমি সিঁড়িতে লাফ দিয়ে উপরে যেতে যেতে বললাম, “তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো৷ সকালে কথা বলছি।”
মা বাবা দুজনেই হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি আমার ঘরের সামনে গিয়ে যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে দরজা নক করলাম। ঋতুজা ঘুমচোখে দরজা খুলে বলল, “কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
আমি অবাক হলাম। এই মেয়ের কি শর্ট টার্ম মেমোরি লস হয়? আমি গম্ভীর গলাতেই বললাম, “তুমি এখানে?”
ঋতুজা বলল, “বাবা বাড়ি তালা দিয়ে আসানসোলে পিসির বাড়ি গেছে, আমি কী করব? আমার কোথাও যাবার জায়গা নেই, এখানের কথাই মনে পড়ল। আজ থেকে কাল চলে যাব। অসুবিধা আছে, না বাইরে শোব কোথাও?”
আমি বললাম, “না, শোও। আর সরি।”
ঋতুজা বলল, “সরির কিছু নেই৷ আমি আমার লাইফটাকে এরকম করেছি, এসব তো আমার প্রাপ্য ছিল। ইটস ওকে।”
আমি ওর দিকে তাকালাম। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাটে গিয়ে শুল যেন কতদিন এ বাড়িতে আছে।
আমার কেমন নিশ্চিন্ত লাগছিল। ভালো লাগছিল এটা জানা সত্ত্বেও যে ও কাল গেলে আর ফিরবে না।
আমি চেঞ্জ করে ওর পাশে শুয়ে পড়লাম।
ঋতুজা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে।
কিছুক্ষণ পরে আমার গায়ে ঠ্যাং তুলে দিল। আমি চুপ করে শুয়ে থাকলাম।
আমিও বোধহয় ওর মতো পাগলই হয়ে গেছি।
৭৫ আত্রেয়ী
একটা দুঃস্বপ্ন দিয়ে শুরু দিন, একটা স্বপ্নের মতো বাস্তব দিয়ে শেষ হলে কার না ভালো লাগে? বাবা যখন এ বাড়িতে এল, আমায় দেখে শুধু ফিক ফিক করে হেসে যাচ্ছে। একগাদা লোকের মাঝখানে আমি না পারছি রাগতে, না পারছি বাবাকে কিছু বলতে। একটা সময় আমাকে একা পেয়ে বাবা বলল, “তোরা এটা কী করলি রে? তবে যা করেছিস বেশ করেছিস। অমৃতর বাবার সঙ্গে আমিও একমত। তোর এরকমই কিছু একটা দরকার ছিল। একজন বন্ধুর দরকার ছিল। ডিপ্রেশন আসবে না দেখিস এর পর থেকে। তোরা দুটো পাগলে ঝগড়া করেই সব ভুলে থাকবি আমি জানি।”
আমার এবার কান্না পেয়ে গেল। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “ওষুধগুলো খাবে ঠিক করে। রাতে কোনওরকম সমস্যা হলে একবারও না ভেবে ফোন করবে। আর আমি নেই বলে মনের সুখে তেল মশলা খাবে না কিন্তু বলে দিলাম।”
বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “আচ্ছা। আমার কথা ভাববি না। দেখা হবে তো। অমৃতরা খুব ভালো মানুষ। তোকে ভালো রাখবে আমি জানি। ঝগড়া-টগড়া সব হবে, সেসব তো একটা সম্পর্কর জন্য ভালোই। তবে সেটা মাত্রাতিরিক্ত না হয়, তুই-ই দেখিস। অমৃত ছেলেমানুষ।”
আমি চোখ পাকিয়ে বললাম, “ছেলেমানুষ? আমার থেকে অন্তত সাত বছরের বড়ো তোমার ছেলেমানুষ।”
বাবা বলল, “তাতে কী? মানুষ কি শুধু বয়সেই বাড়ে? মনেও তো বাড়তে হয়। ও ছেলে বয়সেই বেড়েছে বুঝলি। এখনও ওর মধ্যে একটা কৈশোর আছে। সেটা যেন সারাজীবন থাকে তুই দেখিস।”
আমি ঠোঁট ফুলিয়ে বললাম, “হয়েছে, হয়েছে। থামো এবার। খালি ওর প্রশংসা করে যাচ্ছো। আমি বানের জলে ভেসে এসেছি বুঝি?”
