সদুজ্যাঠা আমার হাত ধরে জোরে নাড়িয়ে বলল, “বল মা, কী হয়েছে তোর।”
আমি বললাম, “ছেলেটা আমায় নষ্ট করে দিল সদুজ্যাঠা।”
সদুজ্যাঠা অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
আমি কোনও মতে বোঝালাম।
সদুজ্যাঠা আমার কথা শেষ হবার আগেই তীব্র বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমার বমি হয়ে গেল ভয়ে, যন্ত্রণায়। তলপেটে অসহ্য ব্যথা হচ্ছিল। জল নিয়ে নিজের মাথাতেই দিচ্ছিলাম।
কিছুক্ষণ পরেই হইহই শব্দ এল বাইরে থেকে। সদুজ্যাঠা এ ঘরে এসে আমাকে বলল, “ওঠ। আমার সঙ্গে আয়।”
আমি বললাম, “কোথায় যাব?”
সদুজ্যাঠা বলল, “আয়।”
আমাকে ধরল সদুজ্যাঠা। আমার হাত পা কাঁপছিল। আমি আর নিজের মধ্যে ছিলাম না।
দোকানের বাইরের রাস্তায় নিয়ে এল সদুজ্যাঠা। দেখলাম অনির্বাণকে মেরে মেরে চোখ মুখ থেকে রক্ত বের করে দিয়েছে পাড়ার লোক।
আমি সদুজ্যাঠার দিকে অবাক চোখে তাকালাম। সদুজ্যাঠা একটা সিঁদুরের কৌটো অনির্বাণের হাতে দিয়ে বলল, “যা, ওর কপালে পরিয়ে দে।”
অনির্বাণকে যে ভীষণ মারা হয়েছে বোঝা যাচ্ছিল। ও হাতে সিঁদুরের কৌটোটা নিতে পারল না। কৌটোটা পড়ে গেল। বাজারের লোক জমে গেছিল। প্রায় সবাই মারমুখী। সদুজ্যাঠা হাত দিয়ে সবাইকে আটকাল।
পুরো ব্যাপারটা বুঝতে আমার একটু সময় লাগল। যখন মাথায় ঢুকল, বুঝলাম অনির্বাণের সঙ্গে সদুজ্যাঠা আমার বিয়ের ব্যবস্থা করছে।
আমার মাথা ঘুরছিল। সদুজ্যাঠাকে বললাম, “এ তুমি কী করছ? একে আমি বিয়ে কেন করব? জেনে শুনে একজন ধর্ষককে বিয়ে করব কেন?”
সদুজ্যাঠা থমকে দাঁড়াল।
পাড়ার ভিড়টাও।
বাবা কোথাও একটা গেছিল গাড়ি করে। কেউ ফোন করেছিল হয়তো। এসে কোনও দিকে না তাকিয়ে আমাকে চড় মারতে যাচ্ছিল। সদুজ্যাঠা আটকাল। বাবা বলল, “এ ছেলেটাকে ছেড়ে দে। আমার মেয়ের তো বিয়ে দিতে হবে নাকি? ছেড়ে দে, এ বরং পাড়া ছেড়ে পালাক। তোরাও সব ভুলে যা।”
আমার সীতার পাতালপ্রবেশের কথা মনে পড়ে গেল।
মেয়ের বিয়ে দেওয়া এত দায়? এত? আমি এতটাই বোঝা বাবার ওপরে?
সদুজ্যাঠা কিন্তু বাবার কথা শুনল না, অনির্বাণকে কলার ধরে নিয়ে দোকানের ভিতর ঢুকিয়ে বলল, “চেহারা, স্বভাব চরিত্র এমন করে কিছু মানুষ ঘুরে বেড়ায়, এদের দেখে মনে হয় না আসলে একজন অপরাধী পুষে বেড়াচ্ছি আমরা। একে ছাড়লে আর-একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করবে কে দায় নেবে? তুই?”
বাবা রেগে গিয়ে দাপাতে দাপাতে বলল, “আমার মেয়েকে নিয়ে তুই সিদ্ধান্ত নিবি?”
