আমার ভীষণ রাগ হল। অত লোকের সামনেই আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “কতবার সেক্স করেছ জানোয়ারটার সাথে? ওর বউ আছে জেনেও, ওর বউকে না জানিয়ে কতবার সেক্স করেছ? কতবার ঠকিয়েছ ওর পরিবারকে? অনিরুদ্ধর রক্ষিতা হয়ে বাকি জীবনটা কাটাবে, নাকি ওকে নিয়ে এমন কোনও জায়গায় পালাবে যেখানে অনিন্দিতা যেতে পারবে না?”
চত্বরসুদ্ধ লোক তাকাল আমাদের দিকে। ঋতুজা যেন মাটিতে মিশে যাচ্ছিল। পাশের বয়স্কা ভদ্রমহিলা আমার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকালেন। আমি ওঁকে বললাম, “এই মেয়েটিকে দেখছেন, আমার বিয়ে করা বউ। বিয়ে করার পর জানতে পারলাম, ইনি এক বিবাহিত লোকের বউকে না জানিয়ে তার সাথে সম্পর্ক রেখে চলেছেন। এরকম মেয়ের সাথে কী করা উচিত বলে আপনার মনে হয়?”
ঋতুজা এবার কেঁদে ফেলল। তারপর উঠে দৌড়ে বাথরুমের ভিতর ঢুকে গেল। আমার মাথার মধ্যে যেন আগ্নেয়গিরি জ্বলছিল।
সবার কৌতূহলী চোখেও সে আগুন নিভল না।
৬৮ আত্রেয়ী
আমার মার স্বপ্ন ছিল বিয়ের সময় আমার বরকে বরণ করবে, আমাকে নিজের হাতে সাজিয়ে দেবে। মা যেদিন চলে যায়, একটা গ্রীষ্মের দুঃসহ দুপুরে যখন মাকে ওরা নার্সিং হোম থেকে নিয়ে এসেছিল, আমি পাথর হয়ে বসেছিলাম।
কোনও কথা বলতে পারিনি। চোখ দিয়ে একফোঁটাও জল পড়েনি।
মা তো আমার আকাশ জুড়ে ছিল। জুড়ে বলা ভুল, আমার আকাশটাই মা ছিল। কী খাব, কী পড়ব, কোথায় যাব, সব, সবটাই মা। মা না থাকা আমাদের ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো ব্যাপার হল। আমি আর বাবা দিশেহারা হয়ে গেছিলাম। জল গরম করতে পারত না যে মেয়ে, সে রান্না করা শিখে গেল। তেল, নুন, লংকা প্রথম প্রথম কিছুই ঠিক করে দিতে পারতাম না। বাবা সোনা মুখ করে তাই খেয়ে নিত।
কোত্থেকে জানলাম আমি মাঙ্গলিক। গাদাখানেক সাইট সার্চ করে জেনে ফেললাম মাঙ্গলিক হবার দোষ কী কী হতে পারে৷
অমৃত যখন প্রথম আমাকে প্রোপোজ করল, আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি মাঙ্গলিক? অমৃত রেগে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, তুমি অঙ্কের টিচার? লজ্জা লাগে না এই প্রশ্নটা করতে?
