আত্রেয়ী বলল, “তুমি তো পাগল। সমস্যা হলে লাফ ঝাঁপ দেবে না তো? বাবার মুখে মুখে তর্ক কোরো না কিন্তু, আমার বড়ো খারাপ লাগে সেটা।”
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “ধুস, দাঁড়াও তো।”
ফোন বের করে আমি বাড়িতে ফোন করলাম। বউদি ধরল, “কী হল? মাথা ঠিক হল তোমার? খেলে কিছু?”
বললাম, “বউদি, বাবাকে দাও তো।”
বউদি কৌতূহলী গলায় বলল, “কেন? কী করলে আবার?”
আমি বললাম, “আহ, দাও না৷ প্লিজ!”
বউদি বলল, “আচ্ছা ধরো। বাবা ঘুমাচ্ছেন কিন্তু।”
আমি বললাম, “তাও দাও!”
আত্রেয়ী দেখলাম ভয়ে ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
বউদি বাবাকে জাগিয়ে ফোন দিল৷ বাবা ঘুম ঘুম গলায় বলল, “কী হল?”
আমি শান্ত গলায় বললাম, “বাবা আমি বিয়ে করেছি।”
বাবা ততোধিক শান্ত গলায় বলল, “তো আমি কী করব? নাচব?”
আমি বললাম, “আরে আমি সিরিয়াস!”
বাবা বলল, “ভালো করেছিস। ফেরার সময় আরসালানের বিরিয়ানি নিয়ে আসিস। মিষ্টিও আনবি। নইলে বউ নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে দেব না। তুই যে লেভেলের পাগল তাতে এসব করবি আমি জানতাম। যাই হোক, ঘুমালাম। জ্বালাবি না। আত্রেয়ীকে নিয়ে রাস্তায় না ঘুরে বাড়ি আয়। আমি ওর বাবার সাথে ফোন করে কথা বলে নিচ্ছি ঘুম থেকে উঠে। এখন আবার ফোন করলে ত্যাজ্যপুত্র করে দেব মাথায় রাখিস।”
ফোনটা কেটে গেল।
আত্রেয়ী বলল, “কী হয়েছে?”
আমি বললাম, “আরসালান যেতে হবে আবার।”
আত্রেয়ী বুঝল না, “মানে?”
আমি কিছু বলার আগে দেখি বাড়ি থেকে ফোন। নিশ্চয়ই বউদি। ফোনটা আত্রেয়ীকে দিয়ে বললাম, “কথা বলো। আমার হ্যাজাতে ভালো লাগছে না। যা ইচ্ছে বলো।”
আত্রেয়ী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ফোনটা কানে দিল।
৭১
কপালকুণ্ডলা
নবকুমার নবকুমার
তোমার বাড়ি যাব,
নবকুমার তুমি কি কখনও
আমার কথা ভাবো?
সদুজ্যাঠা বলে, যে মানুষের কোনও দিন আমাদের হওয়া সম্ভব না, আমরা সে মানুষের টানেই সবথেকে বেশি যাই। এটাই আমাদের নিয়তি।
আমি যেমন, যে হাবলু মিত্রের বাড়ি কোনও দিন যাইওনি, নবকুমারকে একবার দেখব বলে সে বাড়ি গিয়ে মিত্র কাকিমার সঙ্গে ভাট বকতে শুরু করি। সে ছেলে ঘরে ঢুকে সেই যে দরজা দেবে, বেরোনোর নাম অবধি করে না।
আমিও বিফল হয়ে ফিরে আসি। শেষতক সাঁপুইবাড়িতে মিনিমাগনার ঝি-গিরি করে সারাজীবন কাটাতে হবে? তাই হবে হয়তো। যে ছেলের আমার উপর বিন্দুমাত্র চাপ নেই, তার পিছনে ঘুরে আর কী করব? হেরে যাওয়াটাই নিয়তি বুঝতে পারছিলাম দিনের শেষে।
সদুজ্যাঠাও এটাই বলে, মেয়েদের মনটাই বুঝি এরকম। যে ছেলে যত বেশি কষ্ট দেবে, মেয়েটা তার কাছেই তত বেশি করে যাবে।
