সব কিছু হয়ে যাবার পর অনির্বাণ আমার পাজামাটা আমার দিকে ছুড়ে প্যান্ট পরতে পরতে বলল, “যা বাড়ি যা। আসিস ইচ্ছা হলে রাত্রে। দরজা খুলে রাখব।”
মিত্র বাড়ি থেকে আমাদের দোকান ছ-সাতশো মিটার হবে। সে রাস্তাটুকু আমার দীর্ঘতম রাস্তা হয়ে রইল সারাজীবনের জন্য।
৭২ অমৃত
এই যে এত ইনসিকিউরিটি, এত সন্দেহ, এত হারিয়ে ফেলার ভয়… এত সব কিছুর পরে যখন সে আমার হয়ে যায়, তখন এক অদ্ভুত ভালোবাসার জন্ম হয়৷ ভালোবাসায় তো হারিয়ে ফেলার ভয় বরাবরই থাকে। যে মেয়েকে আমি ভালোবাসি, সব সময় মনে হয় তাকে নিয়ে থাকি। হোয়াটসঅ্যাপে অনলাইন, অথচ সে মেসেজ না করলে পৃথিবীটাই অন্ধকার হয়ে আসে। মনে হয় সব শেষ হয়ে গেল।
এখন অবশ্য অন্য দৃশ্য। বাড়ির দরজায় বিকেলবেলা হাতে মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাপের প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি দুজন। আত্রেয়ী ভয়ে আছে, তবে প্রাণপণে হেসে সিচুয়েশন হালকা করতে চাইছে।
দরজা বাবা খুলল। আমাদের দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার দিকে একবারও না দেখে আত্রেয়ীকে বলল, “ঘরে যাও মা। তোমার কপালে অশেষ দুঃখ দেখতে পাচ্ছি। এক উৎকৃষ্ট মানের বানরের গলায় মুক্তোর হার হয়ে তুমি থাকবে।”
আমার এ কথা শুনে রেগে যাওয়া উচিত ছিল। আমি রাগলাম না। হেসে ফেললাম। আত্রেয়ীও হেসে ফেলল।
ঘরে ঢুকতেই বউদি হইহই করে এসে আত্রেয়ীকে নিয়ে ওর ঘরে চলে গেল। আমি ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাবা বলল, “বল এবার তোর দাবি কী?”
আমি বললাম, “তুমি ওর বাবার সঙ্গে কথা বলেছ?”
বাবা বলল, “হ্যাঁ, ওর বাবা কাকা জেঠুরা আসছেন সব। এখানেই রেজিস্ট্রার আসবেন সে ব্যবস্থা করেছি।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে।”
বাবা বলল, “দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কিছু বলবি?”
আমি বললাম, “দাদাকে বলেছ?”
বাবা বলল, “না। বড়ো বউমাকেও বলতে বারণ করে দিয়েছি। একা আমি শক খাব কেন? সবাই শকে থাক। বাড়ি এসে তোর কাণ্ড দেখবে। একটু পরে পাড়ায় বেরোব। পাড়াতেও জানাতে হবে তোর কীর্তি।”
আমি বললাম, “পাড়ার লোককে বলবে কেন?”
বাবা বলল, “কারণ তুই তাপস পাল না যে ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে দেবার মতো ঘরে বউ ঢুকিয়ে দিলেই সবাই মেনে নেবে। এখানে সামাজিকতা রক্ষা করতে হয়।”
আমি গোঁজ হয়ে বললাম, “লোকে কী বলবে ভেবে তো আমি কিছু করিনি। লোকের কথা ম্যাটার করে না আমার কাছে।”
বাবা বলল, “কোনও পাপও করিসনি যে কাউকে বলতে হবে না। লোকের কথা ম্যাটার করে না তো। আমার কাছে এসব কোনও কালেই ম্যাটার করেনি৷ তবে পাড়ার সবাই এসে আত্রেয়ীকে দেখে যাক। অঙ্কের শিক্ষিকা, ভালো গায়িকা, এত ভালো একটা মেয়েকে সবাই আশীর্বাদ করুক। তুই এসবে ঢুকবি না। এক কাজ কর, যা ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। আমি সব দেখছি।”
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, “ঘুমিয়ে পড়ব? এখন?”
