বউ কেঁদে ফেলেছিল। কথা বলতে পারল না।
৬৩ অমৃত
রাতের কলকাতা শহরে বাইক চালানোর মজাই আলাদা। সব্যর সঙ্গে চা খেয়ে যখন বেরোলাম, রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম। হুশহাশ করে কয়েকটা গাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। বাইক নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ এদিক সেদিক গেলাম। সল্টলেক, রাজারহাট হয়ে এয়ারপোর্টের রাস্তায় ঢুকলাম।
বাইকটা পার্ক করে এয়ারপোর্টের বাইরে খানিকক্ষণ ঘুরে ইচ্ছা হল কোথাও একটা ঘুরে আসি। ভোরবেলা গৌহাটির ফ্লাইট দেখাচ্ছে। চলে যাব? আমার বন্ধুরা গতবছর তাওয়াং গেছিল। ছবি দেখিয়েছিল। ঠিক করেছিলাম আত্রেয়ীকে নিয়ে যাব।
আর গিয়ে কী হবে? সেই তো ব্রেক আপ করে দেব। মানুষজন কত তাড়া নিয়ে এত রাতেও এয়ারপোর্টে ঢুকছে।
ধুস। কী হবে কোথাও গিয়ে যদি আত্রেয়ীকে নিয়েই না যেতে পারি? দরকার নেই।
বেরিয়ে গেলাম বাইক নিয়ে আবার। ভি আই পি রোড ফাঁকা। পুলিশের গাড়ি দুবার দাঁড় করাল। কাগজপত্র দেখল। একজন বলল, “কী কেস ভাই এত রাতে?”
আমি বললাম, “বাবা ভরতি আছে, দেখতে যাচ্ছি।”
আর কোনও প্রশ্ন করল না। ভি আই পি রোড হয়ে, ফাঁকা ই এম বাইপাস হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়ি নিস্তব্ধ। তালাবন্ধ।
চাবি নিয়ে গেছিলাম। ঘরে ঢুকে শুলাম।
ঘুম আসছে না। আত্রেয়ী আর আমার ছবিগুলো বের করে দেখতে লাগলাম। আমাকে পরম নিশ্চিন্তে জড়িয়ে ধরে আছে। আত্রেয়ী আমাকে ভালোবাসে না!
আমার রাগ হল। আবার সেই গোঁ। কেন আমাকে ফোন করছে না ঠিক করে? কেন দেখা করছে না? এরকম কেন করবে আমার সঙ্গে? কেন অন্য লোকের সঙ্গে কথা বলবে? কেন আমাকে ফোন করবে না? কেন কেন কেন?
উঠে বসে রইলাম।
বিরক্তি লাগছে। জামাকাপড় পরে নিলাম আবার।
ভোর হয়েছে। বাইক বের করলাম। আত্রেয়ীদের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
পৌঁছে দেখছি আত্রেয়ীর বাবা বাড়ির সামনে পায়চারি করছেন।
আমাকে দেখেই হেসে ফেলে বললেন, “তোমরা পারো সত্যি। দিনে কবার ঝগড়া হয় বলো তো তোমাদের?”
আমি মাথা চুলকালাম।
আত্রেয়ীর বাবা বললেন, “যাও, ওর ঘরে গিয়েই ডেকে দাও। এই বুড়ো মানুষটাকে আর এর মধ্যে জড়িয়ো না। নিজেদের কেস নিজেরা মেটাও। আমি আজকেই তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলব। তোমরা সংসার করো, তুমুল ঝামেলা করো, যাই করো, নিজেরা করো। আমি নেই এর মধ্যে। উফ। চা খাবে?”
আমি মাথা নেড়ে ওদের বাড়ির ভেতর দৌড় লাগালাম।
আত্রেয়ীর ঘর বন্ধ ছিল। আমি নক করলাম।
খুলছে না। আমি চ্যাঁচালাম, “আত্রেয়ী, এই আত্রেয়ী।”
দরজা খুলল।
আত্রেয়ী ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বিস্ফারিত চোখে। আমি বললাম, “কী হয়েছে? আরশোলা ঢুকেছে ঘরে?”
