আমি বললাম, “আমাকে বিয়ে করতে পারবে আজ? এখনই?”
অমৃত অবাক হল, “এখানে? তোমার বাবা? আমার বাবা?”
আমি বললাম, “তুমি সামলাও সবাইকে। আমি বিয়ে করতে চাই। আজ। এখনই।”
অমৃত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে, তাই হবে। চলো।”
আমি উঠলাম। অমৃত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বসার ঘরে এল। বাবা টিভি দেখছিল। আমাদের বেরোতে দেখে বলল, “কী হল? ঝগড়া মিটেছে আজকের মতো?”
অমৃতর মুখ বেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনে হচ্ছিল ঘর থেকে বেরোনোর সময়। বাবার সামনে কেমন হয়ে গেল। বলল, “কালকে ইন্ডিয়া জিতল?”
বাবা অমৃতর দিকে তাকিয়ে বলল, “কালকে তো ইন্ডিয়ার কোনও খেলা ছিল না! ছিল? কীসের কথা বলছ, ক্রিকেট না ফুটবল?”
অমৃত মাথা চুলকে বলল, “খো খো? শ্রীলঙ্কার সঙ্গে?”
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর সঙ্গে কি এরও মাথা খারাপ হয়ে গেছে?”
আমি বুঝলাম অমৃত ট্রিপ করে গেছে। এখন আর ওর পক্ষে ঠিক করে কথা বলা সম্ভব না। আমি বাবাকে বললাম, “আমরা ঠিক করেছি আজ বিয়ে করব বাবা। আমি আজ থেকেই ওর বাড়িতে থাকব।”
বাবা চমকাল না। টিভির দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে। করে ফেল।”
আমি বললাম, “তোমার তো কিছু ভূমিকা নেওয়া দরকার।”
বাবা বলল, “আমি ভূমিকা নিতে গেলেই তো সবাইকে নিয়ে এগোতে চাইব। তাহলে তোদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ বা ভাজা কিছুই হবে না। তোরা বরং এক কাজ কর, দুজনে কালীঘাট বা কোথাও গিয়ে একটা বিয়ে করে অমৃতর বাড়ি গিয়ে হাজির হ। সকাল সকাল একা আমার হার্ট অ্যাটাকের চান্স হবে কেন, ওদের বাড়ির লোকেরও হোক।”
আমি রেগে গিয়ে বললাম, “বাবা আমি কিন্তু সিরিয়াস।”
বাবা বলল, “আমিও তো সিরিয়াস। একবারও মনে হচ্ছে আমি ইয়ার্কি মারছি?”
অমৃত সোফায় বসে পড়ে বলল, “লুচি খেতে ইচ্ছা করছে। তুমি লুচি বানাতে পারো?”
আমি রেগে গেলাম, “তোমার এখন লুচি মাথায় এল? তুমি যে বললে আজই সব ব্যবস্থা করবে?”
বাবা টিভিটা বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল, “কী হয়েছে মা? এরকম পাগলের মতো করছিস কেন? আমাকে বলা যায়?”
আমি আবার কেঁদে ফেললাম। বাবার পাশে বসলাম।
বাবা আমার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “পাগলিটা বড়ো হল না এখনও।”
অমৃত বলল, “তাহলে কি পালানোর প্ল্যানটা ক্যান্সেল? লুচি করবে?”
আমি কাঁদতে কাঁদতেই রেগে গিয়ে বললাম, “তুমি যাও তো। সারাক্ষণ খালি খাই খাই।”
অমৃত কেমন গোবেচারা মুখ করে বসে রইল।
আমার ইচ্ছা হচ্ছিল ওকে জড়িয়ে ধরি।
এরকম সর্বনাশ কবে হল আমার? এত ভালোবেসে ফেললাম কবে?