আমি বসে পড়েছিলাম একটা বেঞ্চে। বাবাকে বললাম, “না বাবা, আমাকে নিয়ে আমিই সিদ্ধান্ত নেব। আর কেউ নেবে না। পুলিশে খবর দাও। ও ছেলেকে নিয়ে যাক।”
অনির্বাণ চমকে গিয়ে আমার দিকে তাকাল। বাবা দোকান থেকে বেরিয়ে চলে গেল। ঠিক এই মুহূর্তে আমার বাবার উপর ভীষণ অভিমান হল। মেয়েরা এতটাই পর হয় মানুষের?
৭৪ জীমূতবাহন
আমার জীবনে যে কোনও দিন একটা রাত এরকম আসতে পারে, আমি কোনও দিন ভাবিনি। আমার মতো কারও কোনও ক্ষতি না করা মানুষের জীবনে এরকম একটা দিন কেন আসবে আমি জানি না। হয়তো মানুষের জীবনটাই এরকম। কেউ জানেই না কাল কী আসতে পারে। এভাবে কষ্ট পেয়ে থাকাই যে আমার নিয়তি হতে চলেছে আমি এই সেদিনও জানতাম না।
কষ্ট শুধু নিজের জন্য হচ্ছিল না, ঋতুজার জন্যও হচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল আমার তো ডিভোর্স হয়েই যাবে, অকারণ কেন মেয়েটাকে আমি অতগুলো অচেনা মানুষের সামনে ওসব বলে ফেললাম? এই মেয়েটাই তো কুঁকড়ে শুয়ে থাকে, দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুমের ঘোরে কথা বলে, ঘুম না হলে জেগে বসে থাকে।
অনিরুদ্ধকে যদি ভালোবেসেও থাকে, সেই স্পেসে আমি কেন ঢুকতে গেলাম? আমাকে কোনও দিন ও ভালোবাসবে না, এটাই আমার রাগ ছিল?
বাসটা হাওড়াগামী ছিল। কলকাতা ঘুরে ঘুরে কখন স্টেশনের কাছে নামিয়ে দিয়ে গেল খেয়াল করিনি।
ব্যাগ নিয়ে হাওড়া ব্রিজের উপর দিয়ে বেশ খানিকক্ষণ হাঁটার পরে হঠাৎ ইচ্ছা হল মরে যেতে৷
মনে হল বেঁচে থেকে কী হবে? একটা অকারণ বাজে জীবনকে বয়ে নিয়ে যাওয়াই তো হবে।
মার মুখটা মনে পড়ল। বেশ খানিকক্ষণ গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম।
অনিরুদ্ধকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল। একটা মানুষ ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এরকম হয়, সেটাও জানতে ইচ্ছা করছিল।
লোকটা কি জানে লোকটা অসুস্থ? জানে না বোধহয়। অনিরুদ্ধর উপরেও তেমন আর রাগ হচ্ছিল না৷ লোকের উপর রাগ করে কী হবে? কপাল খারাপ থাকলে এটাই তো হবার।
চোখ ভিজে যাচ্ছিল। চোখ মুছতে মুছতে হেঁটে গেলাম অনেকটা। শেষমেশ বাড়ি ফেরাই ঠিক করলাম। মধ্যবিত্ত একটা বাড়ি।
ক্যাব বুক করলাম।
বাড়ি যখন পৌঁছোলাম, রাত বারোটা বেজেছে। দরজা বন্ধ ছিল। বেল বাজিয়ে সবাইকে জাগালাম। বাবা আমাকে দেখে অবাক হয়ে বলল, “এখন?”
আমি বললাম, “ঘুমিয়ে পড়ো, সকালে বলছি।”
মা উঠে এসেছিল। আমায় দেখে বলল, “তোর চোখ ফোলা কেন রে বাবু? কী হয়েছে?”
আমি মাকে জড়িয়ে ধরলাম অনেকক্ষণ। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “ঘরে যা। বউমার সঙ্গে ঝগড়া করেছিস বুঝি? মেয়েটা কখন এসে উপরের ঘরে গিয়ে শুয়েছে। খেলও না। তুই খেয়েছিস?”
আমি অবাক হয়ে মার দিকে তাকিয়ে বললাম, “মানে? এখানে এসেছে?”