বাবা বলল, “হ্যাঁ এখন। অন্য সময় হলে তো ঘর বন্ধ করে আত্রেয়ীর সঙ্গে ঝগড়া করতি। এখন আর সে উপায় নেই।”
বাবা হাসতে হাসতে টিভির ঘরে গিয়ে টিভি চালাল।
আমি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দাদার ঘরে উঁকি মেরে দেখি আত্রেয়ীকে নিয়ে বউদি কত গল্প করছে। আমাকে দেখে বউদি বলল, “অমু তুমি কেটে পড়ো এখন। তোমার বউকে রাত্তিরে হ্যান্ডওভার পাবে। এখন আমার সাথে গল্প করুক।”
আমি আত্রেয়ীর দিকে তাকালাম।
আত্রেয়ী আমাকে পাত্তাই দিল না।
বড়ো দুঃখ হল।
হয় হয় এমনই হয়। এভাবেই কাছের মানুষগুলো দূরে চলে যায়।
যত্তসব!
আমি বললাম, “আমি এখন কোথায় যাব?”
বউদি বলল, “বাজার ঘুরে এসো!”
আত্রেয়ী বলল, “বাইক নিয়ে যেন না যায় ও।”
আমি বললাম, “মানে? বাইক নিয়ে যাব না তো কী নিয়ে যাব?”
আত্রেয়ী বলল, “আমি জানি না কী নিয়ে যাবে, কিন্তু বাইক নিয়ে যাবে না।”
বউদি গালে হাত দিয়ে বলল, “কেন কেন? আমি শুনতে পারি কেন যাবে না?”
আত্রেয়ী লজ্জা পেল।
বলল, “পরে বলব।”
এবার আমার ভালো লাগল। হ্যাঁ, এই তো বেশ প্রেম আছে। ভুল ভাবছিলাম আমি।
গম্ভীর গলায় বউদির দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমি ঘরে শুলাম। বাবা ঘুমাতে বলেছে। বাবার কথা তো আর অমান্য করা যায় না।”
বউদি হাসতে হাসতে বলল, “বাবা, কত পিতৃভক্ত হনুমান তুমি!”
আমি পালালাম নিজের ঘরে। এখানে থাকলেই সমস্যা। ঘুমাই এখন। আর ফোনে আত্রেয়ী আর আমার ছবিগুলো দেখি। এই ছবিগুলো অদ্ভুত এক শান্তি এনে দেয়। সব ভুলিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে।
৭৩ কপালকুণ্ডলা
সাইকেলটা মিত্রকাকুদের বাড়ির সামনেই পড়ে ছিল। ব্যস্ত পাড়া, ব্যস্ত বাজার, শুধু এলোমেলো চুলে আমি দোকানের ক্যাশে গিয়ে যখন রোজের মতো বসলাম, আমার মধ্যে যে কত বড়ো পরিবর্তন হয়ে গেছে সেটা কেউ দেখল না একজন ছাড়া। সদুজ্যাঠা।
আমার কাছে এসে আমার হাত ধরে বলল, “এদিকে আয়।”
সদুজ্যাঠা গেল।
আমি সদুজ্যাঠার পেছন পেছন সদুজ্যাঠার ঘরে গিয়ে বসলাম। সদুজ্যাঠা ঘরে ঢুকেই আমাকে বলল, “কী হয়েছে তোর? মা মেরেছে?”
আমি মাথা নাড়লাম।
সদুজ্যাঠা চোখ ছোটো ছোটো করে তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে? কী হল?”
আমি মাথা নিচু করলাম, “কিছু না।”
কথা শেষ করতে পারলাম না, ডুকরে কেঁদে উঠলাম। কাঁদতে কাঁদতেই কখন যে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম, বুঝতে পারিনি।
সদুজ্যাঠা চোখে মুখে জল ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরাল। আমার শ্বাসপ্রশ্বাস জোরে পড়ছিল।
