আমার মাথা সামান্য ঠান্ডা হয়েছিল। আমি আর কোনওরকম সিন ক্রিয়েট করলাম না।
চুপচাপ সিটে বসে রইলাম।
পাহাড়ি রাস্তায় যেভাবে ঘুমাচ্ছিল পড়ে পড়ে, এই রাস্তায় একবারও ঘুমাল না। চোখ মুখ শক্ত, একটাও কথা না৷ চুপ করে বসে রইল।
প্লেন যখন সন্ধ্যার কলকাতার আকাশ চিরে দমদম বিমানবন্দরে নামল, আমি হাঁফ ছাড়লাম।
নেমে ব্যাগেজ কাউন্টার থেকে ব্যাগ নেওয়ার সময় ও আমার পাশে থাকল। ব্যাগ নিয়ে আমি চুপচাপ বেরোচ্ছিলাম, ও দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, “আমি চলে যেতে পারব।”
আমি কিছু বললাম না। চোখ মুখ কঠিন করে দাঁড়ালাম।
ঋতুজা বলল, “আমার সঙ্গে এই খারাপ ব্যবহারটা করার দরকার ছিল। তুমি ঠিক করেছ। এটা আমার প্রাপ্য ছিল। কিছু জিনিস মানুষ সব বুঝেও না বুঝে অবুঝের মতো বসে থাকে। আমিও তেমনই ছিলাম। অনিরুদ্ধর বউ আছে জেনেও আমি ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে গেছি। হ্যাঁ, হতে পারে অনিরুদ্ধ আমাকে ভালোবাসেনি। ব্যবহার করেছে৷ হতে পারে ও নিজের বউকেও ভালোবাসে না, আমাকেও ভালোবাসে না৷ আমার তাতেও কিছু হয়নি। দোষ কারও না। দোষ আমারই। আমার যোগাযোগ রাখা উচিত হয়নি। হয়তো অনিরুদ্ধ খুব দোষী। হয়তো কিছুই দোষী না। কিন্তু আমি ওকে কোনও দোষ দেব না। আমি না চাইলে তো কোনও যোগাযোগ হত না। আমি ছুঁতে দিতে না চাইলে ও ছুঁতেও পারত না। কিন্তু কী করব বলো, একা থাকার সমস্যা আমার মারাত্মক। ডিপ্রেশন মারাত্মক হয়। এর থেকে চাইলেই বেরোনো যায় না। আর আমি তো বেরোতেও চাইনি কোনও দিন। শিখব হয়তো কিছু এ সমস্ত ভুল সিদ্ধান্ত থেকেই। তোমার ওপরেই এসবের জন্য সবথেকে বেশি প্রভাব পড়ল। আমি এজন্য নিজেকে কোনও দিন ক্ষমা করতে পারব না। তুমিও আমাকে ক্ষমা কোরো না। প্রতারণার কেস করতে পারো। আমি ডিফেন্ড করব না। আমি যাই। সাবধানে ফিরো।”
ঋতুজা কথাগুলো একটানা বলে গেল। যেন গোটা রাস্তা এই কথাগুলোই ও প্র্যাকটিস করে এসেছে।
কথা শেষ করার পরও গেল না। দাঁড়িয়ে রইল।
আমি আমার ব্যাগটা নিয়ে জোর পায়ে বাইরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। পিছনের দিকে আর তাকালাম না।
তাকাতে ইচ্ছা করছিল না। মাথার ভিতর অনেক কিছু এদিক ওদিক করে যাচ্ছিল৷ বেরিয়ে দেখলাম কেউ গাড়ি এনেছে, কেউ ট্যাক্সি নিচ্ছে, কেউ বা ক্যাব, আমি ওই রাস্তা ধরেই হাঁটতে লাগলাম।
মুক্তির আনন্দ হচ্ছিল না। বিচ্ছেদের কষ্ট হচ্ছিল নাকি বুঝতে পারছিলাম না, তবে মনে হচ্ছিল ভেতরটা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। এত কষ্ট আমি অনেকদিন পাইনি। এয়ারপোর্টের বাইরের রাস্তায় আমার ব্যাগটা কাঁধে নিয়েই অনেকটা হেঁটে রাস্তাতে বসে পড়লাম। কিছু বোঝার আগেই একটা কান্না ভেতর থেকে উঠে এল যেন। এমন কান্না বহুদিন আসে নি।
রাস্তাতে বসে পড়ে প্রাণপণে জিভ কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে যেতে লাগলাম। আশপাশ দিয়ে গাড়িগুলো গালাগাল দিতে দিতে যাচ্ছিল। ঠিকই তো, শহরের ব্যস্ত রাস্তা কি মানুষের কাঁদার জন্য?