৬৪ জীমূতবাহন
হোটেলে চেক আউট প্রসেসিং করতে বললাম। হোটেল থেকেই একটা গাড়ি ঠিক করা গেল। ড্রাইভারকে বললাম, এন জে পি যেতে হবে।
ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেছিল। পাউরুটি অমলেট। বউ ছুঁল না।
আমি অনুরোধ করলাম না একবারও।
খেয়ে নিলাম।
ব্যাগ গাড়িতে তুলে রওনা দিলাম যখন তখন নটা বাজে। রোদ ঝলমল করছে। এখান থেকে এই সময় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায় না। আজ যাচ্ছিল।
বউ সেদিকে চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মাথা নিচু করল। ড্রাইভার গান চালিয়েছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের “হে আপনা দিল তো আওয়ারা।” পাহাড় চুঁইয়ে জল পড়ছে। রাস্তা ভেজা এখনও। বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে সারে সারে। আর-একটা কর্মব্যস্ত দিন শুরু হচ্ছে পাহাড়ি মানুষদের জন্য।
পরিবেশটা ভালো হতে পারত। দুর্দান্ত হতে পারত। সব উপাদান ছিল।
ছিল না আমার কপাল। চুপ করে বসে রইলাম।
চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টাও করলাম, ঘুম এল না।
ঘণ্টাখানেক যাবার পর বউ কথা বলল, “অনিরুদ্ধ ফোন করেছে, তুমি আমাকে ফোনটা দেবে না, এটা তো স্বাভাবিক ঘটনা। এটা আনএক্সপেক্টেড কিছু ছিল না। কিন্তু তুমি আমাকে যে কথাটা বললে সেটা ভেবে বললে? একটা মানুষ একাকিত্ব থেকে অনেক কিছু করতে পারে যেটা সবার বোধগম্য নাও হতে পারে। আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করেছি, সময় নষ্ট করেছি এটাও ঠিক, কিন্তু তা বলে…”
বউ চুপ করে গেল।
আমি উত্তর দিলাম না। জানলার বাইরে তাকালাম।
বউ বলল, “ছোটোবেলাটা মানুষের চিরকাল থাকে না তো। সবথেকে বড়ো সমস্যাটা হয় যখন সে বুঝতে পারে সে বড়ো হয়ে গেছে। বড়ো হয়ে যাওয়াটাও যদি বুঝতে হয় কোনও কলঙ্ক থেকে, সেটা যে কী ভয়ংকর হতে পারে সেটা যার সঙ্গে হয় সে বুঝতে পারে। বাকিরা তো তাকে দাগিয়ে দিতেই ব্যস্ত থাকে। পাবলোদার সঙ্গে টিনএজ প্রেমটা যে নিষিদ্ধ সেটুকু বুঝতাম, কিন্তু যেদিন বাড়িতে কেউ ছিল না, আর পাবলোদা এসে অনেক আদর করল সেদিনই আমি ওকে ভালোবেসেছিলাম। সে আদরে শরীরের থেকেও অনেক বেশি ছিল একটা মেয়ের প্রথম প্রেমের আবেগ। পিরিয়ড মিস হল, সবাই জানতে চেয়ে পাগল করে দিল কার কাজ, একটা কথাও বলিনি। সেদিন থেকে আমি খারাপ মেয়ে। অ্যাবরশন ক্লিনিকের ওই অন্ধকারটা এখনও আমার দুঃস্বপ্নে আসে। আমি কেঁদে উঠি। শিউরে উঠি, পালাতে যাই, পথ পাই না। অনিরুদ্ধর সঙ্গে যেদিন প্রথম কথা হয়েছিল, অতটা বলিনি ওকে। তারপর একদিন রাতে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখে উঠে বসলাম। কেউ অনলাইন ছিল না অনিরুদ্ধ ছাড়া। ওকে আমি নিজে পিং করে সবটা বলেছিলাম। পরের দিন সকাল হলে লজ্জা লেগেছিল। কেন একটা অপরিচিত লোককে সব বলে দিলাম। অনিরুদ্ধ মেসেজ করত রাতের দিকে। প্রেম কি না বুঝিনি, কথা বলতাম। অভ্যাস। ও আমাকে প্রোপোজ করল একদিন। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বিয়ে? আমি করব? তারপর আবার সমস্যা শুরু হয় যদি? না করে দিলাম। অনিরুদ্ধ অনেকবার বলেছিল, কিছুতেই রাজি হলাম না। ওর বিয়ে ঠিক হল। অনিরুদ্ধ অন হয়েও কথা বলত না, আমি ভাবতাম ওর হবু বউয়ের সঙ্গে কথা বলছে। আমার একাকিত্ব আবার আমাকে পিষে ফেলতে শুরু করল। ভয় হল, সারাজীবন একা থাকব? তারপর একদিন অনিরুদ্ধ বিয়ের কার্ড দিতে এল। যাওয়ার সময় বলল, তোমাকে একবার জড়িয়ে ধরতে পারি? আমি বললাম, ধরো। অনিরুদ্ধ আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। আমিও কেঁদে ফেললাম। অনিরুদ্ধ চলে গেল। সেদিন থেকে নতুন করে যোগাযোগ শুরু হল। আমাকে বিয়ে করতেও ও-ই বলেছিল। অমলকান্তিকেও ওর ঠিক করা। অমলকান্তির পালানোটা আর তোমার আসাটা হিসেবের বাইরে। আমি খারাপ মেয়ে, কিন্তু একাকিত্ব আর সেই অ্যাবরশন রুমের আতঙ্ক আমাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে আমি জানি। কলকাতা গিয়ে ডিভোর্সের জন্য কী করতে হবে বলে দিয়ো। করে দেব।”