বাবা বলল, “তা নয়। তবে তোর মধ্যে তো তোর মায়ের ছায়া আছে। ওর মতোই তুই সবাইকে আগলে রাখতে জানিস। তাই তোকেই বললাম।”
অমৃত কাছেই ঘুরঘুর করছিল। এই করে যাচ্ছে। বাড়িভর্তি লোক, অথচ শুধু আমার চারপাশে ঘুরছে। লজ্জা লাগছিল, রাগ হচ্ছিল, আবার ভালোও লাগছিল। এতগুলো অনুভূতি যে একসঙ্গে আমার কোনও দিন হতে পারে ভাবতে পারিনি।
পাড়ার বেশ কয়েকজন এলেন। চিনি না তাঁদের। আশীর্বাদ করে গেলেন।
রাত আটটায় অমৃতর দাদা এসে হতভম্ব। বুঝতে কিছুক্ষণ সময় নিলেন। আর বুঝে উঠতেই হইহই করে ফুলশয্যার খাট সাজাতে লেগে পড়লেন পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে। আমার যে কী লজ্জা লাগছিল।
অমৃতর বউদি কানে কানে বললেন, “প্রোটেকশন নিতে বোলো ভাই। এখনই ট্যাঁ নেবে না তো?”
শুনে কান-টান লাল হয়ে একশা। খেতে বসে আর-এক কেলো। নিজের প্লেটের মুরগির ঠ্যাং অমৃত আমার প্লেটে সবার সামনে তুলে দিল। আমার মনে হচ্ছিল ওকে খুন করে দি। আমার বাবা আর শ্বশুরমশাই দুজনেই সে দেখে হো হো করে হাসি।
রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ অমৃতর দাদা আর বউদি আমাদের ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দিলেন।
একটা ঘর। ফুলে ফুলে সাজানো।
আমি আর পাগলটা।
মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, “কত তাড়াতাড়ি সব হয়ে গেল বলো?”
আমি বুঝলাম পাগলটা আবার খেই হারিয়ে ফেলছে। চাইছে আমাকে জড়িয়ে ধরতে অথচ লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে।
এগিয়ে গিয়ে আমি ওকে জড়িয়ে ধরে ওর ঠোঁটে চুমু খেলাম। ও আমাকে জড়িয়ে ধরল।
মিনিটখানেক চুমু খাবার পর বলল, “মাইরি এরকম ফুলশয্যা হয় জানতাম না তো? তুমি দুধের গ্লাস নিয়ে এলে না তো?”
আমি হেসে ফেলে বললাম, “আবার শুরু করলে? অনেক হয়েছে। এবার আদর করো তো!”
অমৃত পরম মমতায় আমার কপালে চুমু খেয়ে বলল, “আমার নদী। আমার সোনা। আমার আত্রেয়ী। ভালোবাসব সারাজীবন সোনা। ভালোবাসব বউ।”
ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করার থেকে সুখীতম মুহূর্ত আর কিছু হয় কি?
৭৬ জীমূতবাহন
আমি ক্লান্ত ছিলাম। ডিস্টার্বডও।
তবু ঘুম ভেঙে গেল সকাল সাতটা নাগাদ।
ঋতুজা সারারাতে ওঠেনি।
আমি আমার গা থেকে ওর পা সরিয়ে সন্তর্পণে নিচের ঘরে নেমে এলাম।
বাবা প্রাণায়াম করছিল। আমাকে দেখে সেসব বন্ধ করে গম্ভীর গলায় বলল, “আমি কি জানতে পারি এ বাড়িতে কী হচ্ছে?”