আত্রেয়ী ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে আমার বুকে জোরে জোরে ঘুসি মারতে শুরু করল।
আমি অবাক হয়ে বললাম, “এই কী হয়েছে? এরকম করছ কেন? কী হয়েছে বলবে তো?”
আত্রেয়ী চোখের জলে আমার জামা ভিজিয়ে দিচ্ছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি খুব খারাপ। খুব। আমিও খুব খারাপ। এই তুমি একদম বাইক চালাবে না আজ থেকে।”
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, “মানেটা কী?”
আত্রেয়ী ধমক দিল, “যা বলছি শোনো। একদম বাইক চালাবে না।”
আমার কপালে ঠোঁটে গলায় চুমু খেতে লাগল আত্রেয়ী।
আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, “এই পাগলি, বাবা আছেন তো, এখনই চলে আসবেন।”
আত্রেয়ী বলল, “আসুক। তুমি বলো আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। বলো সত্যি করে।”
আমি বললাম, “আচ্ছা বাবা, যাব না বললাম তো।”
আত্রেয়ী আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে থাকল।
আত্রেয়ী
অমৃত লাজুক লাজুক মুখে আমার খাটে বসে আছে। আমি কাঁদছিলাম তখনও।
অমৃত অস্বস্তিতে পড়ছিল। ভাবছিল বাবা যদি চলে আসে। আমি দরজা ভেজিয়ে দিলাম। অমৃতকে জড়িয়ে ধরলাম।
অমৃত বলল, “এই আত্রেয়ী, কী পাগলামি করছ বলো তো? আমাকে একটু খুলে বলবে কী হয়েছে?”
আমি বললাম, “আমি তোমার সঙ্গে দুদিন কথা বলিনি। কালকেও তোমাকে বারণ করে দিয়েছিলাম আমাদের বাড়ি আসতে। আমার সাবকনশাস মাইন্ড যে আমার ভেতরে বিচ্ছিরি একটা অপরাধবোধ তৈরি করছিল আমি বুঝতে পারিনি। আমি তোমাকে নিয়ে ভীষণ খারাপ একটা স্বপ্ন দেখেছি।”
অমৃত হেসে ফেলে বলল, “আমি মরে গেছি এরকম দেখেছ?”
আমি ওর মুখে হাত দিয়ে বললাম, “প্লিজ বোলো না। প্লিজ। আমার ভালো লাগছে না কিছু। একদম ভোরবেলা এই স্বপ্নটা দেখলাম।”
অমৃত বলল, “এইসব ভোরের স্বপ্ন টাইপ মিথ বিশ্বাস করতে নেই। পাগল কোথাকার। শোনো না, দরজাটা খুলে দাও, বাবা কী ভাববেন বলো তো?”
আমি উঠে দরজা খুললাম।
অমৃত বলল, “আমি সত্যিই কালকে রাগ করেছিলাম। ঠিক করেছিলাম তোমার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখব না। মনে হচ্ছিল তুমি যেন আমাকে অ্যাভয়েড করছ। সারাক্ষণ এটাই ভেবে যাচ্ছিলাম যে তুমি আমাকে আর চাও না। ভীষণ রাগ হচ্ছিল তোমার ওপর। তারপর যত রাত পেরোতে লাগল, আমি বুঝতে পারলাম, তোমাকে ছাড়া আমার কোনও অস্তিত্বই নেই আত্রেয়ী। জানি না এ কদিনে আমাদের মধ্যে ঠিক কী হয়েছে, কিন্তু বিশ্বাস করো, অমৃতর পাশে আত্রেয়ী ছাড়া আর কোনও নাম বসতেই পারে না।”
আমি ওর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললাম, “তুমি আমাকে ছেড়ে দিচ্ছিলে? ছেড়ে দিয়ে কী করতে?”
অমৃত অধৈর্য গলায় বলল, “বললাম তো সোনা, আমি জাস্ট ভেবেছিলাম। কাজের ক্ষেত্রে দেখা গেল আমার সেই মনই বিদ্রোহ করে বসল। আমি পারব না তোমায় ছেড়ে। সিম্পলি পাগল হয়ে যাব।”