আমি হেসে দিয়েছিলাম।
আমাকে কেউ বুঝিয়েছিল মাঙ্গলিকদের অনেক বাধা থাকে জীবনে, হাজার সমস্যা থাকে। আমার মনে গেঁথে গেছিল। ভাবতে শুরু করলাম আমার মাও হয়তো আমার জন্য চলে গেল। ভেতর ভেতর শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। ক্ষয়টা বুঝতে পারছিলাম।
মারাত্মক ডিপ্রেশন, সে ডিপ্রেশনের কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া অসম্ভব। শুয়ে আছি ছাদের দিকে তাকিয়ে। এক অব্যক্ত হাহাকার আমাকে ছারখার করে দিতে শুরু করেছিল প্রতিক্ষণে।
অমৃত আমার জীবনে দমকা হাওয়ার মতো। সারাদিন অসহ্য গরমের পর কালবৈশাখীর মতো এল। আমার অবচেতনে যে কখন ছেলেটা এত শিকড়বাকড় গজিয়ে বাসা বানিয়ে ফেলেছে আমি বুঝতেও পারিনি। বুঝতে চাইও না। যেটা বুঝি, আমার এই পৃথিবীতে দুজন আছে। আমার বাবা আর অমৃত। আমার আর কিছু চাই না। ওর কোমর আঁকড়ে ধরেছি রাস্তার পুরোটা সময়। পিঠে মাথা গুঁজে থাকতে থাকতে কখন যেন দু চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে গেছে বুঝতেও পারিনি।
মন্দিরে পৌঁছে অমৃতকে বললাম, “পুরোহিতকে বলবে আমি মাঙ্গলিক। প্রথমে মনে হয় দোষ কাটাতে গাছের সাথে বিয়ে দেয়।”
অমৃত আমাকে চমকে আমার হাতে একটা জোর চিমটি কেটে বলল, “আমার আত্রেয়ীর কোনও দোষ থাকতেই পারে না। আর গাছ কেন, তোমার সব সময় আমার সঙ্গেই বিয়ে হবে। চলো তো।”
আর কিছু ভাবিনি। পাগলটা আমাকে বিয়ে করল মন্দিরে। হাসিও পাচ্ছিল বাবা কী ভাববে ভেবে। তবে ভোররাতের দুঃস্বপ্নটা দেখার পরে আমার মাথায় আর কিছু কাজও করছিল না। মনে হচ্ছিল বিয়েটা হলেই যেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
কেমন একটা ঘোরের মধ্যে সব হয়ে গেল। কপালে যখন সিঁদুর পরাল অমৃত, আমার মনে হল মা কাছেই কোথাও দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে। আমি কেঁদে ফেললাম। অমৃত আমাকে জড়িয়ে ধরে মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “শোনো, এখানে সবাই পালিয়ে এসে বিয়ে করে, তোমার কান্না দেখে যদি লোকে ভাবে তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছি, বেদম ক্যাল খেয়ে যাব মাইরি!”
কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেললাম।
অমৃত বলল, “চলো এবার আমাদের বাড়ি।”
এবার আমার ভয় লাগল। ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, “কাকু বাড়ি আছেন?”
অমৃত আমায় ধমক দিয়ে বলল, “কাকু কী? বাবা বলো। হ্যাঁ আছে। আমার বাবা কুল বাবা। চাপ নেই। চলো তো। আর শোনো, আমার ইচ্ছা করছে গোটা শহরকে চেঁচিয়ে বলি, আত্রেয়ী আজ থেকে আমার। শুধু আমার। পুরোপুরি আমার।”
আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরলাম।
ঠিক বলেছে।
ও আমার, শুধু আমার। পুরোপুরি আমার।
৬৯ জীমূতবাহন
বাগডোগরা থেকে কলকাতা প্লেনে বেশিক্ষণ লাগে না৷ তবু এটুকু সময়ই আমার মনে হচ্ছিল জীবনের দীর্ঘতম সময়।
বাড়িতে একবার খুব বিড়ালের উপদ্রব হয়েছিল। বাবা বলেছিল কয়েকটাকে বস্তায় করে অন্য পাড়ায় ছেড়ে আসতে।
আমার মনে হচ্ছিল ঋতুজাকে যেন আমি সেরকম বেড়াল পার করতেই যাচ্ছি। আর সেটা করতে পারলে আমি বেঁচে যাই। সারাজীবন ভালো না বাসার যন্ত্রণা সহ্য করার থেকে একবারে সব মিটে গেলে ভালো।
প্লেনে ওঠার আগে যখন এয়ারপোর্টের ওয়াশরুম থেকে এল, চোখে একফোঁটা জল নেই। দূরে গিয়ে বসল। প্লেনে ওঠার সময় অচেনা মানুষের মতো আমার পেছনে দাঁড়াল।