আমি অনেক কষ্টে উঠে আবার হাঁটতে হাঁটতে ভি আই পি রোডে এলাম। একটা বাস জ্যামে দাঁড়িয়েছিল। দেখলামও না বাসটা কোথায় যাবে, উঠে পড়লাম। সিট ফাঁকা ছিল। বসে মাথা নিচু করলাম।
এ কী সমস্যা শুরু হল এবার? এত সমস্যা, এত কষ্ট হচ্ছে কেন? আমার এসব কেন হচ্ছে?
৭০ অমৃত
আত্রেয়ী আমার। শুধু আমার।
আজ থেকে নাম দুটো পাশাপাশি বসবে।
ভাবতেই ভালো লাগছে। আরও ভালো লাগছে ও যখন আমার হাতটা ধরছে৷ আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলছে৷
এতদিন যখন বাড়ি গেছি, ভেবেছি সময়টাকে কেন আটকে রাখতে পারছি না। কেন আত্রেয়ী সারাক্ষণ আমার সঙ্গে থাকবে না!
আজ থেকে সেই ভাবনাটাই আসবে না ভাবতে নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে সুখী মানুষ মনে হচ্ছিল।
অনেকক্ষণ উদ্দেশ্যহীনের মতো আত্রেয়ীকে নিয়ে শহরটায় ঘুরলাম। এই সেই শহর, যাকে নিয়ে কত কবিতা, কত গল্প লেখা হয়েছে৷ আজ থেকে আমাদের অধ্যায়টাও যুক্ত হল এ শহরের মহাকাব্যে।
অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে বাইক থামাতে হঠাৎ দেখি আত্রেয়ী জোরে হেসে উঠল।
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কী হল? হাসছ কেন?”
আত্রেয়ী হাসতে হাসতেই বলল, “তোমার ভারী সমস্যা হবে কিন্তু আজ থেকে।”
আমি বুঝলাম না। অবাক হয়ে বললাম, “কেন? কী সমস্যা?”
আত্রেয়ী বলল, “তুমি তো রোজ আমার সঙ্গে ব্রেক আপ করতে আর রোজ আমার বাড়ি চলে আসতে। এবারে কী করবে?”
আমিও হেসে ফেললাম। বললাম, “এসব বলে লজ্জা দেওয়া বন্ধ হোক। খিদে পাচ্ছে। স্যান্ডউইচ খাবে?”
আত্রেয়ী বলল, “চলো।”
আর-একটু এগিয়ে একটা ক্যাফে উদ্ধার হল। পিৎজা, চিকেন স্যান্ডউইচ আর লেমোনেড অর্ডার করা হল।
আত্রেয়ী বলল, “আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না কিছু। সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আমায় একটা চিমটি কাটো তো।”
আমি বললাম, “কেন স্বপ্ন মনে হচ্ছে?”
আত্রেয়ী বলল, “জানি না। মনে হচ্ছে তো মনে হচ্ছে। আমি কী করব? এই শোনো, এবার কী করব? আমি আমার বাড়ি ফিরে যাব, তুমি তোমার বাড়ি?”
আমি বললাম, “কভি নেহি। বিয়ে কি ইয়ার্কি মারতে করেছি? তুমি আমার বাড়ি যাবে।”
আত্রেয়ী বলল, “আমার কেমন ভয় করছে। ঠিক করছি তো আমরা? তোমার বাড়িতে… কোনও অনুষ্ঠান ছাড়া… যদি খুব অশান্তি হয়?”
আমি বললাম, “এই তোমার কি টেনশন নেওয়া ছাড়া কাজ নেই? এরপর কিন্তু শাস্তিস্বরূপ ভেজ বিরিয়ানি খাওয়াব তখন বুঝবে।”