সব মানুষের কত গল্প থাকে, তাদের জীবনযাপন থাকে, কষ্ট থাকে, আনন্দ থাকে। আমার কিচ্ছু নেই। আমার দিনযাপন আছে, আর আছে রোজ একবার করে অনির্বাণের দৃষ্টি আকর্ষণের নিষ্ফল চেষ্টা।
আর এই চেষ্টার নিষ্ফল হওয়াটা যে আমাকে কতটা মরিয়া করে তুলেছিল সেটা বোধহয় আমি নিজেও বুঝতে পারিনি।
কাকিমারা বাড়ি ছিলেন না, বাড়ি ফাঁকা করে কলকাতায় কোথাও একটা গেছিলেন, অনির্বাণ ফিরতেই আমি গোটা বিকেলটা ও বাড়ির সামনের রাস্তায় সাইকেল নিয়ে ঘুরতে শুরু করলাম। বুকের মধ্যে হৃদযন্ত্রটা যে এমন পাগলামি শুরু করে দেবে, আগে বুঝিনি কোনও ভাবেই।
সন্ধে হতে ছেলেটার অমোঘ আকর্ষণে আমি সাইকেল রাস্তায় রেখে মিত্র বাড়িতে ঢুকে অনির্বাণের দরজার বাইরে কান পেতে দাঁড়িয়ে শোনার চেষ্টা করতে লাগলাম কী করছে।
হাঁটাচলার শব্দ না পেয়ে ভাবলাম ঘুমাচ্ছে, জানলা এমনভাবে বন্ধ করা কিছুতেই বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল না, দরজায় কান দেওয়া ছাড়া কিছু করার ছিল না।
বুকের ঢিপঢিপ শব্দ নিজেই বুঝতে পারছিলাম, এক মন বলছিল পালা, আর-এক মন কিছুতেই যেতে চাইছিল না, এমন সময় আমাকে হতভম্ব করে দরজাটা খুলে গেল।
আমি দরজায় প্রায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, অনির্বাণ দরজাটা খুলতে ওর গায়ে গিয়ে পড়লাম।
ঘটনাটা স্বপ্নের মতো হতে পারত। হল না।
না, অনির্বাণ আমাকে প্রবল অপমান করে তাড়িয়ে দিতে পারত, বা যেরকম সিচুয়েশনগুলো ভাবতাম, সে স্বপ্নের মতোই ভীষণ রোম্যান্টিকভাবে বলতে পারত, “এখানে?”
তেমন কিচ্ছু হল না।
আমি ওর গায়ে গিয়ে পড়তে ও আমাকে শক্ত করে ধরল। আমার মুখের দিকে তাকাল। আমি চোখ বন্ধ করলাম লজ্জায়। ভাবছিলাম এই বুঝি ছেলেটা ভয় পেয়ে হাউমাউ কান্না জুড়ে দেবে।
আচ্ছা, প্রবল ভালোবাসার মানুষ যদি ধর্ষণ করে, তবে একটা মেয়ে কী করে? যে মানুষটাকে একটা মেয়ে প্রবলভাবে ভালোবেসে এসেছে, স্বপ্ন দেখে এসেছে একসঙ্গে থাকবে বলে, সে মানুষটা যদি প্রবল আক্রোশে বলে, “এই মাগিটার খুব রস, রোজ আমায় ফলো করা, না? আয় তোর সব রস নামিয়ে দি” বলে খাটে ঠেসে ধরে, একপ্রকার নির্বাক হতভম্ব করে ধর্ষণ করে, সে মেয়ের কী করার থাকে?
আমারও কিছু করার ছিল না। আমি তো নিজের মধ্যেই ছিলাম না। আমার গালে চড় মারতে মারতে, আমার স্তন মুখ দিয়ে প্রায় ছিঁড়ে নিতে নিতে অনির্বাণ আমার সমস্ত ভালোবাসা ওইটুকু সময়েই সফলভাবে ভস্ম করে দিতে পারল।
ওর প্রতিটা আঘাতে আমার দু চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল নেমে এল। আমার মনে হচ্ছিল আমি বোধহয় আবার সেই বিচ্ছিরি দুঃস্বপ্নটা দেখছি যেটা দেখে আমি রাতে উঠে বসে থাকতাম। যেটার ভয়ে আমি সন্ধে হলে একসময় বাড়ির বাইরে বেরোতাম না পর্যন্ত।
